তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দিয়ে রাজধানীসহ দেশের অর্ধেকের বেশি এলাকায় গৃহস্থালি ও হোটেল-রেস্টুরেন্টের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। কিন্তু গত ১০ দিন থেকে হঠাৎ করে এলপি গ্যাসের সরবরাহ একেবারে কমে গেছে। ১২ কেজির গ্যাস সরকার নির্ধারিত দামে ১৩০৬ টাকা তো দূরের কথা ১৭০০ থেকে ২০০০ হাজার টাকাতেও পাচ্ছেন না খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তারা। তারা এ দোকান সে দোকান কয়েকবার ঘুরেও চাহিদামতো এলপি গ্যাস পাচ্ছেন না। কোনো কোনো জায়গায় ৩ হাজার টাকায়ও ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে। এর কারণ জানতে খবরের কাগজ কথা বলেছে সেনা কল্যাণসহ তিনটি গ্যাস কোম্পানির ডিলার ও কারওয়ান বাজারের মেসার্স জনতা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আব্দুল হকের সঙ্গে। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাহাঙ্গীর আলম।
খবরের কাগজ: এলপি গ্যাসের ব্যবসা কেমন চলছে। সরবরাহ পরিস্থিতি কেমন মনে করছেন?
আব্দুল হক: মোটামুটি চলছে। ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যায় না। গ্যাস তেমন নেই। আমার ৫ বছরের ব্যবসা জীবনে এমন সংকট কখনো দেখিনি। গ্যাস নেই নেই বলতে বলতে গলার কণ্ঠ বসে গেছে।
খবরের কাগজ: চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছেন কি? না পাওয়ার কারণ কী?
আব্দুল হক: চাহিদা মতো তো দূরের কথা অর্ধেকও গ্যাস পাওয়া যায় না। অল্প অল্প দিচ্ছে। কোম্পানি থেকে। কখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তাও বলছে না। তারা বলছে সংকট চলছে। কিন্তু কাস্টমারতো সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের জন্য আসছে। কিন্তু দিতে পারছি না।
খবরের কাগজ: আগে কী পরিমাণ বিক্রি করতেন। বর্তমানে কেমন বিক্রি হচ্ছে।
আব্দুল হক: আমি পেট্রোম্যাক্স, সেনা কল্যাণ ও বিএম কোম্পানির ডিলার। আগে প্রতি মাসে গড়ে ১০ থেকে ১২ হাজার গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি করেছি। গত ১০ দিন থেকে তিন কোম্পানি থেকেই বলা হচ্ছে গ্যাসের সংকট চলছে। তাই আগের মতো দেওয়া সম্ভব না।
খবরের কাগজ: কখন থেকে সংকট শুরু হয়েছে। কারণ কী?
আব্দুল হক: গত ডিসেম্বর মাসেও ভালোভাবে গ্যাস পেয়েছি। সরকারের নির্ধারিত দামে ১২৫৩ টাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি করতে পেরেছি খুচরা বিক্রেতা ও গ্রাহকের কাছে। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জানুয়ারি থেকেই বলা যায় গ্যাসের সংকট শুরু হয়েছে। আগে মাসে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করা হয়েছে। কিন্তু ১০ দিন থেকে দিনে ১৫০ থেকে ২০০টাও সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। যোগাযোগ করা হলেও বিভিন্ন কোম্পানি থেকে বলা হচ্ছে গ্যাস তেমন নেই।
খবরের কাগজ: সরকার নির্ধারিত দামে কি গ্যাস বিক্রি সম্ভব হচ্ছে। কি দামে গ্যাস বিক্রি করছেন?
আব্দুল হক: আগের সরকার নির্ধারিত ১২ কেজির সিলিন্ডার ১২৫৩ টাকার কমে বিক্রি করেছি। তারপরও লাভ থেকেছে। কিন্তু জানুয়ারি মাসে ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখান থেকে গাড়ি ভাড়া বাবদ কিছু কমিশন পাই। ১৩০৬ টাকায় বিক্রি করলেও লাভ থাকছে না। তাই গত ৪ জানুয়ারি থেকে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১৩৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এর বেশি দামে বিক্রি করছি না। বিএম থেকে বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
খবরের কাগজ: বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করলে ভোক্তা অধিদপ্তর তো জরিমানা করতে পারে।
আব্দুল হক: সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের বেশি বিক্রি করলে ভোক্তা অধিদপ্তর জরিমানা করতে পারে। এটা জানি। তারপরও সেই দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ চাহিদামতো গ্যাস পাওয়া যায় না। এর ফলে বিক্রি কমে গেছে। অন্যদিকে দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ তো কমেনি। এসব দেব কোথায় থেকে? তাই একটু বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্য ডিলাররাতো আরও বেশি দামে বিক্রি করছে।
খবরের কাগজ: বেশি দামে তো গ্যাস বিক্রি করছেন। তাহলে লাভ তো বেশি হচ্ছে। এ ব্যাপারে কিছু বলবেন।
আব্দুল হক: আগে কোম্পানি থেকে বেশি কমিশন দিত। ১২৫৩ টাকার কমে ১১৮০ টাকায় বিক্রি করেছি। তারপরও লাভ ভালো থেকেছে। কিন্তু গত ১ জানুয়ারি থেকে মোটেই গ্যাস পাওয়া যায় না। সরকার ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়ে ১৩০৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। কোম্পানিতে ১৩০০ টাকায় ডিও করতে হচ্ছে। দেখছেন তো আপনার সামনেই ক্রেতাদের ফেরত দিতে হচ্ছে। বিক্রি নেই। তাহলে কী লাভ করব।
খবরের কাগজ: সরকার কী করলে সংকট দূর হবে বলে মনে করছেন।
আব্দুল হক: সরকার যেহেতু দেশ পরিচালনা করে। তাই অন্য কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এলপি গ্যাসের সংকট দূর করতে পারবে না কেন। অবশ্যই পারবে। সেই উদ্যোগ নিতে হবে। সারা দেশে গ্যাসের সংকট চলছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্রাহক আসছে। গ্যাস নেই নেই বলতে গিয়ে গলার স্বর বসে (ভেঙ্গে) গেছে। এই চিত্র সারা দেশের সব ডিলারের দোকানে। কাজেই সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। দ্রুত সরবরাহ বাড়াতে হবে।
খবরের কাগজ: বিভিন্ন এলপি গ্যাস কোম্পানি বিদেশ থেকে আমদানি করে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছে। সংকট দূর করতে তাদের কী কোনো ভূমিকা আছে মনে করেন।
আব্দুল হক: পেট্রোম্যাক্স, সেনা কল্যাণসহ বহু কোম্পানি গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবসা করছে। কাজেই সংকট দূর করতে তাদেরও দায়িত্ব নিয়ে দ্রুত গ্যাসের সংকট দূর করতে হবে। তাদের দ্রুত আমদানি বাড়াতে হবে। ডিলারদের চাহিদা মোতাবেক গ্যাসের সিলিন্ডার সরবরাহ বাড়াতে হবে।