বাংলাদেশ পুলিশের ২১তম মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ছিলেন আব্দুল কাইয়ুম। ২০০৫-এর ৭ মে থেকে ২০০৬ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত তিনি আইজিপির দায়িত্ব পালন করেন। সাবেক এই আইজিপি বিএনপির সদ্যপ্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেছেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইস্যুতে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খবরের কাগজের বিশেষ প্রতিনিধি ও ক্রাইম চিফ আলমগীর হোসেন।
খবরের কাগজ: দেশে এখন নির্বাচনি হাওয়া বইছে। এই সময়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা নির্বাচনি পরিবেশ কেমন দেখছেন?
আব্দুল কাইয়ুম: এখন পর্যন্ত যা দেখছি, সব মিলিয়ে ঠিকঠাক মনে হচ্ছে। তবে অনেক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এখানে কিছু ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছি। বিশেষ করে পতিত সরকার (বিগত আওয়ামী লীগ সরকার) এবং কিছু মহল বিভিন্ন ‘ইস্যু’ তৈরি করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থির করে তোলার চেষ্টা করছে। তবে জাতি যেহেতু নির্বাচনের জন্য এখন ঐক্যবদ্ধ, তাই একটু সতর্ক থাকলেই এসব অপতৎপরতা রোধ করা সম্ভব।
খবরের কাগজ: বিগত কয়েকটি নির্বাচন নিয়ে নানা রকম বিতর্ক রয়েছে। এবারে আপনি কেমন নির্বাচন প্রত্যাশা করেন?
আব্দুল কাইয়ুম: এবারের প্রেক্ষাপট আগের চেয়ে ভিন্ন। দেশে বড় ধরনের একটি পরিবর্তনের পর বহু আকাঙ্ক্ষার নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচনকে উৎসব বলা হয়ে থাকে। ফলে নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক, দলমত নির্বিশেষে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং ভোটকেন্দ্রগুলোতে যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকে–এমনটাই চাই। প্রকৃত ভোট উৎসব দেখতে চাই।
খবরের কাগজ: নির্বাচনি সংঘাত-সহিংসতা রুখতে এখন পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা কি যথেষ্ট বলে মনে করছেন?
আব্দুল কাইয়ুম: জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে পুলিশ যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল, সেখান থেকে এখন পরিস্থিতি অনেকটা ভালো। পুলিশ আগের চেয়ে বেশ খানিকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পুরো জাতি ভোটের জন্য আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছে। এমনকি প্রশাসন, পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী–সবাই চাচ্ছে নির্বাচন হোক। জনগণের ‘ম্যান্ডেট’ অনুসারে সরকার বা রাষ্ট্র পরিচালিত হোক। ফলে জনগণের এই ঐক্যবদ্ধ চাওয়ার বিষয়গুলো নির্বাচনি মাঠে ইতিবাচক সাড়া জোগাচ্ছে। তা ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনি মাঠে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেনি। সবার আন্তরিক সহযোগিতা থাকলে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন হবে।
খবরের কাগজ: ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ ফেইজ-২ পরিচালিত হচ্ছে। এতে নির্বাচনি মাঠের আইনশৃঙ্খলা ও পরিবেশ উন্নতির ক্ষেত্রে কতটা সহায়ক ভূমিকা রাখছে?
আব্দুল কাইয়ুম: নির্বাচন সামনে রেখে একশ্রেণির অপরাধী বা অশুভ শক্তির তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। ফলে অভিযান যে নামেই হোক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে যারা অপরাধী, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু ঢালাওভাবে যাতে গ্রেপ্তার করা না হয়। নিরীহ মানুষ যাতে বিপদে না পড়েন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। গ্রেপ্তারের আগেই তথ্য যাচাই-বাছাই করতে হবে। তা না হলে অপারেশন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
খবরের কাগজ: ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কী ধরনের ভূমিকা থাকা উচিত বলে মনে করেন?
আব্দুল কাইয়ুম: ভোটের মাঠে প্রধান বার্তা হচ্ছে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বজায় রাখা। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ বিষয়ে যথেষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। বিগত ১৬ বছরে পুলিশ, প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা সবাই দেখেছে। এ বিষয়গুলো এবার বিভিন্ন মহল আরও বেশি পর্যবেক্ষণ করবে। ফলে বিগত সময়ের মতো করে নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনি মাঠে সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষ ও পেশাদার আচরণ প্রদর্শন করবে–সেটাই প্রত্যাশা করি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার কারণে কোনো প্রার্থী যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেদিকটাও মাথায় রাখতে হবে।
খবরের কাগজ: নির্বাচনি পরিবেশ উৎসবমুখর বা শান্তিপূর্ণ রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য আপনার পরামর্শ কী?
আব্দুল কাইয়ুম: প্রধানত নির্বাচনের সময়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, বৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, পেশাদার বা চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা গেলে নির্বাচনি পরিবেশ উৎসবমুখর বা শান্তিপূর্ণ থাকবে বলেই আশা করা যায়। মাঠপর্যায় থেকে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনার বিষয়ে আগাম তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এসব বিষয়ে যথাযথ কাজ হলে মাঠের পরিস্থিতি শান্ত থাকবে বলে আশা করা যায়।
খবরের কাগজ: সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
আব্দুল কাইয়ুম: খবরের কাগজকেও অনেক ধন্যবাদ।