আমি তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। পড়াশোনায় ভালোই, সব স্যার পড়াশোনার জন্য আমাকে খুব প্রশংসা করতেন, ভালোবাসতেন। এই ভালোর মাঝে একটু ছেদচিহ্ন বসতে গিয়েছিল। ভালো লাগার বিরামচিহ্ন আর কী!
আমাদের গ্রামের মাঝখানে একটা সরু মাটির রাস্তা আছে। রাস্তার ওপারে কথাদের বাড়ি। রাস্তার এ প্রান্তে আকাশ নামক বিখ্যাত লাজুক যুবক অর্থাৎ আমি, আর অপর প্রান্তে কথা। অষ্টম শ্রেণির টুকটুকে মেয়ে, যার হাসি শুনলে মনে হতো যেন মধুমাসে কোকিল গান ধরেছে।
কথার মা আমাকে প্রায়ই ডেকে নিয়ে যেত- আকাশ, একটু কথাকে পড়া দেখাইস।
আমি বলতাম, জি খালা দেখামুনে।
মনে মনে খুশি হতাম। মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! হাতের মধ্যেই সুযোগ। খালা তোমাকে ধন্যবাদ।
আমি নিয়মিত কথাকে পড়া দেখাতে যেতাম। কথা সুযোগ বুঝে ডিম আর পরোটা ভেজে আনত, কখনো তালের পাখা দিয়ে বাতাস করত। আমাদের এলাকায় তখনো কারেন্ট ঢোকেনি। তাই সেই বাতাসের মূল্য ছিল নবাবি হাওয়া! আমার মনে হতো, মানুষ কি শুধু প্রেমেই ওড়ে? নাকি তালের পাখার বাতাসেও ওড়ে? যদিও আমরা কেউ কাউকে ভালোবাসার কথা বলিনি, তবু দুজনেই জানতাম, কিছু একটা হচ্ছে। এক ধরনের অচেনা অনুভূতিই ছিল আমাদের ফার্স্ট লাভ।
এদিকে আমার বন্ধু সুহাস, দরিদ্র ঘরের ছেলে, কিন্তু স্মার্টের চূড়ান্ত। রাতে আমাদের বাড়িতে থাকত। একদিন শীতের রাতে বলল, দোস্ত, তুই কাউরে ভালোবাসস?
আমি লাজুক ভঙ্গিতে বললাম, হুম... বাসি তো। কিন্তু তাকে বলা হয় নাই।
সে বলল, চিঠি লেখ, আমি দিয়ে আসব। আর বলে দিবনে।
আমি খুশি হলাম। তা হলে তো ভালোই হয়।
মোবাইল তখনো গ্রামে ঢোকেনি, চিঠি ছিল সেদিনের ফেসবুকের ইনবক্স। আমিও প্রেম-বিশেষজ্ঞ সাজার ভান করে একটি কবিসুলভ চিঠি লিখলাম কথাকে উদ্দেশ্য করে। তার পর সেটি সুহাসের হাতে ধরিয়ে দিলাম।
পরদিন ভোরবেলা। এমন কুয়াশা যে পাঁচ হাত দূরত্বও দেখা যায় না। সুহাস সাহস করে চিঠি নিয়ে রওনা হলো। সে দেখল, চাদর গায়ে একটি মেয়ে হাঁটছে। ভেবে নিল কথা নিশ্চয়ই।
কথা শোন, আকাশ তোকে একটা চিঠি দিছে!
মেয়েটি চিঠি নিল, তার পর চাদর সরিয়ে বলল- আমি কথা না, আমি সঙ্গীতা!
আমি শুনে মনে মনে বললাম, হায় সূর্যদেব, আজ তুমি না থেকে আমার জীবনে অন্ধকার এনে দিলে।
সঙ্গীতা কথার বড় বোন। এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী। সে ভীষণ রেগে গিয়ে বলল, আকাশকে দেখে নেব; এখনই চিঠিটা মাকে দিচ্ছি!
সুহাস ভয়ে দৌড়ে এসে আমার কাছে সব খুলে বলল। আর আমি তখন দাঁড়িয়ে আছি— মনে হচ্ছে- জীবনের প্রথম প্রেম, শুরুর আগেই বিসর্জন হলো!
কিছুক্ষণ পর শুনলাম কথাদের বাড়িতে কাণ্ড শুরু হয়েছে। বকা, চেঁচামেচি, তার পর ধুপধাপ। নিশ্চয়ই কথার বাবা তার ওপর শাসন প্রয়োগ করছেন।
অবস্থা আরও খারাপ হলো যখন কথার বাবা কথাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে এলেন। আমার মা কি করলেন জানো? তিনি যেন অলিম্পিকের সোনার জন্য প্রতিযোগিতা করছেন, আমাকেও ভালোই পিটালেন! আমি মার খেতে খেতে দেখলাম, কথা দরজার আড়াল থেকে কাঁদছে। এতে আমার প্রেম আরও পাকাপোক্ত হলো, কিন্তু দৌড়ানোর ইচ্ছাও বৃদ্ধি পেল। শেষে সত্যিই দৌড়ে পালালাম।
পালাতে পালাতে মনে মনে বললাম, প্রেমে পড়া যত সহজ, চিঠি ধরিয়ে দেওয়া তত সহজ নয়!
পরের দিন পুরো গ্রামের লোক জানল, আমাদের মহাপ্রেম কাহিনি।
সুহাসও বাঁচল না, তার বাবাও তাকে একশ মিটার স্প্রিন্টের দৌড় লাগিয়ে ছাড়াল।
অবশেষে আমরা তিন বন্ধু- আমি, কথা আর সুহাস প্রেমের তিন আসামি হয়ে গেলাম। আর আমাদের প্রথম প্রেম? আহা, অঙ্কুরেই বিনষ্ট! ফুল হওয়ার আগেই কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের মতো আঁধারে মিলিয়ে গেল।