চিত্রশিল্পী ফরিদী নুমানের উদ্যোগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে ১০ জনের একটি টিম সুন্দরবনের উদ্দেশে রওনা হলাম। উদ্দেশ্য শরতে সুন্দরবনের প্রকৃতি দেখা।
রাত ১০টায় খুলনার জেলখানা ঘাট থেকে আমাদের নিয়ে ছোট্ট একটি লঞ্চ ছাড়ল। লঞ্চটির নাম গাংচিল। পথে ঢাংমারি ঘাট থেকে লঞ্চে একজন ফরেস্ট গার্ড উঠলেন। পরের দিন দুপুরে সুন্দরবনের নলিয়ান রেঞ্জের বাঘের রাজ্য হিসেবে পরিচিত শেখেরটেক পৌঁছলাম। যদিও শেখেরটেকে বাঘের আনাগোনা বেশি, কিন্তু এবারের যাত্রায় শুধু বাঘ মামার পায়ের ছাপেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো। তবে বিরল বড় গেছো প্যাঁচা (Brown Wood Owl) ও বাদাবন শীসমার (Mangrove Whistler) পাখি দেখলাম।
রাতটা ওখানে কাটিয়ে পরের দিন সকালে আন্দারমানিক ও পক্ষীর খাল ঘুরে রাতে সুন্দরবনের কটকা এলাকায় এলাম। ২৮ সেপ্টেম্বর সকালে কটকার জামতলী খাল, সাপের খাল, কটকা টাওয়ার, জামতলী ও কটকা অফিসসংলগ্ন বাদাবনে ঘোরাফেরা করলাম। এরপর ছুটা বা ছিটে কটকা খাল হয়ে ডিমের চরের চলে এলাম। ছিটে কটকা খাল একসময় মহাবিপন্ন হাঁসপাখির (Masked Finfoot) বিচরণক্ষেত্র ছিল। তবে খাদ্য ও নিরাপত্তার অভাবে ওরা এখান থেকে সরে গেছে। সর্বশেষ ২০১৮-তে এই খালে ওদের তিনটির দেখা পেয়েছিলাম।
ডিমের চরের আবহাওয়া চমৎকার। রোদেলা দুপুর। তবে আকাশে কিছুটা মেঘ জমেছে। তা ছাড়া বাতাসের বেগও কিছুটা বেশি। নদী-খালে স্রোতও খানিকটা বেশি। খালে ঘুরে ঘুরে পাখি-প্রাণী দেখার জন্য লঞ্চ থেকে লাইফ জ্যাকেট পরে মোটরবোটে উঠলাম। খাল ও নদীর মোহনায় প্রচুর জেলেনৌকা। সবাই ইলিশ ধরায় ব্যস্ত। জেলেনৌকার বহর পার হয়ে খানিকটা সামনে এগোতেই শত শত চড়ুই আকারের পাখির ওড়াউড়ি করতে দেখলাম। খালের আশপাশে বড় বড় কেওড়া ও আর খালপাড়ে ছোট ছোট গেওয়াগাছ রয়েছে। কেওড়াগাছগুলোতে ঝুলছে নিপুণ স্থপতির ঠোঁটের বোনা বিভিন্ন আকৃতির বাসা। বাসাগুলো উল্টো করে ধরা বোতলের মতো দেখাচ্ছে। কিছু বাসা সম্পূর্ণভাবে তৈরি হয়ে গেছে। কিছু তৈরির মাঝপথে রয়েছে। আর কিছু বাসা পরিত্যক্ত। মৃদু বাতাসে বাসাগুলো দুলছে। এই দৃশ্য দেখতে বেশ লাগছে! বাসা দেখেই বোঝা গেল এগুলোর স্থপতি কারা? বাসা থেকে দলে দলে এসে পাখিগুলো খালপাড়ের ছোট ছোট গেওয়াগাছে বসে কিচিরমিচির করছে।
যদিও সুন্দরবনের পাখির তালিকায় এই পাখির নাম রয়েছে, কিন্তু গত ৩১ বছরে সুন্দরবনের কোথাও ওদের দেখিনি। বোট থামিয়ে যেই না পাখি ও বাসার ছবি তোলা শুরু করেছি, অমনি বৃষ্টি নামল। এত সুন্দর রোদের মধ্যেও বৃষ্টি। ক্যামেরা গুছিয়ে দ্রুত বোটটি কেওড়াগাছের আচ্ছাদনযুক্ত স্থানে ভেড়ানো হলো। তবে ক্যামেরা রক্ষা করতে পারলেও আমরা পুরোপুরি ভিজে গেলাম। বৃষ্টি কিছুটা কমতেই বোট ঘুরিয়ে লঞ্চে চলে এলাম। আকাশে প্রচুর মেঘ। আরও বৃষ্টি হলো।
দুপুরের খাবার শেষে রোদ উঠল। আবারও খালে ঢুকলাম। এবারও বৃষ্টি এল, তবে আগের মতো নয়। কাজেই দ্রুত পাখিগুলোর ছবি তুলে গঙ্গা তিতাই বা বিলচোরা (Great Thick Knee) পাখির খোঁজে ডিমের চরে নামলাম।
সুন্দরবনের কেওড়াগাছের বাসার মালিকগুলো আর কেউ নয়, এ দেশের বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি বাবুই। এরা বাউই, বাইল বা বাইল্লা নামেও পরিচিত। এ দেশে প্রাপ্ত তিন প্রজাতির বাবুইয়ের মধ্যে এদের সংখ্যায়ই বেশি। এই পাখির ইংরেজি নাম Weaver ev Baya Weaver। প্লোসেইডি (Ploceidae) গোত্রের এই পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Ploceus philippinus (প্লোসিয়াস ফিলিপিনাস)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় এদের দেখা মেলে।
বাবুই চড়ুই আকারের পাখি। লম্বায় প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার, ওজন ১৮ থেকে ২৮ গ্রাম হয়ে থাকে। দেহের উপরিভাগ বাদামি, আর তাতে অসংখ্য কালচে বাদামি দাগ রয়েছে। গলা, বুক ও পেট হলুদাভ বাদামি। প্রজনন মৌসুম ছাড়া অন্য সময় স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম দেখায়। প্রজনন মৌসুমে পুরুষ পাখি যেন বরবেশ ধারণ করে! এ সময় পুরুষের মাথার চাঁচি ও বুক হলুদ হয়ে যায়, আর গাল হয় কালো। বুকের কিছুটা অংশও হলুদাভ হয়, পিঠে থাকে সোনালি আভা। এই পাখির পা গোলাপি, ঠোঁট কালচে বাদামি।
বাবুই সামাজিক ও দলবদ্ধ পাখি। সারা দেশে এদের দেখা যায়। তবে গ্রাম ও মুক্তাঞ্চলে এদের বেশি দেখা যায়। শস্যদানা, বিচি, পোকমাকড় ওদের প্রধান খাদ্য। দিবাচর পাখিগুলোকে দল বেঁধে তৃণভূমি, পতিত ও চাষযোগ্য জমি, ঝোপঝাড়, এমনকি বাদাবনেও খাদ্য খুঁজতে দেখা যায়। ওরা একসঙ্গে উপনিবেশ বাসা তৈরি করে। ‘সচরাচর চি-চি-চি…’ শব্দে ডাকে। উপনিবেশ বাসায় সামনে ওদের বেশ চেঁচামেচি করতে দেখা যায়।
মার্চ থেকে অক্টোবর প্রজননকাল। এ সময় ধান/ফসলের খেত বা নদী-খালপাড়ের উঁচু গাছ, বিশেষ করে এরা তালগাছে বাসা বানায়। তাল ছাড়া খেজুর, সুপারি, নারিকেল ও বাবলাগাছেও এরা বাসা বানায়। কবি রজনীকান্ত সেনের ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতায় বাবুই পাখির কুঁড়েঘরের বাসার কথা কে না জানে? এ জীবনে বাবুই পাখি ও তার বাসা কম দেখিনি। তবে কেওড়াগাছে বাসা দেখলাম এই প্রথম।
রুচিসম্মত বাসা বানানো পাখিদের মধ্যে এ দেশে বাবুইয়ের স্থান প্রথম। কারণ তার বাসা বানানোয় রয়েছে নিপুণ শিল্পীর ছাপ। বাসার সূক্ষ্ম বুনন ও মজবুত গাঁথুনি দেখলেই তা বোঝা যায়। বাবুই পাখি এত সূক্ষ্মভাবে মেপে মেপে তালের-খেজুরের-ধানের পাতা ও ঘাস কাটে যে প্রকৌশলীরাও তাদের কাছে হার মানবে। তা ছাড়া প্রকৌশলের কোনো সূত্রটি নেই সেই বাসায়? আছে সঠিক ও পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলব্যবস্থা, সুন্দর প্রবেশপথ, দুর্যোগ বা শত্রু থেকে রক্ষার ব্যবস্থা, একাধিক কুঠুরি, ডিমের ঝুড়ি। বাসার নিচের কুঠুরিতে একটু কাদামাটি বা গোবর দিয়ে রাখে, যাতে বাসাটি কিছুটা ভারী হয় ও ঝড়-বাতাসে উল্টে না যায়। এত বুদ্ধি খাটিয়ে, পরিকল্পনা করে সুনিপুণভাবে বাসা বানায় বলেই তো ওরা পাখিদের স্থপতি।
প্রজনন ঋতুতে পুরুষপাখিরা কচি তাল-খেজুর-ধান-ঘাস পাতার শিরার এক পাশে ঠোঁট চালায়। এরপর ওড়ার জন্য খুব জোরে ডানা ঝাপটায়। এতে গতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাতার একাংশ ঠোঁটের সঙ্গে কেটে যায়। দুই-তিন ফুট লম্বা পত্রফলক ঠোঁটে চেপে এই পাখি যখন পত পত করে ওড়ে, তখন দেখতে চমৎকার লাগে। এরপর পছন্দের গাছের সরু ডালে বা পত্রধারে সেটা প্যাঁচায়, গিঁট দেয় ও বাসা বুনতে শুরু করে। সুচালো ঠোঁটের সাহায্যে পাতা ফুটো করে সেলাইয়ের মতো ফোঁড়ের পর ফোঁড় দিয়ে বাসা বোনে। লম্বা টুপি আকারের বাসার অর্ধেকটা তৈরি হয়ে গেলেই উপনিবেশে ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়েবাবুই পাখি হাজির হয়। তখন বরবেশী পুরুষরা কিচিরমিচর শব্দে প্রেমের গান গেয়ে, ডিগবাজি খেয়ে, বাসা দুলিয়ে প্রেয়সীদের অভ্যর্থনা জানায়।
জানায় বিয়ের আহ্বান। মেয়েপাখিরা একেকটি বাসায় প্রবেশ করে। পরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তা পরখ করে ও টেনেটুনে বুনন পরীক্ষা করে। এরপর এক বাসা থেকে অন্য বাসায় যায়। বাসা পছন্দ হলে সেই বাসার স্থপতিকেই বর হিসেবে বেছে নেয়। এরপর পুরুষ পাখি বাসার বাকি কাজ শেষ করে। বাসা তৈরিতে ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগে।
২০১৩ সালের এক রোদেলা সকালে মৌলভীবাজার জেলার ভানুগাছ এলাকার তালগাছে কর্মচঞ্চল স্থপতি পুরুষবাবুইদের বাসা বানাতে দেখেছিলাম। তাল পাতায় ঠোঁট চালিয়ে তালসুতো ছেঁড়া থেকে নিপুণ শিল্পীর মতো বাসা বানানো পর্যন্ত সব কর্মকাণ্ডেরই ছবি তুলেছিলাম। সেবারই প্রথম অর্ধসমাপ্ত বাসার ওপর স্ত্রীবাবুইকে আকৃষ্ট করার জন্য প্রেমিক পুরুষকে নাচতে দেখেছি।
বাসা বানানো হয়ে গেলে স্ত্রী তাতে দুই থেকে চারটি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। ডিম থেকে ছানা ফুটতে ১২ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। স্ত্রী ডিমে তা দেওয়া শুরু করলেই পুরুষ তাকে ত্যাগ করে আশপাশে আরেকটি বাসা বোনা শুরু করে। আর এভাবে বহুপ্রেমী পুরুষটি মৌসুমে দুই, চার বা ততোধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে পারে। আর এভাবেই স্থপতি পাখিটি এ দেশের শহর-বন্দর-গ্রামের সঙ্গে মিলেমিশে থাকে।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ