ছোটবেলায় দেখতাম দৈনন্দিন কাজে সবাই বেতের বা বাঁশের ঝুড়ি কিংবা কাপড় বা পাটের ব্যাগ ব্যবহার করত। আর এখন সবাই প্লাস্টিক বা পলিথিন ব্যবহার করে। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে বারবার ভুল করলে অবস্থা মহাভারতের শিশুপালের মতো হবে। শিশুপাল শতাধিক অন্যায় করায় শ্রীকৃষ্ণ তার শিরশ্ছেদ করেছিলেন। তাই আমরা এভাবে যদি পরিবেশ-প্রকৃতির বারবার ক্ষতি করি তাহলে আমাদেরও শিরশ্ছেদ হওয়া খুবই নিকটে। এজন্য পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষায় গণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদ, ন্যায়বান কিংবা সুশীল- সবার সচেতন হওয়া অবশ্য কর্তব্য এবং সবার একসঙ্গে কাজ করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করাই হোক আমাদের লক্ষ্য। ১৯৮১ সালে ব্রান্টল্যান্ড কমিশন (Brundtland Commission) ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ রেখে বর্তমানে প্রজন্মের ব্যবহার মেটানোর বিষয় উল্লেখ করেছিলেন; যেটাকে জাতিসংঘ এসডিজির প্রধান থিম করেছে। বাংলাদেশও জাতিসংঘের এই গোল পূরণ করতে বদ্ধপরিকর। আশার বিষয়, কপ-২৯ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সারা বিশ্বের পরিবেশ রক্ষায় থ্রি-জিরো তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন, যা প্রশংসনীয়।...
রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মনীতি, সমাজনীতি, ঘৃণা ও ভালোবাসানীতি ইত্যাদি সব নীতি নিয়েই দ্বিমত ও রেষারেষি থাকতে পারে, তাতে আমাদের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়বে বটে কিন্তু অস্তিত্ব কোনো না কোনোভাবে টিকে থাকবে, এটা নিশ্চিত। একটা বিষয় নিয়ে দ্বিমত থাকলে আমাদের অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে, সেটা হলো পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষা-সম্পর্কিত নীতি। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে আমাদের দেশে এগুলো নিয়ে চলে রাজনীতি। শুধু রাজনীতি বললে ভুল হবে, চলে রাজনৈতিক অর্থনীতি, যার সঙ্গে সম্পর্কিত আমাদের পরিবেশ।
আমাদের সমস্যা আমরা পরিবেশের সঙ্গে রাজনীতি ও অর্থনীতিকে যুক্ত করে ফেলছি। রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য আমরা পরিবেশের ক্ষতি করে চলছি। এটাকে বলা যেতে পারে পরিরাজ অর্থনীতি (পরিবেশ, রাজনীতি ও অর্থনীতির সম্পর্ক)। পৃথিবীর পরিবেশ এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তাই এখনই সময় রাজনীতি, অর্থনীতি ও অন্যসব নীতিকে বর্জন করে পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষায় সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ।
২০০২ সালে বিএনপি আমলে পলিথিন নিষিদ্ধের আইন হয়েছিল। এ বিষয়ে আওয়ামীলীগ সরকার ২০১০ সালে আরেকটি আইন করেছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার এসে এই পলিথিন নিয়ে কঠোর হয়েছে। তবে পলিথিনের ব্যবহার এখনও বন্ধ হয়নি। তাই আইনের পাশাপাশি আমাদের পলিথিনের বিকল্প কিছু ভাবতে হবে। বিগত সরকার সেন্টমার্টিন ও আশপাশের সামুদ্রিক ১,৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশ সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছিল কিন্তু তার জন্য কী পদক্ষেপ নিয়েছিল তা রহস্যময় এবং বর্তমান সরকার সেন্টমার্টিন রক্ষায় কী পদক্ষেপ নিচ্ছে সেটাও অস্পষ্ট। বর্তমান সরকার কি পূর্ববর্তী সরকারের পরিবেশ বিষয়ক উদ্যোগের সঙ্গে তাদের নতুন পরিকল্পনা যুক্ত করবে নাকি পুরো ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে আগের সরকারের সব নীতি বাতিল করে সেন্টমার্টিনসহ বিভিন্ন সংকটাপন্ন এলাকা রক্ষায় সম্পূর্ণ নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করবে, সেটাই ভাববার বিষয়। নীতিনির্ধারকদের উচিত সেন্টমার্টিন নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে এই দ্বীপ নিয়ে পরিকল্পনা স্পষ্ট করা। অর্থ আর সময়ের আপচয় না করে, নতুন ও পুরাতন ভাবনার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পরিকল্পনা হতে পারে উত্তম ভাবনার লক্ষণ।
পাখি ও বন্যপ্রাণী শিকার দণ্ডনীয় অপরাধ। এ অপরাধ দমনের জন্য বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২ রয়েছে কিন্তু অনেক বছর ধরে লক্ষ্য করছি পাখি ও বন্যপ্রাণী ধরা ও হত্যা করা অলিখিত বৈধ।নদীর লাইফলাইন হাজার হাজার খাল এখন মৃত যা বন্যা সৃষ্টির অন্যতম কারণ। খালগুলোর জীবনদান করা এখনই কি উপযুক্ত সময় নয়? খাল দূরে থাক, নদীর পরিসংখ্যান নিয়েই টালমাটাল অবস্থা। কোনো সংস্থা বলে নদীর সংখ্যা ৪০৭, কেউ বলে ৫০০ অথবা ১০০৮। ইতোমধ্যে সরকার নদীর সঠিক সংখ্যা নির্ণয়ে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন, যা ভালো উদ্যোগ। আইন থাকা সত্ত্বেও আগে বিভিন্ন নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন ও নদী-খাল ভরাট বন্ধ করা সম্ভব হয়নি শুধু স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতির কারণে। তাই নদী-খাল উদ্ধার ও রক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারকে বাস্তবভিত্তিক কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ইউএনএফসিসির তথ্য মতে, বাংলাদেশের জলবায়ু ক্রমান্বয়ে পবিবর্তন হচ্ছে। তাদের তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে আমাদের দেশে ধানের ১৭ এবং গমের ২৭ শতাংশ উৎপাদন কমে যেতে পারে। ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে সুন্দরবনের ৭৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। জার্মানওয়াচের গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স (সিআরআই) ২০২১ তথ্যানুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তমে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অধীনে (২০২৩-২৪) ৪৭টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যা এখনো চলমান। এসব প্রকল্প বন্ধ হবে নাকি চালু রাখা হবে অথবা সংশোধন করে চালু রাখা হবে তা ভাববার বিষয়। পরিবেশ, প্রকৃতি ও জলবায়ু-সহনশীল জাতি গঠনে যে প্রকল্পগুলো অপরিহার্য সেগুলো চালু রাখা অথবা সংশোধন করা উচিত। তাছাড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, দেশের অনেক বনভূমি দখলে আছে, সেগুলো উদ্ধারও সময়ের দাবি।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮ (ক) অনুচ্ছেদে পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে সংবিধান সংশোধন বা পুনর্লিখন যাই করা হোক, এই অনুচ্ছেদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। গত সরকার ডেল্টা প্লান, পরিবেশ নীতি-২০১৮, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড গঠন ও ইউএনএফসিসিতে এনডিসি (Nationally determined Contribution) হালনাগাদসহ পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল। এসবের ফল আমরা কমবেশি জানি। জলবায়ুসহিষ্ণু জাতি গঠনে ডেল্টাপ্লান একটি গুরুত্বপূর্ণ সুদূরপ্রাসারী পরিকল্পনা। এজন্য নতুন করে গবেষণার মাধ্যমে ডেল্টাপ্লান নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ভাববার প্রয়োজন আছে বৈকি?
গাছপালা, নদী-নালা, মাঠঘাট এসব প্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে আমাদের জীবন জড়িত। এগুলোর সঙ্গে রয়েছে আমাদের নাড়ির সম্পর্ক। আমরা ভুলে গেছি এই গাছপালা, নদী-নালা ও মাঠঘাটের কথা। শুধু ভুলে যাওয়াই নয়, বরং এগুলোকে আমরা প্রতিনিয়ত হত্যা করছি। এভাবে আমরা নিজেরাই নিজেদের এতিম করে চলছি। বাস্তব উপলব্ধি হচ্ছে- আমরা এতই নিষ্ঠুর হয়ে গেছি যে, এই এতিম হওয়াটাও বুঝতে পারছি না। পরিবেশ নিয়ে বিভূতিভূষণের দর্শন হলো- প্রকৃতি এক জীবন্ত সত্তা, যা মানুষকে অবিরাম স্নেহ, প্রশান্তি এবং আধ্যাত্মিক আনন্দ দেয়। কিন্তু আমরা দেখতে পাই, মানুষ এখন প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে উপলব্ধিহীন হয়ে গেছে। বিভূতিভূষণ তার আরণ্যক উপন্যাসে প্রকৃতির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আমাদের আজকের জেন-জি পড়াশোনায় বিশ্বাসী নয়, তাই তারা কেন আরণ্যকের মতো বই পড়বে। এই জেন-জি যে কীসে বিশ্বাসী, তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন।
লেখক: সাব-এডিটর, দৈনিক খবরের কাগজ