মৃদু শীতে প্রাণ ফিরছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের। ঠাণ্ডার পরশে নীল জলরাশি আর সোনালি বালুর মায়াবী টানে এখানে ছুটে আসছেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজারও পর্যটক।
শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) সাপ্তাহিক বন্ধের দিনে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত যেন পরিণত হয়েছিল উৎসব মেলায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে শুরু করে লাবণী, কলাতলী- প্রতিটি স্থানে পর্যটকদের ঢল। এদিন সকাল থেকে বালুচরে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক- সবাই মেতেছেন আনন্দে।
বালুচরে উৎসবের আমেজ
শান্ত সমুদ্রের ঢেউয়ে গা ভেজাতে মগ্ন ছিলেন পর্যটকরা। কেউ বালিয়াড়িতে বসে সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করেছেন, কেউবা বালিতে বিচ বাইক চালিয়ে, ঘোড়ায় চড়ে বা জেট স্কি নিয়ে ঘুরেছেন। ছোট শিশুরা ভেজা বালু দিয়ে গড়ছে স্বপ্নের প্রাসাদ, বড়রা উপভোগ করেছেন নগরজীবনের ক্লান্তি মুছে ফেলার মুহূর্তগুলো।
ঢাকার বাসাবো থেকে আসা পর্যটক রকি হাসান জানান, বালুর ওপর বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকাটাই তার কাছে সবচেয়ে প্রশান্তির লেগেছে।
তার স্ত্রী রাবেয়া শশী বলেন, ‘এই অনুভূতি শহরের কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
কুমিল্লার ধর্মপুর থেকে পরিবার নিয়ে আসা নীলাঞ্জনা চৌধুরী বলেন, ‘ছোট মেয়ে প্রথমবারের মতো কক্সবাজার এসেছে। এখানকার পরিবেশ দেখে সে রীতিমতো অবাক। বিচ বাইক ও ঘোড়ায় চড়তে চেয়েছে। পানিকে ভয় পায় বলে জেট স্কি তাকে টানেনি।’
যশোর থেকে বন্ধুদের সঙ্গে আসা গৌরাঙ্গ শর্মা জানান, কক্সবাজারের টান অপ্রতিরোধ্য। বছরে কয়েকবার হলেও তিনি এখানে ঘুরতে আসেন। এবারও সমুদ্রের শান্ত ঢেউ আর মনোরম আবহাওয়া তাদের ভ্রমণকে করে তুলেছে স্মরণীয়।
ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি
পর্যটকদের আগমনে সৈকতপাড়ের ব্যবসায়ীদের মুখেও ফিরেছে হাসি। পর্যটকদের ভিড়ে ছোট-বড় ব্যবসায়ীরাও ব্যস্ত সময় পার করছেন।
জেট স্কি-চালক শান্ত ইসলাম জানান, নভেম্বরের শুরু থেকেই পর্যটকদের আগমন বাড়তে থাকায় ব্যবসায় গতি এসেছে। তিনি আশা করছেন, ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে এই ধারা আরও গতি পাবে।
সুগন্ধা পয়েন্টের ঝিনুকপণ্যের ব্যবসায়ী সাদ্দাম বলেন, ‘ছোট ঝিনুকে নাম লিখে দেওয়ার কাজটি পর্যটকদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়; প্রতিটির মূল্য আমরা রাখি ১০০ থেকে ২০০ টাকা।’
সৈকতে ঘোড়ায় চড়ার আয়ও মোটামুটি ভালো। এক রাউন্ডের ভাড়া ২০০ টাকা বলে জানান ঘোড়ার মালিক ইসলাম।
পর্যটকদের স্মৃতি ক্যামেরাবন্দি করে জীবিকা চলে ফটোগ্রাফার রাসেলের। তিনি বলেন, প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। মৌসুম ভালো থাকলে এই আয় আরও বাড়ে।
অন্যদিকে লাবণী পয়েন্টের শঙ্খ এবং ঝিনুকের অলংকার বিক্রেতা জামালউদ্দিন বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী ঝিনুকপণ্যের চাহিদা কিছুটা কমলেও আমরা এখন আধুনিক ডিজাইনের অলংকার এবং সৌখিন সামগ্রী তৈরি করে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছি। শীতের শুরুতেই পর্যটকদের ঢল দেখে আমরা আশাবাদী।’
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-গেস্ট হাউস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিমউল্লাহ কলিম বলেন, ‘নভেম্বরের শেষ থেকে হোটেলে চাপ বাড়ছে।’ তিনি জানান, পর্যটকদের জন্য মানসম্পন্ন সেবা, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পর্যটকবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সংশ্লিষ্ট সবাই একযোগে কাজ করছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ তৎপরতা
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সৈকতে মোতায়েন রয়েছে ২৭ জন লাইফগার্ড, ৩৮ জন বিচকর্মী এবং প্রায় ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক। সৈকতের তিনটি প্রধান পয়েন্টে তারা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।
বিচকর্মীদের সহকারী সুপারভাইজার মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘প্রত্যেক পর্যটকের নিরাপত্তা বিধানই আমাদের মূল লক্ষ্য। সৈকতের প্রতিটি স্থানে নিয়মিত নজরদারি চলছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা দেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। পর্যটকদের নিরাপদ দূরত্বে থেকে সমুদ্র উপভোগ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
সৈকতে নিয়োজিত ‘সি সেইফ লাইফগার্ড’ প্রকল্পের ফিল্ড টিম লিডার ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘পর্যটক বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের সতর্কতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বাঁশি বাজিয়ে, পতাকা হাতে নিয়মিত সতর্কবার্তা প্রচার করছে আমাদের সদস্যরা। তারা পানিতে নামা প্রত্যেক পর্যটককে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন।’
কক্সবাজার অঞ্চলের ট্যুরিস্ট পুলিশপ্রধান (অতিরিক্ত ডিআইজি) আপেল মাহমুদ বলেন, ‘সৈকতে আসা প্রত্যেক পর্যটক আমাদের সম্মানিত অতিথি। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশের টহল এবং নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোনো পর্যটক হয়রানির শিকার হলে আর আমাদের জানালে আমরা অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব।’
সেন্ট মার্টিন পর্যটকশূন্য
কক্সবাজার-সেন্ট মার্টিন নৌপথে ১ নভেম্বর থেকে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলেও রাত্রিযাপনের অনুমতি না থাকায় এ মাসে কোনো পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করেনি।
মারমেইড রিসোর্টের ব্যবস্থাপক তৈয়ব উল্লাহ বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনে বসবাস করা পরিবারগুলোর সবাই পুরোপুরি পর্যটন মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু স্বল্প সময়ের ব্যবসা তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে পর্যটকদের আকর্ষণও অনেক। তাই এই দ্বীপে পর্যটনের সময়সীমা বাড়াতে হবে।’
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, ‘কক্সবাজার শহর থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দূরত্ব বেশি হওয়ায় সেখানে যাওয়া-আসা করতেই একটা দিন ব্যয় হয়ে যায়। কিন্তু সেখানে রাত্রিযাপনের সুযোগ না থাকায় পর্যটকরা ভ্রমণে আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলে দ্বীপের হোটেল, রেস্তোরাঁ, ট্রলার মালিক এবং দোকানদাররা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘পর্যটননির্ভর দ্বীপের অর্থনীতি এখন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।’ পরিবেশ সংরক্ষণ অবশ্যই জরুরি, তবে স্থানীয়দের জীবিকার বিষয়টিও যেন সরকার বিবেচনায় নেয়- এমন দাবিও জানান তিনি।
সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, ‘কক্সবাজার শহর থেকে সেন্ট মার্টিনে দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসার নিয়ম করায় পর্যটক পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে আমাদের জাহাজ চলাচল বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ থাকায় পর্যটক যাচ্ছেন না। কোনো জাহাজ সেখানে যায় না। তবে আমরা এখন ডিসেম্বর এবং জানুয়ারিতে জাহাজ চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছি।’