জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের প্রতিবেদনে প্রকাশ- বাংলাদেশে গত আট মাসে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে; যার অর্থ দাঁড়ায় দৈনিক একাধিক কন্যাশিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে! হতভাগ্য কন্যাশিশুদের প্রতি আমাদের প্রবল ভালোবাসা, সহমর্মিতা। আর যে পশুরা তাদের লাঞ্ছিত করল সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে তাদেরও হওয়া চাই মৃত্যুদণ্ড। ব্যক্তিকর্তৃক কন্যাশিশু বা নারীর ওপর যৌনসন্ত্রাস (Sexual Violence) বা যৌন হয়রানি ওই ব্যক্তির পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় বা স্খলনের সঙ্গেই সরাসরি সম্পৃক্ত। এটাকে হয়তো কখনো কখনো রাজনীতির কলাকৌশল দ্বারা খানিকটা রাঙানো যেতে পারে, কিন্তু নিছক দুর্বৃত্তপনার দ্বারা এগুলোকে পুরোপুরি পাশ কাটানোর কোনো সুযোগ নেই। কোনো একটা দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতি একজন ব্যক্তি, সমষ্টি বা তার পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডল ও মূল্যবোধের ভেতর থেকেই আবর্তিত হয় প্রথম। আর সেই পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা ব্যক্তির আচরিত বা যাপিত জীবন ও জীবনবোধ থেকেই উৎসারিত হয় ওই ব্যক্তির যৌন আচরণ বা যৌনভাবনা।
যৌননিপীড়ন শব্দটাকে কানে খুব নরম শোনায়। যেন লঘু দোষে দুষ্ট একটা শব্দ, যেন মসলিনের মতোই নরম এক ধরনের আয়েশি অনুভব! অপরাধের গুরুত্ব ও ভয়াবহতাকে বুঝতে হলে এটাকে বরং ‘যৌনলালসা’ নামেই চিহ্নিত করা দরকার। এই গুরুতর সমস্যাটিকে ‘গুটি বসন্ত’ রোগের মতো চিরতরে নির্মূল করার উপায় ও পদ্ধতিগত কৌশলেরও অনুসন্ধান করা উচিত। অপরাধটির যথাযোগ্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কী হওয়া উচিত, তা নিয়েও যথেষ্ট ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রকৃতি জগতে নানান প্রজাতির প্রাণী তাদের নানান সব বল-বিদ্যা, কলাকৌশল প্রয়োগ করে বেঁচে থাকে। প্রকৃতিতে এরকমই কিছু নারী-পতঙ্গ প্রজাতির সাক্ষাৎ মেলে, যাদের রয়েছে এক অদ্ভুত প্রতিরোধ ক্ষমতা (Self Defence)! এদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো পুরুষ-পতঙ্গ যদি তাদের জবরদস্তি-সম্ভোগে বাধ্য করে, তবে সে জবরদস্তি সংঘটনের ঠিক আগ মুহূর্তে বা সংঘটনের সময় কিংবা সংঘটনের অব্যবহিত পরে সেই আক্রান্ত নারী-পতঙ্গটি হামলাকারী সেই পুরুষ-পতঙ্গটিকে আস্তই গিলে ফেলে! এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় নামকরণ করা হয়েছে ‘যৌনসংহার’ (Sexual Cannibalism) বা ‘সম্ভ্রমসংহার’ হিসেবে।
কোনো সমাজই নারী-পুরুষের অবাধ ও অবৈধ যৌনাচারকে স্বীকৃতি দেয় না এবং এটাকে একটা গর্হিত কাজ বলেই চিহ্নিত করে। ঠিক তেমনই সমাজে প্রকাশ্যে বা আড়ালে চলমান বা অনুষ্ঠিত যেকোনো অসামাজিক কার্যকলাপ রোধে রাষ্ট্র বা সমাজ কোনো নাগরিককেই ‘মব জাস্টিস’-এর কায়দায় মারমুখী হয়ে সেই অপরাধ দমনের আইনবহির্ভূত নির্দেশ বা অধিকারও দেয় না বা করতে পারে না। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বা কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র দ্বারা লেলিয়ে দেওয়া বা উসকে দেওয়া যৌনসন্ত্রাসী যারা, প্রকৃত অর্থে তারা যৌনবিকৃত অপরাধীই বটে। আরেক প্রেক্ষাপটে পৌরুষ আর পুরুষত্ব যে এক জিনিস নয়, সেটাও অনেকেরই বোধগম্যের বাইরে! পৌরুষ যদি হয় প্রাঙ্গণ, তার একদম প্রান্তেই বাস করে পুরুষত্ব! একটা বাগানের সঙ্গে একটা কোদালের যেমন সম্পর্ক। যেমনভাবে রমণশীল পুরুষ ব্যাঙের ‘নাপশিয়াল প্যাড’কে কোনোভাবেই একজন লম্পটদের যৌনথাবার সঙ্গে তুলনা করা চলে না।
২৪০ দিনে ৩৯০ জন শুধু কন্যাশিশুকেই রোমহর্ষক ধর্ষণের শিকার হতে হয় এই দেশে! যে দেশে যৌনহামলা, যৌন হয়রানি, পুরুষের যৌনলালসা বা যৌনথাবার শিকার একজন অসহায় নারী বা কন্যাশিশুকেই হতে হচ্ছে প্রতিদিন, বারবার। তখন এর প্রতিরোধে বা প্রতিশোধে আক্রান্ত নারীকেই কি তবে প্রতীকী অর্থেই ‘সেক্সুয়াল-ক্যানিবলিজম’ বা ‘যৌনসংহারের’ সেই ভয়াবহ পথটিকেই বেছে নিতে হবে? আক্রান্ত নারী, তিনি হতে পারেন আমাদের কন্যা, আমাদের মা, আমাদের বোন, দিদি, ভাবী, মামি, খালা, মাসি, চাচি বা পিসি। এমনকি আমাদের দাদি বা নানিও! তারাই তো আমাদের আত্মার অবিচ্ছেদ্য নারী অংশ। লম্পট আক্রমণকারীদের লালসার হাতকে প্রতিহত করবে তারা কী করে? যৌনসংহারের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে তবে কি মরণকামড় বসাতে হবে তাদেরই নরপশুদের শরীরে-অঙ্গপ্রত্যঙ্গে? আমাদেরও থাকতে হবে তাদের পাশে ঢাল হয়ে সর্বক্ষণ ছায়ার মতো।
একজন নারী শালীনতা বজায় রেখে চলাফেরা করবে কি করবে না, তার শরীরের সৌন্দর্যময় ও আকর্ষণীয় অঙ্গ ও বাঁকগুলোকে তার ঢিলেঢালা কাপড়ের আড়ালে লুকিয়ে রাখবে কি রাখবে না, তার বুকের কাপড় গলায় পেঁচিয়ে চলবে কি চলবে না, সেটা তো তারই একান্ত ব্যক্তিগত রুচি ও অভিরুচির সঙ্গে সম্পৃক্ত। পৃথিবীর কোনো ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা কি কোনো পুরুষকে এই অনুমতি দেয় যে, সে একজন নারীর ওপর চড়াও হবে, তাকে আক্রমণ করবে, বিবস্ত্র করবে, তার শ্লীলতাহানি ঘটাবে জনসমুদ্রে বা চারদেয়ালের ভেতরে ওইসব কোনো একটির কারণে? এ অধিকার একজন নারীর একান্ত আপনজনদেরও দেওয়া হয়নি। আর এসব নরাধম, নর্দমার কীট? এরা তো পশুরও অধম! হাজারটা বাহানা আর ছলচাতুরীর ছুতোয় আগ্রাসী দুশ্চরিত্র-লম্পট পুরুষ যখন তাদের লালসার হাত বাড়িয়ে দেয় একজন নারীর শরীরে, বস্ত্রহরণে, নির্যাতনে কাঁপিয়ে তোলে জনপদ, নারীর শ্লীলতাহানি ঘটিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে, তখন নারীর সেই অপমানে, অপমৃত্যুতে আমরা লজ্জায় আর আত্মধিক্কারে সংকুচিত হয়ে পড়ি।
নারীর এ শ্লাঘার যন্ত্রণা আমাদের বিবেককে ক্রমাগত দংশন করে, দগ্ধও করে। প্রতিবাদ ও সম্মিলিত প্রতিরোধের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠার সময় এসেছে এখন। এখনই চাই সশস্ত্র প্রতিরোধের নেশায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া। চাই সাঁড়াশি ঐকতান। ঐকতান চাই দৃষ্টিতে, দন্তে, নখে। ঐকতান চাই কণ্ঠে, জোড়ালো মুষ্টিতে, বাহুতে, কনুইয়ে, হাঁটুতে। ঐকতান চাই শিক্ষাঙ্গন, খেলার মাঠ, পার্ক ও উদ্যানে। ঐকতান চাই বনে-বাঁদাড়ে, অফিস-আদালতে, ফ্যাক্টরি-কলকারখানায়। ঐকতান চাই রেল, বাস, লঞ্চ ও স্টিমারে, স্টেশন, আর টার্মিনালে, ফেরিঘাট ও বিমানবন্দরে। ঐকতান চাই বইমেলা-শিশুমেলা-বাণিজ্যমেলার প্রাঙ্গণে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বণ আর মণ্ডপে। ঐকতান চাই সিনেমা-নাটক আর যাত্রার রঙিন প্রেক্ষাগৃহে। ঐকতান চাই মোড়ের মুদির দোকান থেকে শুরু করে আলোকিত সব বিপণিবিতান, হোটেল ও রেস্তোরাঁয়। যুথবদ্ধ ঐকতানে পাকড়াও করতে হবে সব যৌনসন্ত্রাসীকে। ওদের নোংরা থাবাকে প্রতিহত করতে সর্বত্র গড়ে তুলতে হবে সর্বদলীয় সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ কমিটি।
পত্রপত্রিকায় এসবের প্রতিবাদে লেখা ছাপা হচ্ছে, বিচ্ছিন্নভাবে হলেও নারীরা উচ্চকিত হয়েছেন, মানববন্ধন করেছেন, পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও করে প্রতিবাদও জানিয়েছেন, মঞ্চে-মিডিয়ায় জ্বালাময়ী বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন বা দিচ্ছেন। এসবই ভালো লক্ষণ, তবে বড্ড খাপছাড়া, কৌশলহীন, নির্দেশনাবিহীনভাবেই ঘটছে এসব কর্মসূচি। আমাদের আরও গুছিয়ে, আরও সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিগত কৌশল নিয়ে আগাতে হবে। আমি বা আপনি ব্যক্তিগতভাবে হয়তো দু-একটি পদক্ষেপের কথা বলতে পারি। যে কৌশলটাকে আপনার বা আমার কাছে যৌননিপীড়কদের প্রতিহত করার সহজ বা অনায়াসসাধ্য উপায় বলে মনে হতে পারে, সেটাকেই হয়তো অনেকের কাছে অবাস্তব-অকার্যকর পদ্ধতি বলে মনে হতে পারে। সেটার পেছনেও অন্য অনেক কারণ থাকতে পারে, যেগুলোর সঙ্গেও হয়তো আমার বা আপনার দ্বিমত থাকতে পারে। তবে এগুলো নিয়ে দেশব্যাপী বহুমুখী আলোচনা হওয়া দরকার প্রতিদিন সব মহলে। আর এসব নিয়ে আলোচনার সময় একটি বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মাথায় রাখা উচিত, তা হলো- ধর্ষণ, যৌনহামলা বা যৌনহয়রানি রোধে সব পরিকল্পনা, কর্মসূচি, প্রতিরোধ সভা, কমিটি গঠন ও তার প্রয়োগের রূপরেখা যেগুলো দেওয়া হয় বা নেওয়া হয় বা হবে, তার সবটাই ভেস্তে যাবে যদি আমরা আমাদের মস্তিষ্ককে আমাদের মুণ্ডু থেকে অন্যত্র আলাদা করে ফেলি। যে কোনো অপরাজনৈতিক পোষণ-তোষণে নিজেদের বিবেক-নীতি-আদর্শ-নৈতিকতাকে বিসর্জন দিই, আত্মসম্মান ও চরিত্রের মাহাত্ম্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে ইতিহাসের পুতিগন্ধময় আস্তাকুঁড়ে আমাদের অবস্থানটিকে পাকাপোক্ত করতে সচেষ্ট হই।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়া
[email protected]
