ঢাকা ১ আষাঢ় ১৪৩১, শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪

আমেরিকান ফুল সোনাপাতি

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৪, ০৯:৫৮ এএম
আপডেট: ৩১ মে ২০২৪, ০৯:৫৮ এএম
আমেরিকান ফুল সোনাপাতি
শাহবাগে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের উদ্যানে গ্রীষ্মে ফোটা সোনাপাতি ফুল। ছবি: লেখক

শাহবাগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সুপার স্পেশালাইজড একটি হাসপাতাল আছে। সে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ছোট্ট একটি নান্দনিক উদ্যান গড়ে তোলা হয়েছে। গাছপালাও তরুণ, এখনো ছায়া দেওয়ার মতো যথেষ্ট বড় হয়নি। কিন্তু তাতে কী? জারুল আর লাল সোনালু গাছগুলোতে ফুল ফোটা শুরু না হলেও সোনাপাতি গাছগুলো সে অভাব পুষিয়ে দিচ্ছে। সোনারঙা হলদে ফুলগুলো ফুটছে থোকা ধরে। গাছের কাছে গেলে সেসব ফুলের মিষ্টি সুবাসে মন ভরে যাচ্ছে। জ্যৈষ্ঠের খরতাপে মাঝে মাঝে দমকা হাওয়ায় সে সুবাস চলে যাচ্ছে দুরান্তে। ভোরের আলোর ছটা ঠিকরে পড়ছে ফুলগুলোর গায়ে, চাপ চাপ ছায়া মেখে আছে ঝোপাল সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে। কালো, হালকা সবুজ, গাঢ় সবুজ, হলুদ, উজ্জ্বল হলুদ- আহা কত রঙের খেলা চলছে গাছগুলোর পরতে পরতে। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে সে দৃশ্যের সঙ্গে দেখা যায় মৌমাছিদের নাচানাচি। ওদের মেয়েগুলো বড্ড বদমাশ, একটি মেয়ে মৌমাছি নাচিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে অনেকগুলো পুরুষ মৌমাছিকে। পরিষ্কার নীল আকাশে সে উড়ছে আর সর্পিল আকারে নেচে বেড়াচ্ছে। পুরুষগুলোও মেয়েটির সঙ্গে মিলনের আশায় নেচে নেচে তার পিছু ছুটে বেড়াচ্ছে। আর বোকা শ্রমিক মৌমাছিগুলো মাথা খুঁড়ে মরছে এ ফুল থেকে ও ফুলে মধু সংগ্রহে। সোনাপাতি ফুলের তো অভাব নেই, তাই সোনাপাতি ফুলেরাও মধুর গুদাম খুলে রেখেছে। মধুগন্ধী সৌরভে টেনে আনছে মৌমাছিদের। বোঝা গেল ধারে কাছে হয়তো কোথাও কোনো গাছে ওরা চাক বেঁধেছে। মেয়ে আর পুরুষ মৌমাছিদের খাদ্য জোগাতে মাইলের পর মাইল দিনভর উড়ে বেড়াচ্ছে ওসব শ্রমিক মৌমাছি। এসব ভাবছি আর সোনাপাতি ফুলে বাতাস আর মৌমাছিদের খেলা দেখছি। ছবি তোলার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ একটি গাড়ির হর্নে ঘোর ভাঙল।

এ রকম আরেকবার ঘোর লেগেছিল গত মাসে রমনা উদ্যানে মৎস্য ভবনের দিকে থাকা প্রবেশপথের কাছে আরেকটি সোনাপাতি ফুলের গাছ দেখে। একটি গাছের তলায় এত ফুল ঝরে সবুজ ঘাসের ওপর থাকতে পারে! পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেই তার সৌরভে উতলা হতে হয়। এ ফুল এ দেশে নতুন না। বিভিন্ন বাগানে ও বাড়ির আঙিনায় অনেক দিন আগে থেকেই লাগানো চলছে। এ গাছ নগরে মোটেই বিরল না, চারদিকে একটু চোখ মেলে তাকালেই এদের চোখে পড়ে। এমনকি রোকেয়া সরণির সড়ক বিভাজকেও এ গাছ লাগানো হয়েছে। নার্সারিগুলোতেও এর চারা পাওয়া যায়। 

এ দেশে এখন সোনাপাতি গাছ যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে মনে হয় সে যেন আমাদের দেশি গাছ। কিন্তু আসলে তা না, গাছটি উত্তর আমেরিকা থেকে নানা দেশ ঘুরে এসেছে আমাদের দেশে। এ গাছের ইংরেজি নাম ইয়েলোবেল বা ইয়েলো এলডার, অন্য একটি বাংলা নাম পেলাম চন্দ্রপ্রভা। এ গাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম টেকোমা স্ট্যানস (Tecoma stans) ও গোত্র বিগ্নোনিয়েসি। এ জন্য একে কেউ কেউ হলদে টেকোমা বলেও ডাকেন। টেকোমা এর মহাজাতি বা গণের নাম। এ গণের অন্তত তিনটি প্রজাতির গাছ এ দেশে আছে। এগুলোর মধ্যে টেকোমা ক্যাপেনসিস প্রজাতির ফুলকে টেকোমা ফুল নামে ডাকা হয়, অন্য নাম কেপ হানি সাকল, এর ফুল কমলা রঙের আর সরু নলের মতো চোঙাকৃতির পাঁপড়ি, বাংলা নাম মৌচুষি। অন্যটি টেকোমা আনডুলাটা, যার বাংলা নাম সোনাদলা। এর কোনোটিই আমাদের দেশের গাছ না।

সোনাপাতি প্রায় চিরসবুজ বহুবর্ষজীবী গুল্ম বা ছোট বৃক্ষ। ঢাকায় ফার্মগেটের কাছে মণিপুরীপাড়ায় একটি সোনাপাতি গাছ দেখেছি, যা পাশের দোতলা ভবনকে ছাড়িয়ে গেছে। এ গাছ ১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পাতা বর্শার ফলার মতো, অগ্রভাগ সুঁচালো, কিনারা সূক্ষ্মভাবে করাতের দাঁতের মতো খাঁজকাটা, পাতা খসখসে। ডালের আগায় থোকা ধরে অনেকগুলো হলদে সোনা রঙের ঘণ্টাকৃতির ফুল ফোটে বসন্ত থেকে হেমন্ত পর্যন্ত। ফুল ফুটলে ফুলের মধু খেতে আসে মৌমাছি, প্রজাপতি ও হামিং বার্ড পাখিরা। হা করে মুখ খোলা ফুলের পাঁপড়ির অগ্রপ্রান্ত পাঁচটি খণ্ডে বিভক্ত হলেও গোড়া যুক্ত হয়ে ফানেলের মতো আকৃতি তৈরি করে। বসন্ত থেকে শরৎ পর্যন্ত প্রচুর ফুল ফোটে। ফল হয়, ফলের ভেতর হলদে রঙের বীজ হয়। বীজে পর্দার মতো ডানা থাকে। ফল পেকে ফেটে গেলে বীজগুলো সে ডানায় ভর করে দূর-দূরান্তে বাতাসে ভেসে যায় ও নিজেদের বংশ বাড়ায়। এর শাখা কেটে কলম করেও সহজে চারা তৈরি করা যায়। চারা লাগানোর পর দ্রুত বাড়ে। পুষ্পিত গাছ থেকে করা শাখা কলমের গাছে পরের বছর থেকেই ফুল ফুটতে শুরু করে। দ্রুত এ গাছ বেড়ে সে স্থানে ঝোপ করে ফেলে। এ জন্য এ গাছকে কোনো কোনো দেশে আগাছার মতো আপদ মনে করা হয়। কিন্তু সোনাপাতি আমাদের দেশে আপদ না, সম্পদ। পুষ্প ও বাহারি গাছের সম্পদ। টবে, বাগানে, উদ্যানে সব জায়গাতেই একে লাগানো যায়। এমনকি পথতরু হিসেবেও দীর্ঘ প্রস্ফুটনের জন্য সমাদৃত।

পথে পথে লিচুর পসরা

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৪, ১২:৪৬ পিএম
আপডেট: ২৮ মে ২০২৪, ১২:৪৬ পিএম
পথে পথে লিচুর পসরা
মৌসুমি ফল লিচু এসেছে রাজধানীর বাজারগুলোতে। বায়তুল মোকাররম এলাকা থেকে তোলা। ছবি : খবরের কাগজ

গ্রীষ্মকাল মানেই হরেক রকম সুস্বাদু ও রসালো ফলের সমাহার। তীব্র তাপের কারণে এই ঋতু অনেকের পছন্দ না হলেও গ্রীষ্মকালীন ফল পছন্দ করেন না, এ রকম মানুষের সংখ্যা হাতে গুনে খুঁজে বের করা যাবে। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরুর দিকেই বাজারে উঠতে শুরু করেছে স্বাদে-গুণে ভরা রসালো ফল লিচু। ক্ষণকালীন এ ফল পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাচ্চা থেকে বুড়ো সবার।

মানুষের চাহিদাকে পুঁজি করে মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও লিচু সংগ্রহ ও বিক্রির ব্যাপারে তৎপর হয়ে ওঠেন।  ফলের দোকান তো বটেই, ভ্যানে ও ঝুড়িভর্তি লিচু জনবহুল জায়গায় বিক্রি করেন তারা। বাজারে লিচু ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই অনেকে হামলে পড়েন মৌসুমি এই ফলের ওপর। ঝুড়িভর্তি লাল টসটসে ফলটি নজরে পড়লেই কেনার জন্য ভিড় জমে যায়।    

বাজারে বিভিন্ন জাতের লিচুর দেখা পাওয়া যায়। এর মধ্যে বছর কদমী, মোজাফফরপুরী, চায়না-৩ বোম্বাই, এলাচি, পাতি ও মাদ্রাজি জাতের লিচুর চাহিদা রয়েছে শীর্ষে। গতকাল  সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাজশাহী আর দিনাজপুরের কিছু লিচু উঠতে শুরু করেছে। পিস হিসেবে বিক্রি হয় এসব।  জাতভেদে বিভিন্ন লিচু ‘শ’ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন দামে। স্থানভেদে রাজশাহীর লিচু প্রতি ১০০ পিস বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে। ক্রেতারা যার যার চাহিদামতো কিনে নিচ্ছেন। 

শুধু স্বাদের দিক থেকেই নয়, স্বাস্থ্যগুণেও ভরপুর এই ফল। আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনের তথ্য, লিচু ভিটামিন-সির বড় একটি উৎস। ভিটামিন-সি স্ট্রোকের ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমিয়ে দেয়। লিচু অ্যান্টিঅক্সিডেন্টেরও একটি ভালো উৎস। এতে অন্যান্য ফলের তুলনায় পলিফেনলের মাত্রা বেশি থাকে। এ ছাড়া লিচু এপিকেটেচিনের একটি ভাণ্ডার, যা হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে এবং ক্যানসার ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে পারে।  এই ফলে আছে রুটিন উপাদান। ফুড কেমিস্ট্রি জার্নালে প্রকাশিত এক সমীক্ষা অনুসারে, রুটিন মানবদেহকে ক্যানসার, ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার সমস্যাগুলোর মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকে বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে।

সোমবার (২৭ মে) বাংলামোটরের ইস্কাটন রোডের ফুটপাতে ভ্যানে করে লিচু বিক্রি করছিলেন মো. ইদ্রিস আলী। তিনি খবরের কাগজকে জানান, বাজারে মৌসুমের নতুন লিচু ওঠা শুরু হয়েছে। তার জন্য মানুষের আগ্রহ অনেক বেশি। তিনি এক হাজার পিস  নিয়ে এসেছিলেন সকাল বেলা। দুপুরের মধ্যেই ৪০০ পিস  বিক্রি করেছেন। 

ফার্মগেটে দিনাজপুরের লিচু বিক্রি করছিলেন নাসির উদ্দীন। তিনি জানান, এসব লিচু আড়ত থেকে পাইকারি দরে সংগ্রহ করেন তারা। পাইকাররা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বাগান হিসাবে লিচু কিনে থাকেন। ঢাকায় পাইকারি আড়ত কারওয়ান বাজারে। সেখান থেকে সর্বনিম্ন ৫০০ লিচু কেনা যায়। পাইকারিতে প্রতি ১০০ পিস লিচু ৩৫০ টাকা পড়ে। তার সঙ্গে পরিবহন ভাড়া যুক্ত হয়। সব খরচ যোগ করে এসব লিচু খুচরা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি করেন ক্রেতাদের কাছে। 

নাসিরউদ্দীন জানান, এ বছর আবহাওয়া লিচু চাষের উপযোগী হওয়ায় ভালো ফলন হয়েছে। সাধারণত জ্যৈষ্ঠের শুরু থেকে আষাঢ়ের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে লিচুর প্রাচুর্য থাকে। চাহিদার বড় জোগান আসে সাধারণত রাজশাহী, দিনাজপুর, পাবনা, রাজবাড়ী, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে। 

হুমায়রা বেগম নামের এক ক্রেতা খবরের কাগজকে জানালেন, তাদের বাসার প্রত্যেকেই লিচু খুব পছন্দ করেন। বিশেষ করে বাচ্চারা এই মৌসুমের জন্য মুখিয়ে থাকে। লিচুর দিনে ঘরভর্তি করে কিনে রাখা হয়। লিচু বাজারে খুব কম সময় পাওয়া যায়। তাই মন ভরে খেতে না পারলে যেন তৃপ্তি মেটে না।

আরেকজন ক্রেতা রাজীব ভূঁইয়া জানান, মৌসুমি এই ফলের দাম আরও কম রাখা উচিত।  তিনি ঢাকা শহরে মেসে থাকেন। লিচু তার খুব পছন্দের একটা ফল হলেও দাম চড়া হওয়ায় বেশি করে কিনতে পারেন না। তবুও পছন্দের ফল বলে কথা, অল্প করে নিলেও মৌসুমের প্রথমে বাজারে উঠেছে, তাই কিনছেন। 

আরেক বিক্রেতা সবুর বলেন, প্রথম দিকে বাজারে উঠতে শুরু করেছে বলে লিচুর দাম এখন বাড়তি। কিছুদিন গেলে বাজারে যখন একটু বেশি পরিমাণে পাওয়া যাবে, তখন দাম আরেকটু হয়তো কমবে। 

বন খঞ্জন বিরল পরিযায়ী

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৪, ০১:১৭ পিএম
আপডেট: ২৫ মে ২০২৪, ০১:১৭ পিএম
বন খঞ্জন বিরল পরিযায়ী
বন খঞ্জন। সোনাদিয়া দ্বীপ থেকে তোলা

বসন্ত এলে বাংলায় আবাসিক পাখ-পাখালির কলরব বাড়তে থাকে। গ্রীষ্মের তপ্ত দিনে পাখিদের গানের রেশ আরও বেড়ে যায়। গ্রীষ্মের সময় বাংলার বনেবাদাড়ে কয়েক প্রজাতির পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে। তার মধ্যে বনতলে চুপচাপ একা একা লেজ দুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো একটি পাখি হলো বন খঞ্জন।

বাংলাদেশে ধলাভ্রু খঞ্জন বাদে সব প্রজাতিই পরিযায়ী এবং তাদের আগমন ঘটে শীতে। কেবল বন খঞ্জনই গ্রীষ্মে শরতের সময় বাংলাদেশে দেখা যায়। তবে পাখিটি খুব সহজেই চোখে পড়ে না। ১০ বছর আগে বন খঞ্জন দেখার একমাত্র জায়গা ছিল ঢাকার মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের একটি ঘন গাছপালাময় ও ছায়া-শীতল অংশ। কেবল সেখানে গিয়ে লুকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলে বনতলে একটি বা দুটি বন খঞ্জন দেখা যেত। তবে কোনোরকমভাবে মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই উড়ে গিয়ে গাছের ডালে বসত। গ্রীষ্মে কয়েকবার জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে বন খঞ্জন দেখতে গিয়ে মাত্র একবারই তার দেখা পেয়েছিলাম। 

দেখলাম এরা প্রায়ই গাছের ডাল থেকে উড়ে গিয়ে অন্য গাছের ডাল বরাবর পোকামাকড় ধরে। বনের মধ্যে খাড়া শাখায় আরোহণ করে এবং অনুভূমিক শাখা বরাবর দ্রুত উড়তে পারে। বনের মধ্যেকার হাঁটার পথেও খাবার খুঁজে বেড়ায়।

বাংলায় এমন সতর্ক খঞ্জন একটিও নেই। অন্যসব খঞ্জন মানুষের প্রায় কাছাকাছি এসে লেজ দুলিয়ে হেঁটে চলে বেড়ায়। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বন খঞ্জনের দেখা পেয়েছি ২০১৮ সালে সোনাদিয়া দ্বীপের ঝাউবনে, শরতের সময়। সংখ্যায় ছিল গোটা বিশেক। সম্ভবত কয়েক দিন আগেই তারা ওই ঝাউবনে এসেছিল। সম্ভবত সোনাদিয়া দ্বীপের ঝাউবন তাদের গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাবিরতির স্থান অথবা একত্র হওয়ার জায়গা ছিল। এখান থেকে তাদের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার কথা ছিল হয়তো। ঝাউবনের তলে কয়েক দিন বন খঞ্জনদের হেঁটে হেঁটে খাবার সংগ্রহ করতে দেখেছি। বনের ওই অংশে মানুষের উপস্থিতি কম ছিল। যে কারণে পাখিগুলো অনেকটাই নিরাপদ মনে করে বনতল চষে বেড়াত খাবারের জন্য। 

বন খঞ্জন বাংলাদেশে বিরল পরিযায়ী পাখি। দেশের প্রায় সব বিভাগের বনে দেখা যায়। বিশেষ করে পাতাঝরা বন, ঝাউবন, দেবদারু বন ও বাঁশবনের কাছে বিচরণ করে। প্রধানত একা, কদাচিৎ জোড়ায় এবং ছোট ঝাঁকে দেখা যায়। ছায়াময় বনতল তাদের পছন্দের আবাস। পিঙ্ক পিঙ্ক সুরে গান গায় কেবল ওড়ার সময়। মাকড়সা, পিঁপড়ে ও অন্যান্য পোকামাকড় এদের প্রধান খাদ্য। সারা পৃথিবীতে বন খঞ্জনের কেবল একটি প্রজাতি আছে। তাই পৃথিবীর একমাত্র বন খঞ্জন নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি বটে!  

নাগলিঙ্গম ফুলের শোভা

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১০:০৫ এএম
আপডেট: ২৪ মে ২০২৪, ১০:০৫ এএম
নাগলিঙ্গম ফুলের শোভা
ঢাকার জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে মে মাসে ফোটা নাগলিঙ্গম ফুল। ছবি: লেখক

ঢাকা শহরের অনেক উদ্যানে এখন নাগলিঙ্গম ফুলের প্রাচুর্য আর স্ফুরণ চলছে। অপরূপ ব্যতিক্রমী চেহারার এ ফুলের দিকে চোখ পড়লে যে-কেউ তার রূপে মজে যায়। কেননা, এ গাছের নাম ও ফুল দুটোই অন্যরকম। একসময় নাগলিঙ্গম গাছ ঢাকায় ছিল দুষ্প্রাপ্য, এখন বহু জায়গায় এ গাছ দেখা যায়। 

প্রায় ২০ বছর আগে ভাওয়াল রাজবাড়ীতে এক অদ্ভুত ও অচিন গাছ আছে শুনে তা দেখার জন্য ছুটে গিয়েছিলাম। সেখানেই প্রথম দেখা মিলে নাগলিঙ্গম গাছের। এরপর আরও কত জায়গায় যে তাকে দেখেছি! নাগলিঙ্গম গাছের জন্ম দক্ষিণ ক্যারিবীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশ। সেখান থেকে কয়েক হাজার বছর আগে এই গাছ এসেছে আমাদের অঞ্চলে। ভারতবর্ষে এই গাছ প্রায় তিন হাজার বছর ধরে জন্মাচ্ছে। চেন্নাই জাতীয় জাদুঘর চত্বরেও দেখেছি একটি বিশাল গাছ। তার ফলগুলো যেন আমাদের দেশের গাছগুলোর ফলের চেয়ে বড়। 

নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা ১৯৬৫ সালে ঢাকা শহরে হেয়ার রোড ও মিন্টো রোডের সংযোগস্থলে পাকুড় গাছের পাশে যে নাগলিঙ্গম গাছটি দেখেছিলেন, সেটি কাটা পড়েছে বহু আগেই। অবশ্য তেজগাঁওয়ের কৃষি কলেজের (বর্তমান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) গাছগুলো এখনো আছে। রমনা উদ্যানের মধ্যে কয়েকটি নাগলিঙ্গম গাছ রয়েছে। ফুল ফোটার সময় সে গাছগুলোর কাছে গেলে অদ্ভুত একটা ঘ্রাণ নাকে আসে। এরপর গাছের তলায় চোখ পড়লে আঁতকে উঠতে হয়! এত ফুল রোজ ঝরে পড়ে! তলাটায় কোনো ঘাস আর মাটি দেখা যায় না, পুরোটাই ঢাকা থাকে ঝরে পড়া নাগলিঙ্গম ফুলে।

একটি বড় নাগলিঙ্গম গাছে রোজ প্রায় ১০০০টি ফুল ফোটে। এ দেশে ঢাকায় রমনা পার্ক, জাতীয় ঈদগাহ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্জন হলের সামনের উদ্যান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, নটর ডেম কলেজ, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ক্যান্টনমেন্ট ইত্যাদি বহু জায়গায় এ গাছ রয়েছে। তবে ঠিক কী কারণ জানি না, বিভিন্ন স্থানে ও বিভিন্ন ঋতুতে ফুলের পাপড়ির রং দেখেছি ভিন্ন হতে। অন্তত তিন রঙের ফুল আমার চোখে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর তরুণ গাছের ফুলের রং গাঢ় মেরুন, রমনা উদ্যানে ফোটা ফুলের রং লাল ও অন্যটার গোলাপি লাল বা ফিকে গোলাপি। জাতের তফাতও হতে পারে। আবার ফোটার পর সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রঙের বদলও হয় কি না, তাও জানি না।

নাগলিঙ্গম ফল দেখতে কামানের গোলার মতো গোল ও বড়। পাকার পর শক্ত খোসার ফলগুলো গাছ থেকে ঝরে মাটিতে পড়লে বেশ শব্দ হয়। এ জন্য এ গাছের নাম রাখা হয়েছে ক্যাননবল ট্রি, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Couroupita guianensis ও গোত্র লেচিথিডেসি। গাছ প্রায় চিরসবুজ ও অনেক বছর বাঁচে। কাণ্ড সরল, ঊর্ধ্বমুখী, বহু ডালপালায় ছায়াঘন। পাতা দীর্ঘ, চওড়া। পাতার গোড়া থেকে আগার দিক বেশি চওড়া, অগ্রভাগ ভোঁতা। কচিপাতা ম্লান সবুজ, বয়স্ক পাতা গাঢ় সবুজ। বছরে গাছে কয়েকবার পাতা ঝরে ও নতুন পাতা গজায়, তেমনি ফুলও ফোটে কয়েক দফায়। ফুল ফোটে কাণ্ডের গা থেকে। অজস্র ঝুলন্ত মঞ্জরিতে অনেক ফুল ফোটে। লালচে মেরুন রঙের ফুলগুলো দেখতে বেশ সুন্দর, সুগন্ধও আছে। ফুল দেখতে অনেকটা সাপের ফণার মতো, তাই এ গাছের বাংলা নাম রাখা হয়েছে নাগলিঙ্গম, ওটা ওর সংস্কৃত নাম। 

ফুল ফুটলে মৌমাছিরা সেসব ফুলে আসে ও পরাগায়ণ ঘটে। ফল পাকলে তা গাছ থেকে ঝরে মাটিতে পড়ে ফেটে গিয়ে তা থেকে দুর্গন্ধ ছোটে। বন্য প্রাণীরা সেই গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ছুটে আসে ও ফল খেয়ে চলে যায়। খাওয়ার পর সেসব প্রাণীর পেটের ভেতরে থাকে নাগলিঙ্গম ফলের বীজ। বিষ্ঠা ত্যাগ করার পর সেসব বীজ তখন মাটিতে পড়ে ও অনুকূল পরিবেশ পায়, তখন সেখানে গাছ গজায়। এখন কেউ কেউ বিভিন্ন পার্ক বা উদ্যানে এই শোভাময়ী গাছটি লাগাচ্ছেন। তবে রাস্তার ধারে একে কোনোভাবেই লাগানো যাবে না। কেউ যদি ফল ধরা অবস্থায় এ গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই ফল মাথায় পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই উচিত হবে এ গাছের তলায় গেলে একটা চোখ অন্তত গাছের দিকে রাখা।

কাস্তেচরার চীন অভিযান

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৪, ১১:১২ এএম
আপডেট: ১৮ মে ২০২৪, ১১:১৩ এএম
কাস্তেচরার চীন অভিযান
ছবি: লেখক

পাখিপ্রেমীদের জন্য সুখবর। বাংলাদেশে খয়রা-কাস্তেচরার সংখ্যা বাড়ছে। দুই দশক আগে এর সংখ্যাটা শূন্য ছিল, এখন কয়েক হাজার হয়েছে। আরও তাজা খবর হলো, সুদর্শন এই পাখি এবার হাজির হয়েছে হাইনান দ্বীপে। গত দুই সপ্তাহ ধরে চীনের স্বশাসিত এই দ্বীপে প্রথমবারের মতো খয়রা-কাস্তেচরার দেখা মিলেছে। 

গত ১১ মে বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবসে হাইনানবাসীরা পেয়েছেন কাস্তেচরার চমকপ্রদ এ উপহার। তবে চীনে পাখি-দর্শকের চেয়ে পাখি-ভক্ষকের সংখ্যা বেশি। তাই হাইনান-প্রশাসক নবাগত এই পাখির জন্য ‘প্রথম-স্তরের নিরাপত্তা’ ঘোষণা করেছেন। বিশ্বে আর কোথাও খয়রা-কাস্তেচরার জন্য কখনো এই ঘোষণা দেওয়া হয়নি। 

বিশ্বে খয়রা-কাস্তেচরার প্রসার ঘটছে গত তিন শতাব্দী ধরে। তার আগে সম্ভবত এর নিবাস ছিল একমাত্র আফ্রিকা মহাদেশে। এ পাখি ইউরোপ মহাদেশের পর্তুগাল, স্পেন ও ফ্রান্সে বাস করছে গত ২০০ বছর ধরে এবং ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও ইউরোপের শীতল উত্তরাঞ্চলে এর বিস্তৃতি ঘটেছে মাত্র ১৫ বছর আগে। 

আটলান্টিক মহাসাগর পার হয়ে খয়রা-কাস্তেচরা আমেরিকা গেছে মাত্র ১০০ বছর আগে। এই এক শ বছরে আমেরিকা মহাদেশদ্বয়ের পূর্ব উপকূল বরাবর এর বসতি দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে এবং ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ পাখির বাড়বাড়ন্ত ঘটেছে সবচেয়ে বেশি।

অস্ট্রেলিয়ায় এ পাখি বাসা বাঁধছে ১৯৩০ থেকে। সম্ভবত তার আগেই এরা পশ্চিম ভারতে স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছিল। শীতে বাংলাদেশেও এর আগমন ঘটত। কিন্তু বিশ শতকের শেষ দিকে এ দেশে এ পাখি আর দেখা যায়নি। গত দুই দশক ধরে আবার এদের দেখা মিলছে এবং সংখ্যাবৃদ্ধিও হচ্ছে। এই দুর্দিনে খুব কম পাখিই এভাবে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে ও ছয়টি মহাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছে। 

খয়রা-কাস্তেচরার এই সাফল্যের কারণ কী! প্রথম কারণ, এর আহারে বাছবিচার কম। পোকামাকড়, শামুক-ঝিনুক, কাঁকড়া-বিছা, সাপ-ব্যাঙ, কেঁচো-জোঁক সবই আছে তার খাবারের তালিকায়। আবার কাদায় আটকে থাকা বীজ-দানা খেতেও আপত্তি নেই। দ্বিতীয় কারণ, চরম যাযাবর এই পাখির ছানারা বাসা ছেড়ে যাওয়ার পরই দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। কৃষ্ণসাগর এলাকায় রিং লাগিয়ে দেওয়া একটি ছানাকে সাহারা মরুভূমি পার হয়ে পূর্ব-আফ্রিকায় চলে যেতে দেখা গেছে। 

অনেকে অনুমান করেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পোকামাকড়, কাঁকড়া-বিছা ইত্যাদির বাড়বাড়ন্ত হওয়ায় খয়রা-কাস্তেচরার মতো পাখিদের প্রসার ঘটছে। আমরা অনুমান করি যে সুদর্শন, সৌম্য ও প্রসন্ন এ পাখিটির জন্য মানুষের ভালোবাসাও এর সাফল্যের পিছনে রয়েছে। অভিজাত এই পাখির পশমি-খয়েরি মাথা ও গলা, উজ্জ্বল তামাটে ও ধাতব সবুজ ডানা এবং সজল কালো চোখ সহজেই লোকের দৃষ্টি কাড়ে।

মানুষের আহার্য হিসেবে এ পাখি যে বেশি আকর্ষণীয় নয়, সে কথাটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আকারে বিশাল হলেও এর গায়ে মাংস খুবই কম। লম্বা পায়ের আঙুল থেকে দীর্ঘ চঞ্চুর প্রান্ত পর্যন্ত মাপলে পাখিটি দুই ফুট লম্বা; কিন্তু ওজন মাত্র আধা কেজি। পলকা দেহের এই পাখি তাই তিন ফুট পরিসরের দুটি ডানায় ভর করে সহজেই উড়ে পালায়, পার হয় মহাদেশ ও মহাসাগর। 

এখন আমরা শীতে বাইক্কা বিল, টাঙ্গুয়ার হাওড় ও ভোলার চরাঞ্চলে শত শত খয়রা-কাস্তেচরা দেখতে পাই। ভবিষ্যতে এ পাখি ভোলার চরাঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেও আমরা অবাক হব না। মাত্র ১৫ বছর আগে ইংল্যান্ডে পরিযায়ন করে এখন সেখানে এরা থিতু হয়েছে এবং লিঙ্কনশায়ারে বাসা করছে বলে সংবাদ এসেছে। 

পৃথিবীর ২৯ প্রজাতির কাস্তেচরার মাত্র তিনটিকে আমরা বাংলাদেশে দেখতে পাই। সবচেয়ে বেশি দেখি কালামাথা-কাস্তেচরা এবং সবচেয়ে কম কালা-কাস্তেচরা। তিন প্রজাতির কাস্তেচরাই এ দেশে থাকে শীতকালে। এখানে এরা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলে এবং বাসা বাঁধলে মন্দ কী! জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত যেসব উপকূলীয় চরে মানুষের ঠাঁই নেই, সেখানেই তো সব কাস্তেচরাদের আনাগোনা। উষ্ণায়নের জোয়ারে তা তলিয়ে যাওয়ার আগে ওরাই থাকুক না ওখানে ছানাপোনা নিয়ে। 

রক্তক্ষরা ব্লিডিং হার্ট ফুল

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১০:৩৯ এএম
আপডেট: ১৭ মে ২০২৪, ১০:৪০ এএম
রক্তক্ষরা ব্লিডিং হার্ট ফুল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্জন হলের সামনে ফোটা ব্লিডিং হার্ট ফুল। ছবি: লেখক

বৈশাখের এক নম্র সকাল। রোদের তাত তখনো বাড়েনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সামনের পথে হাঁটছি। চারদিকে তাকিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি কোথায় কোন গাছে আজ কী ফুল ফুটল। হঠাৎ পেয়ে গেলাম জাপানি হানিসাকল আর ব্লিডিং হার্ট গাছ। দুটোই লতানো। ভূশায়িত হয়ে কিছুটা মাথা তুলে গাছ দুটো আকাশ দেখার চেষ্টা করছে। 

আশপাশের বিশাল মেহগনি আর নাগলিঙ্গম গাছের ছায়ায় ওরা আচ্ছন্ন। সকাল বলে তবু তেরছা হয়ে একমুঠো রোদ্দুর এসে পড়েছে গাছগুলোর গায়ে। ছোট গাছের বড় গাছদের কাছ থেকে যেন এ গাছের চলছে করুণা ভিক্ষা- দাও আলো, দাও জীবন হে আমার বয়োজ্যেষ্ঠ। গাছগুলোকে দেখে বড় করুণা হলো। বেঁচে থাকার এক দুর্মর বাসনা নিয়ে ওরা টিকে আছে আসলে সেখানকার মালীদের যত্নে। এই যত্নটুকুর জন্যই হয়তো ওরা উজাড় করে ফুল ফোটাচ্ছে, আনন্দ দিচ্ছে মানুষকে।   

এত সব প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও সে গাছকে দেখে মনে হয়, ওদের যেন কোনো বেদনা নেই, কষ্ট নেই। কোনো পুষ্পপ্রেমিক হয়তো তাকে কোনো দিন দেয়নি কোনো ব্যথার ছোঁয়া। বরং তার লতানো শরীরে ঝুলে থাকা দুলের মতো গোছা গোছা ফুলের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছি আদরের হাত। তবু সে যেন এক দুঃখী রাজকন্যা, তার বুক চিরে ঝরে রক্তের ফোঁটার মতো খুদে খুদে পাঁচ পাপড়ির রক্তলাল ফুল। এ জন্যই বোধ হয় ওর ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ব্লিডিং হার্ট। বাংলা কিরণময়ী নামটা ভারতীয়, তবে নামটা কিরণময়ী না হয়ে করুণাময়ী হলে মনে বেশি মানাত। 

বাংলাদেশে এর বাংলা নামকরণ করা হয়েছে হৃদয়হারা বা হৃদয়ক্ষরা। এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Clerodendrum thomsoniae, গোত্র ভার্বেনেসী। অর্থাৎ এ গাছ ভাঁটফুলের সহোদর। এ ফুলের এরূপ উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামকরণের অনুরোধ করেন নাইজেরিয়ার এক মিশনারি চিকিৎসক রেভারেন্ড উইলিয়াম থমসন, তার প্রয়াত স্ত্রীর নামের সম্মানে, তাই এর নামাংশ দেওয়া হয় থমসনি, ক্লিরোডেনড্রাম গ্রিক শব্দের, যার অর্থ চান্স ট্রি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ ফুলের সৌন্দর্যের কারণে ইংরেজি নাম ছিল বিউটি বুশ। 

এটি আমাদের দেশের গাছ না, গাছের উৎপত্তিস্থল পশ্চিম আফ্রিকা। সত্যিই এমন অবিশ্বাস্য এ ফুলের গড়ন। এ ফুলটি আকৃতিতে লণ্ঠনের মতো। প্রতিটি ফুলের বৃতিগুলোর সুচালো ডগা ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে একটি লাল ফুল, ঝুলতে থাকে নিচমুখো হয়ে। ফুলের মধ্যে কখনোবা উঁকি দেয় সাদা রঙের পুংকেশর। সবুজ হৃৎপিণ্ডাকার পাতা, লতানো স্বভাব আর থোকাভরা ফুল সত্যি বিরল। তবে কেউ চাইলে লতার আগাগুলো ছেঁটে একে ঝোপ বানিয়ে রাখা যায়। 

সারা বছর সে ঝোপে কমবেশি ফুল হয়তো ফোটে। তবে গ্রীষ্ম-বর্ষায় ফোটে বেশি। এ গাছটি বাড়ির আঙিনায় হয়ে উঠতে পারে চিরদুঃখী এক স্বপ্নকুমারী। আর বর্ষাকালে ডাল কেটে কলম করে বাড়িয়ে নেওয়া যায় গাছ। এ দেশে এই লতানো স্বভাবের শোভাবর্ধক ফুলের গাছটা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন বাগানে ছড়িয়ে পড়েছে, কেউ কেউ টবেও লাগিয়েছেন। নার্সারিতে এখন কয়েক জাতের ব্লিডিং হার্টের চারা পাওয়া যাচ্ছে। খুলনায় এক নার্সারিতে দেখেছি একটি বিচিত্র ব্লিডিং হার্টের গাছ। সে জাতের গাছের পাতা সবুজ ও সাদা রঙে চিত্রিত, কিন্তু ফুলের আকার ও রং একই। আর এক জাতের ব্লিডিং হার্টের গাছ দেখেছি, যার বৃতির রং হালকা বেগুনি।

ব্লিডিং হার্ট ভূশায়িত লতানে প্রকৃতির বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ গাছ। ৪ মিটার পর্যন্ত গাছটি লম্বা হতে পারে। পাতা অবডিম্বাকার, সবুজ ও শিরাবিন্যাস স্পষ্ট। একটি ছড়ায় অনেক ফুল গুচ্ছাকারে ফোটে। আমরা ফুলের বোঁটার কাছে যে সাদাটে ঘিয়া রঙের ত্রিকোণাকার অঙ্গ দেখি, সেটা ফুলের বৃতি। পাঁচটি বৃতি আবদ্ধ করে রাখে ফুলের পাপড়িকে। ফুল ফুটলে লাল রঙের পাপড়ি নিয়ে বৃতির বাইরে এসে ঝুলতে থাকে ফুল। পাপড়িগুলোর মাঝখান থেকে বেরিয়ে আসে লম্বা চিকন সুতার মতো কেশরগুলো। সাধারণত গ্রীষ্মকালে বেশি ফুল ফোটে। তবে বছরের অন্য সময়েও কিছু কিছু ফুল ফুটতে দেখা যায়। 

পতঙ্গ দ্বারা ফুলের পরাগায়ন ঘটে, এরপর হয় ফল। ফলের রং প্রথমে থাকে সবুজ, পরে হয় লাল, শেষে কালো হয়ে ফেটে বীজ ছড়িয়ে পড়ে। একটি ফলে চারটি কালো রঙের বীজ থাকে। বীজ থেকেও চারা হয়। বেশি ও ভালো ফুল পেতে চাইলে এ গাছে পর্যাপ্ত পানি ও পরিমিত সার দিতে হবে। রোদ যেখানে পড়ে, সেখানে এ গাছ ভালো হয়।