ঢাকা ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ফিলিপাইনে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতা জারি টেকনাফে বজ্রপাতে সাগরপারের দোকান ক্ষতিগ্রস্ত স্পেসএক্সের শেয়ার যেভাবে কিনবেন, ঝুঁকি কী গাইবান্ধায় প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত ছোট ভাই, আশঙ্কাজনক বড় ভাই ময়মনসিংহে ডিসি অফিসে বিএনপির বর্তমান ও বহিষ্কৃত নেতার হাতাহাতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাত ও পায়ের গঠন কেমন ছিল? ঈশ্বরদীতে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুসহ নিহত ২ চুরি, সিস্টেম লস ও ভর্তুকিতে ঘুরপাক পঞ্চগড়ে ব্যর্থ হয়ে চার দিন পর ১০ জনকে ফিরিয়ে নিল বিএসএফ রামিসা হত্যা মামলার রায় যেভাবে কার্যকর হবে রৌমারী সীমান্তে বিএসএফের পুশইনের চেষ্টা মুক্তাগাছায় পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু পটুয়াখালীতে জলোচ্ছ্বাস ঠেকানো সবুজ দেয়াল বিলীন! আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর চলচ্চিত্র 'সাঁকোটা দুলছে' বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে সরকারের ব্যাপক প্রস্তুতি রাঙামাটিতে আওয়ামী লীগ -যুবলীগ নেতাসহ গ্রেপ্তার ২১ পুশইন ব্যর্থ, দুদিন পর হরিপুর সীমান্ত থেকে ১১ জনকে ভারতের অভ্যন্তরে নিল বিএসএফ বিশ্ব সমুদ্র দিবস আজ ই-ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়াল এনবিআর ময়মনসিংহে ধসে পড়া বেইলি ব্রিজটি ১০ বছর ধরে ছিল ঝুঁকিপূর্ণ সাদুল্লাপুরে কাভার্ডভ্যানে ট্রাকের ধাক্কা, নিহত ১ লেবানন থেকে ড্রোন হামলায় ফিরল দুই রেমিট্যান্স যোদ্ধার মরদেহ মতিঝিলে ব্যাংকের সামনে দিনদুপুরে ব্যবসায়ীকে গুলি করে দুর্ধর্ষ ছিনতাই বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার পথে ইলন মাস্ক কালজানি ও দুধকুমারের কালো রূপ: বর্ষার আগেই নদীগর্ভে শতাধিক বাড়ি চাকরি না পেয়ে ইউটিউব দেখে আম চাষ, লক্ষাধিক টাকা আয় মিত্রদের ক্ষয়ক্ষতি পূরণে ইরানের সম্পদ ব্যবহারের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত সন্তানের বাবা-মায়ের শেষ ঠিকানা কেন বৃদ্ধাশ্রম? সৌরবিদ্যুৎ খাতে বাড়তি কর চাপানো ঠিক হবে না
Nagad desktop

রয়েল বেঙ্গল বিউটি পার্লার

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬, ০১:১৬ পিএম
রয়েল বেঙ্গল বিউটি পার্লার
এঁকেছেন মাসুম

গ্রামের নাম শান্তিপুর। গ্রামের নামের সঙ্গে এর মানুষজনের কর্মকাণ্ডেরও মিল ছিল। সবখানেই একটা শান্তিপূর্ণ ভাব বজায় থাকত। গ্রামের মানুষজন যখন ঝগড়াঝাঁটি করত, সেখানেও একটা শান্তিপূর্ণ ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করত। খালি মাঝে মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যেসব কথা কাটাকাটি বা ঝগড়া হতো, সেসব মাঝে মধ্যে খানিকটা শান্তির সীমানা পার করে ফেলত। তবে সে সবের স্থান-কাল নিজ নিজ শয়নকক্ষ থাকত বলে তা নিয়ে খুব একটা ঝামেলা হতো না। 
সেই শান্তিপুরের বাজারে একদিন বিশাল এক তাঁবু খাটানো হলো। অনেকটা সার্কাস পার্টি যেমন খাটায়। সাইনবোর্ডে লেখা হচ্ছিল ‘রয়েল বেঙ্গল বিউটি….’। 
গ্রামের মানুষ মোটামুটি ধরেই নিল আরেকটা সার্কাস পার্টি এসে গেছে। গতবারেও এই নামেরই একটা সার্কাস পার্টি এসেছিল যার আগে শুধু ছিল নিউ। মানে ‘দ্য নিউ রয়েল বেঙ্গল বিউটি সার্কাস’। কিন্তু শান্তিপুরের মানুষজনের সব ধ্যান-ধারণা আর শান্তি ভেঙে দিয়ে সাইনবোর্ডে লেখা হলো, ‘রয়েল বেঙ্গল বিউটি পার্লার’। 
খুব সুন্দর দুজন নারীর ছবির পাশাপাশি নিচে লেখা ছিল, ‘শুধু নারীদের জন্য, পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ।’  
‘পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ।’ এই লেখা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামের যত পুরুষ ‘রয়েল বেঙ্গল বিউটি পার্লার’-এর আশপাশে ভিড় জমাল।  চারপাশে খবর ছড়িয়ে পড়ল এটা আসলে একটা বিউটি পার্লার। যেখানে মেয়েদের মুখ, চুল এসব আরও বেশি সুন্দর রাখার জন্য নানা ধরনের ব্যবস্থা আছে। এককথায় মাইয়াগো সেলুন। 
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সেই পার্লারে প্রথমবারের মতো ঢুকে পড়ল গ্রামের অবস্থাপন্ন পরিবার নজু শেখের বউ রাহেলা। রাহেলা বের হলো চুলে শ্যাম্পু আর মুখে কি যেন করে। গ্রামে ফিসফিস ছড়িয়ে পড়ল, ‘নজু শেখের বউ রাহেলা সুন্দর হইয়া গেসে।’ 
এই কথা রাহেলার কানে যেতেই সে বলল, ‘মুখপোড়া হনুমানের দল, আমি কোনদিন সুন্দর আছিলাম না?’ 
এই বলে সে তার সদ্য স্ট্রেইট করা চুল বাতাসে ঝাঁকি মারল। 
বেশিদিন লাগল না, গ্রামের নারীরা ধীরে ধীরে বিউটি পার্লারের দিকে যেতে লাগল। কেউ ফেসিয়াল করে, কেউ চুল ঠিক করে। গ্রামের পুরুষরা বিরক্ত হয়ে পড়ল। প্রথম থেকেই তারা বিরক্ত ছিল, প্রধানত পার্লারের ভেতরে ঢুকতে না দেওয়ার কারণে। এইবার তারা বিরক্ত, কেননা টাকা পয়সা যেতে শুরু করেছে। বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছাল যেদিন করিম উল্লাহর বউ বলল, সে আজ থেকে আর ঘরের কাজ করতে পারবে না, কেননা তার হাত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পার্লার থেকে তাকে হাতের কাজ কম করতে বলেছে। 
এই ঝামেলার মধ্যেই একদিন জামাল মিয়ার মেয়ে আর নওয়াব মিয়ার বউয়ের কপালে আর মুখে দেখা গেল ব্রণ। তারা দুজনেই ‘রয়েল বেঙ্গল বিউটি পার্লার’-এর নিয়মিত খদ্দের। দুজনেই খুব চিন্তায় পড়ে গেল। রয়েল বেঙ্গল বিউটি পার্লারে যেতেই সেখান থেকে তাদের বলা হলো, কোনো একজন চর্মরোগ ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে। এখন গ্রামে এ ধরনের ডাক্তার পাবে কই? 
তার এক সপ্তাহ পর সকালেই দেখা গেল শান্তিপুর গ্রামে একটা ভ্যান গাড়িতে এক কবিরাজ হাজির। সাইনবোর্ডে লেখা, ‘চর্মরোগ চিকিৎসক রাজা মিয়া।’
ততদিনে ব্রণ, চুল পড়া, খুশকি এ ধরনের অনেক রোগী হাজির। সকাল থেকে লাইন পড়ে গেল সেই কবিরাজের সামনে। সেই কবিরাজ থেকে চিকিৎসা নিয়ে কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে তারা আবার পার্লারে যায়। আবার কিছুদিন পর নানা ধরনের চর্মরোগ দেখা যায়। আবার তারা কবিরাজের কাছে যায়। পার্লার-কবিরাজ-পার্লার এই এক অদ্ভুত চক্র সৃষ্টি হল শান্তিপুর গ্রামের নারীদের জন্য। ম্যালেরিয়া মশার জীবন চক্রের মতো। 
পার্লার আর চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের টাকা জোগাতে জোগাতে খেপে গেল গ্রামের লোকজন। এক বৈঠকে গ্রামের প্রায় সব পুরুষ এক হলো। তাদের স্ত্রীরা আগে কী সুন্দর কাঁচা মেহেদী বেটে চুলে লাগাত, মাথায় সরিষার তেল দিত, কত সুন্দর লাগত তাদের...সেই সব নিয়ে আলোচনা হতে লাগল। নজু শেখকে প্রধান করে একটা কমিটি করা হলো। নাম দেওয়া হলো, ‘পাদক’। পার্লার দমন কমিটি। 
‘পাদক নামটা কেমন অশ্লীল হইয়া গেল না?’ একজন আপত্তি করল।
‘কিয়ের অশ্লীল? নামটা অশ্লীল সেটা চোখে পড়তেসে, এই পার্লার আর কবিরাজ বেডা মিইলা কামডা কি করতেসে হেইডা চোখে পড়ে না?’ 
‘পাদক’-এর তদন্তে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। পাদকের প্রধান খোদ নজু শেখ হলো এই পার্লারের প্রকৃত মালিক। আর সেই কবিরাজ হলো তার বন্ধু। পার্লারে নিম্নমানের জিনিস গ্রামের নারীদের রূপচর্চায় ব্যবহার করা হতো। আবার এদিকে কবিরাজ চিকিৎসার মাধ্যমে হাতিয়ে নিত মোটা অঙ্কের টাকা। যার একটা অংশ যেত নজু শেখের পকেটে। 
গ্রামের লোকজনের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পালাল পার্লারের লোকজন। নজু শেখ তার বউকে নিয়ে অন্য গ্রামে পাড়ি জমাল। আর চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের চর্ম প্রায় খুলেই নিল গ্রামের লোক। শান্তি ফিরে এল আবার শান্তিপুরে। অনেকদিন পর গ্রামের মেয়েরা মাথায় ঘানি ভাঙা সরিষার তেল দিয়ে বিকেলে ঘুরতে বের হলো।

সোনাই চাচার চামড়াকাণ্ড

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম
সোনাই চাচার চামড়াকাণ্ড
ছবি জেমিনি এআই

শাকপালা গ্রামের মানুষজন এমনিতেই একটু রসিক প্রকৃতির। এখানে কারও হাঁস ডিম কম দিলেও সেটা নিয়ে তিন দিন আলোচনা চলে। আর কোরবানির ঈদ এলে তো পুরো গ্রামটাই যেন হাসি-আনন্দের মেলায় পরিণত হয়!
গ্রামের সবচেয়ে আলোচিত মানুষ সোনাই চাচা। গোলগাল চেহারা, মাথাভর্তি সাদা চুল আর বিশাল গোঁফ—দেখলেই মনে হয় তিনি গ্রামের চেয়ারম্যান না হলেও অন্তত হাসির মন্ত্রী। তবে নিজের বিষয়ে তার ধারণা আরও বড়। তিনি প্রায়ই বলেন,
–এই গ্রামে আমার মতো অভিজ্ঞ মানুষ আর দুইটা নাই!
এবার ঈদে সোনাই চাচা এক বিশাল বোম্বাই ষাঁড় কোরবানি দিলেন। গরুটা এত বড় ছিল যে, পাশের বাড়ির রফিক মিয়া বলল–চাচা, এই গরু তো দেখে মনে হয় হাইস্কুলের হেডমাস্টার!
কোরবানি শেষ হতে না হতেই শুরু হলো চামড়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক। সোনাই চাচা চামড়ার দিকে এমন নজরে তাকিয়ে আছেন, যেন ওটা সোনার খনি।
তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, চামড়া সাবধানে ধরো। গত বছর জব্বাররা ভাঁজ কইরা এমন অবস্থা করছে, মনে হইছিল পুরান বালিশের কভার!
পাশ থেকে রঞ্জু হেসে বলল–চাচা, চামড়া কি ইস্ত্রি কইরা রাখুম?
সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
এদিকে গ্রামের মসজিদের মাইকে ঘোষণা এল—চামড়া এতিমখানায় দিলে ভালো হয়। তখনই গ্রামের সবাই হঠাৎ দানবীর হয়ে গেল।
জব্বার বলল, আমি আমার চামড়া মাদ্রাসায় দিমু।
রঞ্জু বলল, আমি এতিমখানায়।
সোনাই চাচা গোঁফে হাত বুলিয়ে বললেন, আমি দুই জায়গাতেই দিতে চাই, কিন্তু গরু তো একটা!
আবারও হাসির ঝড় উঠল উঠানে।
এদিকে গ্রামের তিন দুরন্ত ছেলে লিটু, মিঠু আর সেন্টু—চুপিচুপি অন্য ফন্দি আঁটছিল। তারা ঠিক করল, চামড়া দিয়ে একটা ভূত বানাবে। সন্ধ্যার পর মানুষকে ভয় দেখানো হবে।
রাত নামতেই তারা বাঁশঝাড়ের পাশে চামড়াটা খুঁটির সঙ্গে টাঙিয়ে দিল। দূর থেকে দেখে সত্যিই মনে হচ্ছিল, কোনো আজব প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে।
ঠিক তখন সোনাই চাচা টর্চ হাতে সেদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ টর্চের আলো চামড়ার ওপর পড়তেই তিনি থমকে গেলেন। চামড়ার ভেতর থেকে সেন্টু চাপা গলায় বলল, আমি চামড়ার আত্মা!
সোনাই চাচার মুখ শুকিয়ে গেল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, ইন্নালিল্লাহ… চামড়ারও আবার আত্মা আছে নাকি!
তার পর এমন দৌড় দিলেন যে, স্যান্ডেল একদিকে আর লুঙ্গির গিঁট অন্যদিকে চলে গেল।
পরদিন সকালে পুরো শাকপালা গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ল—সোনাই চাচা নাকি চামড়ার ভেতর ভূত দেখেছেন!
চায়ের দোকানে সবাই মজা নিচ্ছে। 
রঞ্জু বলল–চাচা, ভূত কি চামড়ার দাম চাইছিল?
সোনাই চাচা এবারও গম্ভীর মুখে বললেন, ভূতটা খুব ভদ্র আছিল। আগে সালাম দিছে!
এই কথা শুনে দোকানের লোকজন এমন হেসে উঠল যে, এক লোকের হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেল!
শেষ পর্যন্ত লিটু, মিঠু আর সেন্টুর দুষ্টুমি ধরা পড়ে গেল। সোনাই চাচা প্রথমে রাগ দেখালেও পরে নিজেই হেসে বললেন, ঠিক আছে, তোদের জন্যই গ্রামের মানুষ দুই দিন হাসছে। এই হাসিরও কম দাম না!
তার পর চামড়াটা দান করে তিনি বাড়ির পথে হাঁটতে লাগলেন। পশ্চিম আকাশে তখন নরম লাল আলো। গ্রামের রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে আছে ঈদের আনন্দ, আর মানুষের মুখে মুখে ভাসছে সেই বিখ্যাত কথা, চামড়ার ভেতরেও নাকি আত্মা আছে!

নাক ডাকলে ঘুম আসে

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম
নাক ডাকলে ঘুম আসে
এঁকেছেন মাসুম

আনিস সাহেবের নাকের ডাক কোনো সাধারণ শব্দ নয়। এটি একাধারে কামানের গর্জন, মালবাহী ট্রেনের ব্রেক কষার আওয়াজ এবং মেঘের ডাকের এক অপূর্ব ককটেল। বিয়ের আগে আনিস সাহেবের মা বলেছিলেন, ‘আমার ছেলেটা একটু নাক ডাকে বাবা, তবে মনটা বড় ভালো।’
বিয়ের প্রথম রাতেই আনিস সাহেবের স্ত্রী সুফিয়া বুঝতে পেরেছিলেন, ওই ‘একটু’ শব্দের গভীরতা কতখানি। বিয়ের পর প্রথম তিন মাস সুফিয়ার কেটেছিল সম্পূর্ণ ঘুমহীন অবস্থায়। আনিস সাহেবের নাক ডাকা শুরু হলেই সুফিয়ার মনে হতো, ঘরের ছাদ বুঝি এইমাত্র ভেঙে মাথায় পড়ল। বালিশচাপা দিয়ে, কানে তুলো গুঁজে, এমনকি বারান্দায় গিয়েও সেই শব্দের হাত থেকে রেহাই মেলেনি। 
অতিষ্ঠ হয়ে সুফিয়া একদিন আনিস সাহেবকে বললেন, ‘তোমার এই নাকের ট্রেনের হর্ন বন্ধ না হলে আমি বাপের বাড়ি চলে যাব।’ 
আনিস সাহেব পড়লেন মহাফাঁপরে। তিনি পরিচিত ডাক্তার মন্টু বিশ্বাসের কাছে গেলেন। 
মন্টু বাবু চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন, ‘মিয়া ভাই, নাক ডাকা বন্ধের ওষুধ তো নেই। তবে একটা থেরাপি আছে। আজ থেকে ভাবিকে বলবেন, আপনি ঘুমানোর পর উনি যেন আপনার নাকের ডাক রেকর্ডিং করে শোনেন। সাইকোলজি বলে, নিজের স্বামীর আওয়াজ শুনলে নাকি স্ত্রীদের মন শান্ত হয়।’
আনিস সাহেব বাড়ি ফিরে সুফিয়াকে বুঝিয়ে রাজি করালেন। প্রথম রাতে সুফিয়া মোবাইলে আনিস সাহেবের সেই বিকট নাক ডাকা রেকর্ড করলেন। শব্দের তীব্রতায় মোবাইল ফোনটাই যেন কেঁপে কেঁপে উঠছিল। 
পরদিন দুপুরে আনিস সাহেব যখন অফিসে, তখন সুফিয়ার ভীষণ ক্লান্তি লাগল। ভাবলেন একটু ঘুমাবেন, কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। এপাশ-ওপাশ করতে করতে হঠাৎ তার আনিস সাহেবের সেই রেকর্ডিংটার কথা মনে পড়ল। রসিকতা করেই তিনি রেকর্ডিংটা চালু করলেন।
ঘরজুড়ে বেজে উঠল–ঘঁড়ড়ড়...ঘঁড়ড়ড়...ফুসসস! 
কী অদ্ভুত কাণ্ড! তিন মাস ধরে যে শব্দ সুফিয়ার ঘুম কেড়ে নিয়েছিল, সেই শব্দ শোনার ঠিক দুই মিনিটের মাথায় তার চোখজোড়া ভারী হয়ে এল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সুফিয়া একদম গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন! 
আসলে গত কয়েক মাসে সুফিয়ার কান এই শব্দের সঙ্গে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে, এখন এই শব্দটাই তার জন্য ঘুমপাড়ানি গান হয়ে উঠেছে! এটা না শুনলে তার মস্তিষ্ক সিগন্যালই পাচ্ছিল না যে এখন ঘুমানোর সময় হয়েছে।
বিকেলে আনিস সাহেব অফিস থেকে ফিরে দেখলেন সুফিয়া পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন, আর পাশে মোবাইলে তখনও বাজছে–ঘঁড়ড়ড়...ফুঁসসস...
আনিস সাহেব অবাক হয়ে সুফিয়াকে ডেকে তুললেন। সুফিয়া চোখ ডলতে ডলতে বললেন, ‘ওগো, ডাক্তার বাবু ঠিকই বলেছেন! তোমার নাক ডাকার আওয়াজটা আসলে একটা মিউজিক। এটা শুনলে আমার এত চমৎকার ঘুম আসে যা কোনোদিন আসেনি!’
এর পর থেকে আনিস সাহেবের সংসারে শান্তি ফিরে এল। আনিস সাহেব যখনই অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে যান, সুফিয়া তখন ঘুমানোর জন্য কানে হেডফোন গোঁজেন। হেডফোনে তখন উচ্চশব্দে বাজতে থাকে আনিস সাহেবের সেই সিগনেচার টিউন– ঘঁড়ড়ড়...ঘঁড়ড়ড়...ফুঁসসস!  
আর সুফিয়া মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।

জনৈক যুবকের পুঞ্জীভূত কষ্ট

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
জনৈক যুবকের পুঞ্জীভূত কষ্ট
এঁকেছেন মাসুম

বাবা মালাইভোগ খুব পছন্দ করতেন। তারই আলোকে ছেলের নাম রেখেছিলেন মালাই-উর-রেহমান। একটু আনকমন নাম, কিন্তু প্রতিবেশীরা ব্যাপারটি মেনে নিয়েছিলেন। মালাইয়ের বন্ধুরাও মানবতার খাতিরে আপত্তি করেননি। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল প্রেম করতে গিয়ে। ক্লাসমেট রিমঝিমকে পছন্দ করলেন, কিন্তু রিমঝিমের এক কথা, ‘মালাই খাওয়ার জিনিস, প্রেম করার জিনিস না। এই নামের কোনো মানুষের সঙ্গে প্রেম-ভালোবাসা হতে পারে না। আগে নাম চেঞ্জ করেন, তার পর এ ব্যাপারে ভাবব।’ 
সেদিনই মালাই-উর-রেহমান দৃপ্ত শপথ নিলেন, ‘মালাইভোগ খাইয়ে রিমঝিমকে বোঝাব মালাই কী জিনিস! মালাই ভালো লাগলে মালাই-উর-রেহমানকেও ভালো লাগবে। তার পর নিশ্চয়ই সে প্রেমের জালে ধরা দেবে।’
যেমন ভাবা তেমন কাজ। প্রাথমিক পরিকল্পনা করার জন্য মালাই-উর-রেহমান তার বন্ধুবর হিমেলের বাসায় তশরিফ আনলেন। ঘটনা শুনে হিমেল অবাক, “এই আক্রার বাজারে রিমঝিমকে মালাইভোগ কীভাবে খাওয়াবি? যে দাম রে বাবা! তার চেয়ে চল ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ এনে খাওয়াই। স্বাদে দারুণ, আবার খরচও কম।” 
মালাই-উর-রেহমান এবার বিরক্ত না হয়ে পারলেন না, “ধুর ব্যাটা, রিমঝিম তো পোলা না যে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ খাবে? ওকে মালাইভোগই খাওয়াব।” 
অগত্যা কী আর করা, দুই বন্ধু মালাইভোগ জোগাড় করার জন্য বেরিয়ে পড়লেন। এই দোকান, সেই দোকান ঘুরে কোথাও মালাইভোগ না পেয়ে যখন মালাই-উর-রেহমান দিশাহারা, ঠিক তখনই মোবাইল বেজে উঠল। ফোন রিসিভ করে বললেন, ‘হ্যালো, মালাই হেয়ার।’ 
ওপাশ থেকে জবাব এলো, ‘ভাই, আপনে কি মালাইভোগ খুঁজবার লাগছেন?’ 
মালাই-উর-রেহমানের চোখ জ্বল জ্বল করে উঠল, ‘জি ভাই। আপনার কাছে মালাইভোগ আছে নাকি?’ 
‘জি না, নাই। তবে আপনে চাইলে মালাইভোগ বানানোর রেসিপি আর সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারি।’–অপর পাশ থেকে জবাব এল। 
মালাই-উর-রেহমান এমনই একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। দেরি না করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘অবশ্যই সরবরাহ করবেন। কোথায় আসতে হবে বলেন?’
ঘণ্টা দুই পরের কথা। মালাই-উর-রেহমান মালাইভোগ বানানোর রেসিপি হাতে তার কিচেনে বসে আছেন। রেসিপিতে লেখা–
আইটেম : মালাইভোগ
উপকরণ : ছানা ১ কাপ, দুধ ২  লিটার, সুজি ১ চা চামচ, ময়দা ১ টেবিল চামচ, বাটার অয়েল আধা চা চামচ, বেকিং পাউডার এক চিমটি, চিনি ৩ কাপ, পানি ৬ কাপ, মালাই সিকি কাপ, ক্ষীরশা সিকি কাপ, এলাচ গুঁড়া সামান্য।
প্রণালি : মালাই, ক্ষীরশা, এলাচ গুঁড়া একসঙ্গে ব্লেন্ডারে অথবা মিক্সিতে মিক্স করে রাখতে হবে। ময়দা, বাটার অয়েল, বেকিং পাউডার একসঙ্গে ঘোঁটা দিয়ে সুজি ও দুধ ছেড়ে দিতে হবে। তার পর জাল দিয়ে দুধ টানিয়ে নিতে হবে। দুধ টানানো শেষ হলে ছানা দিয়ে আবার মাখতে হবে। মিশ্রিত ছানা ১২ ভাগ বা ইচ্ছামতো ভাগ করে গোল্লা বানিয়ে হাত দিয়ে চ্যাপ্টা করে শিরায় ছাড়তে হবে। ২০ থেকে ২২ মিনিট ঢাকনা দিয়ে ঢেকে জ্বাল দিতে হবে। চুলা বন্ধ করে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট ঢেকে রাখতে হবে। মিষ্টিগুলো চার-পাঁচ ঘণ্টা সিরায় ভিজিয়ে রেখে সিরা থেকে উঠিয়ে টিস্যু পেপারের ওপর কিছুক্ষণ রেখে মাঝখানে চিরে দুই ভাগ করে মালাই ক্ষীরশার মিশ্রণের প্রলেপ দিয়ে ওপরে কিশমিশ সাজিয়ে পরিবেশন করতে হবে।
মালাই-উর-রেহমান দেরি না করে কাজে হাত দিলেন। রেসিপি দেখে মালাইভোগ বানাতে খুব একটা সময় লাগল না। এবার রিমঝিমের সামনে পরিবেশনের পালা। 
পরের দিন ক্লাসে এসে মালাইভোগ পেশ করতেই রিমঝিম খুশি মনে টপাটপ গলাধঃকরণ করলেন। তার পর এল আবার প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার পালা। প্রস্তাব শুনে রিমঝিম বললেন, ‘এত চমৎকার খাবারের সঙ্গে আপনার নামের এত্ত মিল! আমি অভিভূত। আপনার প্রস্তাব আমি মানব কি মানব না, তা রাতে জানাব। মিসকল দিলে ব্যাক করবেন কেমন?’
সময় যেন আর কাটে না। মালাই-উর-রেহমান বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পায়চারি করে কাটালেন। তার পর এল রাত। কিন্তু মিসকল তো আসে না। ১টা বাজল, ২টা বাজল, ৩টার সময় মালাই-উর-রেহমান আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না। রিমঝিমের মোবাইলে ফোন করলেন। তিন রিং হতেই ফোন রিসিভ হলো। মালাই বললেন, ‘হ্যালো রিমঝিম, মিসকল দেওয়ার...।’ 
কথা শেষ হওয়ার আগেই ওপাশ থেকে কেউ একজন বললেন, ‘আমি রিমঝিমের মামা বলছি। রিমঝিম তো হাসপাতালে। কে যেন ওকে মাখনের পানি আর ফরমালিন দিয়ে বানানো নকল দুধের খাবার খাইয়েছে। সেই থেকে চলছে ডায়রিয়া। আমরা ওকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। একটু সুস্থ হোক, তার পর যে ব্যাটা খাইয়েছে তার ১২টা বাজাব।’ 
মামার কথা শুনে মালাই-উর-রেহমান অধিক শোকে পাথর হয়ে গেলেন।

স্বামী-স্ত্রী আর মশা

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ০৪:১১ পিএম
স্বামী-স্ত্রী আর মশা
এঁকেছেন মাসুম

রাতে একসঙ্গে বসে খাবার খাচ্ছেন হাসান ও তার স্ত্রী বিনা। এমন সময় একটি মশা এসে কোনো কথাবার্তা না বলেই বসে পড়ল বিনার গালে। হাসান সঙ্গে সঙ্গেই ধপাস করে একটা থাপ্পড় মেরে দিলেন। বিনা রাগান্বিত হয়ে কিছু বলতে যাবেন, তখনই হাসান বলে উঠলেন, ‘সরি তোমাকে মারিনি। মশাটাকে মেরেছি।’
–ও তাই! মনে রেখো আমিও কিন্তু মশা মারতে পারি।
বিনা অপেক্ষায় আছেন কখন সুযোগ আসবে। হিসাবটা হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেবেন। সত্যি সত্যি কিছুক্ষণ পর একটি মশা এসে বসল হাসানের কপালে। বিনা মারতে যাবেন, অমনি মাথাটা সরিয়ে নিলেন হাসান। বিনার হাতটা গিয়ে লাগল ঘরের দেয়ালে। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলেন বিনা। চোখ দিয়ে বেরিয়ে এল জল।
–সরি, আমি ইচ্ছে করে মাথা নোয়াইনি। পায়ে আরেকটা মশা কামড় দিয়েছিল, সেটাকে মারতে চেয়েছিলাম। 
রাতে হাসান ও বিনা শুয়ে আছেন। ওদিকে মশারির ভেতরে একটি মশা ঘুরঘুর করছে। হাসান বললেন, ‘প্লিজ মশাটাকে মারো।’
–মশা মেরে আমি হাত কালো করতে চাই না। পারলে তুমি মারো।
–আমিও পারব না।
–মশার সঙ্গে না পারলেও বউয়ের সঙ্গে ঠিকই পারো।
–কখন? ক্যামনে?
–সবার সামনে আমার গালে থাপ্পড় দিয়েছিলে কেন?
–মশা তোমাকে কিস করবে, আর আমি তাকে ছেড়ে দেব?
–আমাকে কামড় দিলে কিস! আর তোমাকে যখন কামড় দেয়?
–সেটাকে রক্তদান বলতে পারো। আমি নিঃস্বার্থভাবে তোমার জন্য সবকিছু দিয়ে দিতে পারি। 
–ছয় মাস হলো বিয়ে করেছ। এই ছয় মাসে আমাকে তো তেমন কিছু দাওনি।
–তোমাকে পাওয়ার জন্য বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিয়েছি।
–বুকের তাজা রক্ত আবার কখন দিলে?
–তোমাকে পাওয়ার জন্য কত রাত বিনিদ্র কাটিয়েছি। অন্ধকারে গভীর রাত পর্যন্ত সিঁড়িতে বসে তোমার সঙ্গে চ্যাট করেছি। সে সময় কত মশা হুল বসিয়ে আমাকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। রক্ত চুষেছে। তার কোনো হিসাব নেই।
কথাগুলো একনাগাড়ে বলে নিশ্বাস নেয় হাসান। 
–তাই! তা হলে একটু পরীক্ষা করে দেখি কথা সত্য কি না। 
এই বলে জানালা খোলা রেখে মশারি নিয়ে পাশের রুমে চলে গেলেন বিনা। ভনভন করে রুমে ঢুকতে থাকে হাজার হাজার মশা।

কাঠের পুতুল

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম
কাঠের পুতুল
এঁকেছেন মাসুম

গ্রামের নাম ছিল চকচকিয়া। ছোট্ট শান্ত গ্রাম। তবে সেখানে এক অদ্ভুত মানুষ থাকতেন। নাম তার মোকছেদ কারিগর। তিনি কাঠ দিয়ে নানারকম পুতুল বানাতেন। পুতুলগুলোর কারও হাতে বাঁশি, কারও মাথায় টুপি, আবার কেউ যেন হুবহু গ্রামের মাতবরের মতো দেখতে!
মোকছেদ কারিগরের দোকানের সামনে সব সময় ভিড় লেগেই থাকত। শিশুরা আসত পুতুল কিনতে, বড়রা আসত হাসাহাসি করতে। কারণ, মোকছেদ চাচার পুতুলগুলো শুধু পুতুল ছিল না–মনে হতো যেন গ্রামের মানুষেরই ছোট সংস্করণ।
একদিন তিনি বানালেন এক বিশেষ পুতুল। নাম দিলেন–‘জনাব জব্বার আলি’। পুতুলটার মাথা বড়, গোঁফ বাঁকা, আর মুখে সবসময় হাসি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, পুতুলটার পেটে একটা ছোট বোতাম ছিল। বোতাম চাপলেই সে কথা বলত।
–আমি গ্রামের সবচেয়ে জ্ঞানী লোক!
–আমার কথা ছাড়া এক পা-ও চলবে না!
–আমি না থাকলে সূর্যও উঠতে ভয় পায়!
এই কথা শুনে গ্রামের সবাই হো হো করে হাসত। কিন্তু আসল মজা শুরু হলো রবিবার হাটের দিন ।
সেদিন গ্রামের মাতবর জব্বার আলি নিজেই ডেমরা হাটে এলেন। তিনি ছিলেন দাম্ভিক মানুষ। সবসময় বুক ফুলিয়ে হাঁটতেন আর সুযোগ পেলেই বলতেন, আমার মতো বুদ্ধিমান এই গ্রামে আর কেউ নেই!
হাটে ঢুকতেই তিনি শুনলেন, আমি গ্রামের সবচেয়ে জ্ঞানী লোক!
জব্বার আলি থমকে গেলেন। চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন, একটা কাঠের পুতুল একই কথা বলে যাচ্ছে। লোকজন আবার হাসছে।
তিনি রাগে লাল হয়ে বললেন, এই পুতুল কে বানিয়েছে?
মোকছেদ কারিগর মাথা নিচু করে বললেন,
–আমি বানিয়েছি, মাতবর সাহেব।
–এটা কি আমাকে নিয়ে বিদ্রূপ?
মোকছেদ চাচা মুচকি হেসে বললেন, না না, এটা তো শুধু কাঠের পুতুল। কাঠ কি কখনো মানুষের মতো কথা বলতে পারে নাকি?
চারপাশে আবার হাসির রোল পড়ে গেল। জব্বার আলি আরও রেগে গেলেন। তিনি পুতুলটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। হঠাৎ ভুল করে পেটের বোতামে চাপ পড়ে গেল।
পুতুল বলে উঠল, আমি ভুল করলেও কখনো ভুল স্বীকার করি না!
এবার তো সবাই হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল। কেউ হাঁটুতে হাত চাপড়ায়, কেউ চোখের পানি মোছে।
জব্বার আলি মুখ গোমরা করে বললেন, এই পুতুল আমি কিনে নিলাম!
তিনি অনেক টাকা দিয়ে পুতুলটা কিনে বাড়ি নিয়ে গেলেন। ভাবলেন, রাতে চুপিচুপি পুড়িয়ে ফেলবেন। কিন্তু রাতে ঘটল অন্য ঘটনা।
ঘরের মধ্যে হঠাৎ আওয়াজ–
–আমি সবচেয়ে বড় নেতা!
–আমার কথাই শেষ কথা!
জব্বার আলি ভয় পেলেন। তাকিয়ে দেখেন, তার ছোট ছেলে বোতাম টিপে টিপে হাসছে।
ছেলেটা বলল, আব্বা, এই পুতুলটা তো তোমার মতো কথা বলে! 
জব্বার আলি হতাশ হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। তার পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তা হলে কি আমি সত্যিই এমন হয়ে গেছি?
পরদিন সকালে তিনি আবার মোকছেদ কারিগরের দোকানে গেলেন। সবাই ভাবল, এবার বুঝি ঝামেলা হবে। কিন্তু না, জব্বার আলি শান্ত গলায় বললেন, মোকছেদ, তোমার পুতুল আমাকে একটা শিক্ষা দিয়েছে। মানুষ যখন নিজের কথা ছাড়া কিছুই শুনতে চায় না, তখন সে কাঠের পুতুলের মতোই হয়ে যায়।
মোকছেদ চাচা হেসে বললেন, কাঠের পুতুলের সমস্যা কি জানেন? ওরা নিজেরা নড়ে না, অন্যের সুতোয় নড়ে।
সেদিনের পর থেকে জব্বার আলি বদলে গেলেন। আগের মতো আর অহংকার করতেন না। গ্রামের মানুষের কথা মন দিয়ে শুনতেন।
আর মোকছেদ কারিগরের দোকানের সামনে নতুন একটা সাইনবোর্ড ঝুলল–‘এখানে কাঠের পুতুল বিক্রি হয়,
কিন্তু মানুষ যেন পুতুল না হয়!’