সমাজের দ্বন্দ্ব ইতিহাসকে গতিময় করে। সমাজ পাল্টায় কীভাবে আর সমাজেরই বা গতি কী? গতি তৈরি হয় আন্দোলনের কারণে আর আন্দোলন গড়ে ওঠে বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও লড়াই করতে গিয়ে। ইতিহাসের যাত্রাপথে এক দিনের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন-পরবর্তী প্রজন্মের কাছে শিক্ষা, ভিত্তি ও সাহসের প্রতীক হয়ে থাকে। ইতিহাস শুধু গোপনে গোপনেই কাজ করে না তার প্রকাশ ঘটে বর্তমানেও। আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয় কিন্তু অতীতের শিক্ষা মিশে থাকে বর্তমানের লড়াইয়ের সঙ্গে। যখনই প্রতিবাদের প্রয়োজন হয় তখনই অতীতের সংগ্রাম সাহস জোগায়। ভাষা আন্দোলন এবং একুশ তেমনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে চেতনায় প্রজ্জ্বলিত সাহস।
শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই আমাদের ভূখণ্ডের মানুষের দীর্ঘদিনের। পরাধীনতার সুদীর্ঘ বছরগুলোতে ১৯০ বছর ব্রিটিশ, পরবর্তী ২৩ বছর পাকিস্তানিরা আমাদের শোষণ করেছে। আমরা যে আমাদের দেশকে সোনার বাংলা বলি, তা যে বাস্তবিক অর্থেই সোনার বাংলা ছিল সেটা আমাদের যারা শোষণ করত তাদের জৌলুশ দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না। আমাদের তারা যে পরিমাণ শোষণ করেছে তাদের সমৃদ্ধি ততই বেড়েছে। জনগণ এটা মেনে নিতে চায়নি। তাই ৯ মাসের সশস্ত্রযুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের রক্তে ভেজা এই ভূখণ্ডে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছে। কিন্তু যেকোনো সংগ্রামের একটা সূচনাবিন্দু থাকে। স্বাধীনতার জন্য মরণ পণ লড়াইয়েরও তেমনি শুরু খুঁজতে হলে প্রথমেই আসে ৫২ সালের কথা। স্বাধীনতা যুদ্ধের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ৮ ফাল্গুন বা ২১ ফেব্রুয়ারি যে বেদনা এবং যে চেতনা জাগিয়ে দিয়েছিল তা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল। শুধু তাই নয়, বৈষম্য থেকে মুক্তির আন্দোলনে ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রেরণা জুগিয়েছে বারবার। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও এবার ২০২৪-এর ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অভ্যুত্থানেও একুশ ছিল অন্তর্নিহিত প্রেরণা আর শহিদ মিনার ছিল আন্দোলনের পীঠস্থান।
মানুষ যেমন বঞ্চনায় বিক্ষুব্ধ হয় তেমনি আশায় বুক বাঁধে। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যেই মুসলমানদের জন্য আলাদা আবাসভূমির আন্দোলনে নিম্নবিত্ত দরিদ্র মুসলমান দলে দলে যুক্ত হয়েছিলেন কেন, এই প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আশা জাগিয়ে তোলা হয়েছিল যে মুসলমানদের আলাদা দেশ পাকিস্তান গঠিত হলে সেখানে কোনো শোষণ থাকবে না। কারণ মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। ভাই কী ভাইকে শোষণ করতে পারে? আর উচ্চবিত্ত ধনী উচ্চ শিক্ষিত মুসলমান যুক্ত হয়েছিলেন এই আশায় যে রাষ্ট্রটা হাতে পেলে ক্ষমতার দুধ-মধু সবই তারা খেতে পারবেন। ফলে এই দুই শ্রেণির ছিল দুই আশা কিন্তু লক্ষ্য ছিল এক। সেটা হলো পাকিস্তান সৃষ্টি। পাকিস্তান সৃষ্টির পর যখন বলা হলো- এক ধর্ম, এক দেশ, এক ভাষা হবে। তখনই প্রশ্ন আসে- ধর্মের ভিত্তিতে কী কোনো দেশ হতে পারে? যদি তাই হতো তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশের অধিবাসীই তো মুসলমান। তাহলে তারা সবাই মিলে একটি দেশ হতে পারে না কেন? আবার এক দেশে বহু ধর্মের মানুষ থাকলেও এক ভাষায় কথা বলতে পারে আবার এক ধর্মের মানুষও অনেক ভাষাভাষী হতে পারে।
পাকিস্তানের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের পরিচয় কী হবে? আবার ভারতে যে মুসলমানরা থেকে গেলেন তাদের পরিচয় কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে সংবিধান সভায় জিন্নাহ বলেছিলেন, এক দিন হিন্দু আর হিন্দু হিসেবে নয়, মুসলমান আর মুসলমান হিসেবে নয়, তারা সবাই বিবেচিত হবেন পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে। অর্থাৎ ধর্মীয় পরিচয় আর নাগরিক পরিচয় এক হবে না। একেবারে দ্বিজাতিতত্ত্বের বিপরীতমুখী যাত্রা! তাহলে সাম্প্রদায়িক দাঙায় লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু কিসের জন্য? এসব টানাপোড়েনে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নে দীর্ঘ সময় লেগে গেল। ১৯৪৭ সালে জন্ম নিয়েছিল পাকিস্তান আর তার ৯ বছর পর ১৯৫৬ সালে প্রণীত হয়েছিল সংবিধান। এই সময়টিতে সংবিধান না থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্রিটিশ প্রবর্তিত বিধান তো ছিল, তা দিয়েই চলছিল সব।
রাষ্ট্রের ধর্ম নিয়ে সমাধানে আসতে না আসতেই প্রশ্ন এল রাষ্ট্রের ভাষা কী হবে? এক ধর্ম, এক দেশ, এক ভাষা এই ধরনের চিন্তা থেকেই মুসলমান, পাকিস্তান এবং উর্দু ভাষাকে সমার্থক করার আয়োজন চলছিল সর্বত্র। অন্যদিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনে ঢাকা তখন উত্তাল। এই সময় ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় এলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত গণ-সংবর্ধনায় তিনি বললেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়। ভাষা আন্দোলনকে তিনি মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেন।
তার বক্তব্যের প্রতিবাদ হয় সমাবেশের মধ্যেই। এর পর ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তনে ‘স্টুডেন্টস রোল ইন নেশন বিল্ডিং’ শীর্ষক বক্তৃতায় তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিকে বাতিল করে দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একটি এবং সেটি অবশ্যই উর্দু। কারণ উর্দুই পাকিস্তানের মুসলিম পরিচয় তুলে ধরে। ছাত্ররা সমস্বরে না, না বলে জিন্নাহর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার ভাষার দাবিকে তাচ্ছিল্য করে ২৮ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করেন জিন্নাহ।
জিন্নাহ চলে গেছেন কিন্তু উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যেতে পারেননি। প্রশ্ন ছিল, উর্দু কি, পাকিস্তানের কোন প্রদেশের ভাষা? সিন্ধু, বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ প্রত্যেকেরই তো আলাদা ভাষা। ভাষা দিয়ে কি ধর্মের পরিচয় তুলে ধরা যায়? আরবি ভাষায় কি মুসলমান ছাড়া কেউ কথা বলে না? আরবের খ্রিস্টান, ইহুদি ধর্মাবলম্বী মানুষও তো আরবি ভাষায় কথা বলে। এ কথা তো সত্যি যে, মানুষ যত দ্রুত ধর্মান্তরিত হতে পারে তত সহজে ভাষান্তরিত হতে পারে না।
আরবের মুসলমান আর ইন্দোনেশিয়ার মুসলমান ধর্মে এক হলেও ভাষা এবং সংস্কৃতিতে তারা এক নয়। আর পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কথাও যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে যে ভাষায় ৫৪ শতাংশ মানুষ কথা বলে তাদের দাবি কি অগ্রগণ্য বলে বিবেচিত হবে না?
ভাষা আন্দোলনের মূল সুর ছিল গণতান্ত্রিক এবং অসাম্প্রদায়িক। সে কারণেই ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছিল মদ মিনার।
এখানে ছিল না কোনো ধর্মের বিভাজন। তারা জীবন দিয়েছিলেন এই ভূখণ্ডের সব মানুষের মুখের ভাষার জন্য। তাই সব ধর্মের মানুষ যেন শ্রদ্ধা জানাতে পারে সে উদ্দেশ্যেই নির্মিত হয়েছিল শহিদ মিনার। সংগ্রামের প্রতিজ্ঞা বা সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শহিদ মিনার এখনো মানুষের মিলনক্ষেত্র।
একুশ শিখিয়েছিল আত্মসমর্পণ নয়, আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই করতে। একুশ মানে মাথা নত না করা। এটা আমাদের কাছে এখনো একটি প্রেরণাদায়ক কথা। প্রবল শক্তির কাছে বা যুক্তিহীনতার কাছে আত্মসমর্পণ করে প্রাণে বেঁচে থাকা যায় কিন্তু সম্মানের সঙ্গে বাঁচা যায় না। কোনো আন্দোলন থামে না তার পরিণতিতে না যাওয়া পর্যন্ত। তাই ভাষা আন্দোলন বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে যে সংগ্রামের প্রেরণা জুগিয়েছিল সেই পথ বেয়ে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছি।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং একটি গণতান্ত্রিক, বিজ্ঞানভিত্তিক সেক্যুলার একই পদ্ধতির শিক্ষানীতির দাবিতে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি গড়ে ওঠা আন্দোলন ১৯৯০ সালে অভ্যুত্থানের জন্ম দিয়েছিল। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের মূল চেতনা যে ছিল বৈষম্য থেকে মুক্তি, সেই লড়াইয়েও একুশ ছিল প্রেরণা। একুশ যে চেতনা জাগিয়েছিল, তার মর্মে ছিল মুক্তির আকুতি। শোষণ থেকে মুক্তি, বৈষম্য থেকে মুক্তি আর মুক্তি অপমান থেকে। এই চেতনা ছড়িয়ে আছে এ দেশের মানুষের মনে। তাই যখনই বৈষম্য ও বঞ্চনার আঘাত আসে, তখনই একুশ আসে সাহসের মশাল হাতে।
আগামীর লড়াই বা স্বপ্ন সব কিছুর পেছনেই থাকবে একুশের চেতনা, যা গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইকে পথ দেখাবে।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]
