সামাজিক অবক্ষয় একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, যা আজকের পৃথিবীতে দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশের মতো উন্নত দেশগুলোতেও তরুণ সমাজ এ অবক্ষয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। পার্থক্য হলো, উন্নত দেশগুলো এ সমস্যাকে যথাসময়ে গুরুত্ব দিয়ে চিহ্নিত করেছে এবং সমাজের ভবিষ্যৎ রক্ষায় তারা নিয়েছে বাস্তবসম্মত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি নানা কার্যক্রম। এসব পদক্ষেপ শুধু সামাজিক অবক্ষয় রোধেই নয়, বরং তরুণদের জীবনে অর্থবহ ও গঠনমূলক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হয়েছে। এ অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের জন্য হতে পারে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
প্রথমেই নজর দেওয়া যাক স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর দিকে, বিশেষ করে নরওয়ে ও সুইডেন। এসব দেশে তরুণদের জন্য ‘ইউথ সেন্টার’ নামের বিশেষ কমিউনিটি কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলো পরিচালিত হয় স্থানীয় সরকার ও সমাজকল্যাণ সংস্থার মাধ্যমে। এ কেন্দ্রগুলোতে তরুণরা অংশ নিতে পারে খেলাধুলা, সংগীত, থিয়েটার, ডিজিটাল শিল্প, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তা কার্যক্রমে। এসব কার্যক্রম তরুণদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, সৃজনশীলতা বিকাশ ঘটায় এবং তাদের সমাজের সক্রিয় অংশ হিসেবে গড়ে তোলে। পাশাপাশি, এতে তারা মাদক, গ্যাং কালচার বা সহিংসতার মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে দূরে থাকে।
জাপানের কথা বললে বলতে হয় তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘নৈতিক শিক্ষা’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে প্রাথমিক স্তর থেকেই। এ পাঠ্যক্রমে শেখানো হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, দলগত কাজ, পরিবার ও সমাজের প্রতি কর্তব্য ইত্যাদি। এ ছাড়া হাইস্কুলে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা করা হয়। বিভিন্ন সংস্থায় গিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তরুণদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ ও দায়িত্ববোধ তৈরি করে। এতে তারা কর্মজীবনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয় এবং সমাজ সম্পর্কে বাস্তব উপলব্ধি গড়ে তোলে।
কানাডা তরুণদের মধ্যে সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার জন্য গ্রহণ করেছে আরেকটি কার্যকর পন্থা। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট ঘণ্টা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ কাজগুলো হতে পারে বৃদ্ধাশ্রমে সেবা দেওয়া, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষায় সহায়তা কিংবা কমিউনিটি সংগঠনে স্বেচ্ছাশ্রম দেওয়া। এ ধরনের কাজ তরুণদের আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে এনে সমাজসচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
সিঙ্গাপুর একটি ব্যতিক্রমী মডেল। সেখানে সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় ‘আইনের কঠোর প্রয়োগ’ এবং ‘মানবিক পুনর্বাসন’ এই দুই স্তম্ভকে। যেমন, মাদকসেবন বা অপরাধে যুক্ত তরুণদের শাস্তি দেওয়া হলেও, একই সঙ্গে তাদের জন্য রয়েছে মনোসামাজিক কাউন্সেলিং, স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম এবং পুনরায় শিক্ষায় ফেরার সুযোগ। এ দ্বৈত কৌশল তরুণদের পুনরায় সমাজে অন্তর্ভুক্ত হতে সহায়তা করে এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তির হার কমায়।
এ ছাড়া জার্মানির ‘ডুয়েল এডুকেশন সিস্টেম’ আজ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক পড়াশোনার পাশাপাশি সপ্তাহে কয়েকদিন বিভিন্ন কারিগরি প্রতিষ্ঠান বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ শেখার সুযোগ পায়। এতে করে একদিকে যেমন তারা কাজ শেখে, অন্যদিকে তেমনি চাকরির বাজারের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাও অর্জন করে। এর ফলে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব, হতাশা বা সমাজবিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা অনেক কমে আসে।
উন্নত দেশের এসব পদক্ষেপের পেছনে যে দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে, তা হলো, তরুণদের নিয়ন্ত্রণের চেয়ে সহযোগিতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পথে পরিচালিত করা। তারা বুঝে নিয়েছে, সামাজিক অবক্ষয়কে শুধু আইন দিয়ে ঠেকানো যায় না। প্রয়োজন তরুণদের জন্য নিরাপদ ও ইতিবাচক বিকাশের পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা নিজের স্বপ্ন ও সমাজের কল্যাণ, দুয়ের মধ্যেই ভারসাম্য খুঁজে পায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ উদাহরণগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক। আমাদের সমাজেও আজ তরুণদের সামনে রয়েছে নানান চ্যালেঞ্জ- মাদক, সাইবার অপরাধ, অবৈধ গ্যাং কালচার, হতাশা, বেকারত্ব ইত্যাদি। অথচ এখনো আমরা তরুণদের বিকাশে কাঠামোগত সহায়তা গড়তে পারিনি। নৈতিক শিক্ষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হলেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। স্বেচ্ছাসেবার চর্চা বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট কেন্দ্র এখনো সীমিত পরিসরে। অথচ, যদি আমরা স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নৈতিকতা, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা ও সমাজসেবার চর্চা বাড়াতে পারি, তাহলে তরুণ সমাজ এক বিশাল শক্তিতে রূপ নিতে পারে।
গত বছর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে জনমনে এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল- ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসায় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ে সমাজে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে উত্তরণ ঘটবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা এখনো আমাদের পূরণ হয়নি। বরং ক্ষমতার নানামুখী টানাপোড়েন বা দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য হয়েছে। ব্যাপক প্রত্যাশার মধ্যেই বর্তমানে নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। উন্নয়ন, সংস্কার, নৈতিকতা ও সততার চর্চায় প্রতিবন্ধক হয়ে উঠছে মূল্যবোধের অবক্ষয়। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ কি সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে?
ইদানীং আমরা অনুধাবন করছি যে, মাদকের ভয়ংকর নেশা দেশের তরুণসমাজের একটি বড় অংশকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে চলেছে। শহর ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও আসক্তি বাড়ছে। সারা দেশে যেভাবে অবক্ষয় প্রবণতা দেথা দিয়েছে, তাতে শঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। এহেন সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে সহজে কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। অবিশ্বাসের প্রবণতাটা দিনে দিনে বাড়ছে। বিভিন্ন অন্যায়-অপকর্মের ফলে সর্বস্তরের মানুষ এক ধরনের শঙ্কা অনুভব করছে।
একটি দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নই একমাত্র উন্নয়ন নয়। সামাজিক মূল্যবোধ ও নীতিবোধ সৃষ্টি এবং তার উন্নয়ন ঘটানোর পরিপ্রেক্ষিতে সব স্তরের এবং সব ধরনের অপকর্মের প্রতিরোধ ঘটানো সম্ভব। সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের মূল্যবোধ চর্চার উদ্যোগ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্থায়ী প্রক্রিয়ায় সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধ করা যেতে পারে। শুধু গণমাধ্যম ব্যবহার করে সামাজিকভাবে সচেতন করে তোলাই নয়, এ বিষয়ে আলাদাভাবে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করার সময় এসেছে। আমি মনে করি, এই মুহূর্তে সরকারের সব কার্যক্রমের ঊর্ধ্বে যে বিষয়টি মনোযোগ দেওয়া উচিত সেটি হলো- তরুণদের রক্ষা করতে সামাজিক অবক্ষয় থেকে দেশকে রক্ষা করার কাজে মনোযোগী হওয়া। এটি রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্বও বটে। শুধু বক্তৃতা-বিবৃতি নয়, মাঠপর্যায়ে এ বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক ভূমিকা পালনের কোনো সহজ বিকল্প খুঁজে পাওয়া যায় না।
সবশেষে বলা যায়, সামাজিক অবক্ষয় রোধে উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়- তরুণদের শত্রু নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে হবে। তাদের মধ্যে যদি আমরা দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা, আত্মবিশ্বাস এবং দক্ষতা জাগাতে পারি, তবে সমাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হয়ে উঠবে আরও সুস্থ, সহনশীল ও মানবিক।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
