ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে নাবিলা বলল- আশ্চর্য, এত অনুরোধ করার পরও তুমি আমাদের বাসায় আসবে না কেন? আর কতবার বলব! প্লিজ কাল এসো।
নাবিলাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, আমি বাইরের ছেলে। তুমি মেয়ে মানুষ। আমার উপস্থিতি তোমার ফ্যামিলি মেম্বাররা কীভাবে অ্যাকসেপ্ট করবেন!
নাবিলা কড়া গলায় বলল, কেউ কিচ্ছু মনে করবে না। তুমি আমি বেস্ট ফ্রেন্ড- এটা আমার মা, ভাইয়া ও ভাবিরা জানে।
তৃপ্তির ঢেকুর গিলে বললাম, তা হলে কাল দেখা হবে। বিকেলে আসব। সারা বিকেল তোমাদের সঙ্গে গল্প করে সন্ধ্যায় ফিরব।
আমোদিত গলায় নাবিলা বলল, সত্যি!
এই হলো নাবিলা। ওর সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয়। অন্য কিছু নয়, আমাদের সম্পর্ক স্রেফ বন্ধুত্বেই সীমাবদ্ধ। খুবই ভদ্র মেয়ে। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ছে। পদিপাড়ায় থাকে। আমার বাড়ি থেকে পদিপাড়ার দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। ওদিকে খুব একটা যাওয়া হয় না।
ফেসবুকে নাবিলার কাছ থেকে বাড়ির ঠিকানা নিয়ে পরদিন বিকেলে রওনা দিলাম। পদিপাড়া বাজারে এসে মনে হলো, খালি হাতে ওদের বাড়ি যাওয়াটা ঠিক হবে না। কিছু নেওয়া দরকার। একটা কনফেকশনারিতে ঢুকলাম। সেখানে উন্নতমানের বিস্কুটের সমারোহ। হ্যাঁ, নাবিলাদের বাড়িতে এমন বিস্কুট নেওয়া যেতে পারে।
বিক্রেতা বয়স্ক মানুষ। একটু সেলফিশ স্বভাবেরও। আমি এত পদের বিস্কুট কিনেছি দেখেও তার মাঝে কোনো আন্তরিকতা দেখা যাচ্ছে না। দর কষাকষি করেও লাভ হয়নি। তিনি এক পয়সাও ছাড় দেবেন না।
কী আর করা, ব্যাগভর্তি বিস্কুট কিনে যেই না দোকান থেকে বের হব, আকাশ কাঁপিয়ে বৃষ্টি নামল। এই অবেলায় বৃষ্টি নামল কেন কে জানে!
বৃষ্টি কমার লক্ষণ নেই। বসে আছি কনফেকশনারিতে। ওই তো, একটা ছাতা দেখা যাচ্ছে। বিক্রেতাকে বললাম- চাচাজান, ছাতাটা দেবেন?
হুংকার ছেড়ে বললেন- না, দেওয়া যাবে না।
অনুনয় করে বললাম, ছাতাটা দিন। উপকার হবে। যাওয়ার সময় ছাতাটা দিয়ে যাব।
এক সময় তিনি নরম হলেন। ছাতাটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, মনে করে দিয়ে যেও।
ঝুম বৃষ্টিতে নাবিলাদের বাড়ি পৌঁছাতে কষ্ট হয়নি। ছাতাটা সিঁড়ির আড়ালে রেখে ঘরে ঢুকতেই নাবিলার মা-ভাবিরা বললেন, এতকিছু নিয়ে এসেছ তুমি? কী দরকার ছিল!
নাবিলার পরিবারের সদস্যরা আমার সঙ্গে গল্পের আসর বসালেন। টি-টেবিলে নানা পদের নাশতা চলে এল। বাইরে তখনো তুমুল বৃষ্টি।
ঘড়ির কাঁটা কখন যে ১০টার ঘরে পৌঁছাল বুঝতেই পারলাম না। তখনই দরজায় টোকা পড়ল। নাবিলা দরজা খুলে বৃষ্টিতে কাকভেজা বাবাকে দেখে বলল, সে কী বাবা! তুমি তো ভিজে জবুথবু। ছাতা কোথায়?
দুয়ারে দাঁড়িয়ে গা মুছতে মুছতে নাবিলার বাবা বললেন, আর বলিস না। একটা ইতর আমার ছাতা নিয়ে ফেরত দেবে বলে আর আসেনি। আমার ৫০০ টাকা দামের ছাতা নিয়ে ভেগেছে। একবার পাই তো কাঁচা গিলে খাব।
তার পর ভেজা পোশাকে নাবিলার বাবার পরিচয় নিয়ে যে লোকটি ঘরে ঢুকলেন, তাকে দেখে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। এ কাকে দেখছি! এ তো সেই কনফেকশনারির বিস্কুট বিক্রেতা।