ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার জেরে লাইসেন্স বাতিলের পর রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ছেড়ে যাচ্ছেন রোগীরা।একই সঙ্গে যারা এখনো চিকিৎসাধীন, তাদের স্বজনরা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত হাসপাতাল খালি করার নির্দেশনা থাকলেও জটিল রোগীদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্বজনরা।
গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার পর গতকাল শুক্রবার দুপুরের মধ্যেই ১৭৬ জন রোগী হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছেন। আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল জানান, লাইসেন্স বাতিলের সময় ৪২৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এখন সেখানে প্রায় ২৫০ জন রোগী চিকিৎসাধীন।
অনিশ্চয়তায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীরা
হাসপাতালের জরুরি বিভাগ বর্তমানে বন্ধ থাকলেও ভর্তি থাকা রোগীদের চিকিৎসা চলছে। তবে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অন্য কোথাও স্থানান্তর করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন স্বজনরা।
রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকার বাসিন্দা নুরুল আলম এন্ডোস্কোপিক স্পাইন সার্জারির পর ১৫ দিন ধরে এখানে ভর্তি। তার বোনজামাই মো. আশরাফ আলী বলেন, ‘শ্যালককে আইসিইউ থেকে এইচডিইউতে শিফট করা হয়েছে। এখানে চিকিৎসা অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিশ্চিত নই। তাকে অন্য কোথাও নেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ।’
মধুবাগের বাসিন্দা আব্দুল্লাহর নবজাতক এনআইসিইউতে ভর্তি। তিনি বলেন, ‘এই অবস্থায় বাচ্চাকে অন্যত্র স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। আমরা চাই দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা হোক। কিন্তু হাসপাতাল বন্ধ করে দিলে সাধারণ রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন।’
অন্যত্র ছুটছেন রোগী
গতকাল সকাল থেকেই হাসপাতালের করিডরে রোগীদের তাড়াহুড়ো দেখা গেছে। বাড্ডার বাসিন্দা সেলিনা আক্তার সন্তান প্রসবের জন্য এখানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। কিন্তু হাসপাতাল বন্ধের খবর পেয়ে তাকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মালিবাগ থেকে আসা কিডনি রোগী কালিপদ দত্তকেও গতকাল দুপুরে সিরাজ উদ্দিন মেডিকেল কলেজে স্থানান্তর করা হয়েছে।
চিকিৎসা পাওয়ার আশায় এখনো অনেকে
হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবার ওপর আস্থা রেখে এখনো অনেকেই এটি ছাড়তে চাইছেন না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা সেলিনা বেগম বলেন, ‘আমার শিশুসন্তানের শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। সরকারি সিদ্ধান্ত থাকলেও আমি হাসপাতাল ছাড়তে চাই না।’ ফেনীর আলী হায়দার তার ৪০ দিন বয়সী শিশুকন্যার চিকিৎসার জন্য উচ্চ আদালতের ওপর ভরসা করে আছেন। তার আশা, কর্তৃপক্ষ আপিলের মাধ্যমে হাসপাতাল পরিচালনার সুযোগ পাবে।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দ্রুত রোগীদের অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলেও আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ বলছে, চাইলেই সব রোগীকে এত দ্রুত স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আগামী রবিবারের মধ্যে আমরা আপিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করব। আপিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে।’
উল্লেখ্য, গত ২৭ মে ঈদুল আজহার আগের দিন আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি ও এসি বন্ধ থাকাসহ কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জামায়াত আমিরের
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় লাইসেন্স বাতিলের পর আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ছেড়ে যাচ্ছেন চিকিৎসাধীন রোগীরা। এ পরিস্থিতিতে হাসপাতালটি বন্ধের সিদ্ধান্তকে ‘সঠিক হয়নি’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি শিক্ষার্থী ও জনগণের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘সম্প্রতি আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয়জন নবজাতকের মৃত্যুতে আমরা সবাই গভীর দুঃখ ও সমবেদনা প্রকাশ করি। ঘটনাটি অবশ্যই অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকার আজ হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করেছে। এটি মোটেই সঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি।’ জামায়াত আমির বলেন, তদন্তের মাধ্যমে কোনো অবহেলা, ত্রুটি কিংবা অপরাধ চিহ্নিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। তা না করে যে হাসপাতালটি ‘গরিবের হাসপাতাল’ নামে পরিচিত এবং মানসম্মত সেবার মাধ্যমে জনগণের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল, আজ তারই লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া হলো। শেষ পর্যন্ত এর ক্ষতি জনগণেরই হলো।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এটি একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, যেখানে শত শত শিক্ষার্থী ও নার্সিং শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছেন। হাসপাতাল বন্ধ হলে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তাই ব্যক্তির অপরাধের জন্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।