সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি চারপাশ অন্ধকার লাগছে। মোবাইলে দেখি সকাল ৯টা। তাড়াতাড়ি করে উঠতে গিয়ে হঠাৎ মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। আর গালের বাম পাশে তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল। দাঁত, আবার সেই দাঁত ব্যথা। উঠে কোনোমতে নাকে-মুখে পানি দিয়ে এক বন্ধুকে ফোন দিলাম। সে আবার ডাক্তার। দাঁত ব্যথার কথা বলতেই সে হো হো করে অট্টহাসি দিয়ে বলল, ‘দাঁত মাজোস না, দাঁত ব্যথা তো হবেই!’
আমি ফোন রেখে দিলাম। এরাই আমার বন্ধু। ওই দিন একটা রিপোর্টে পড়েছিলাম, ছেলে রোগীরা ছেলে ডাক্তারের চেয়ে মেয়ে ডাক্তারের কাছেই দ্রুত সুস্থ হয়। এই ভেবে আমার এক বান্ধবীকে ফোন দিলাম। সে ডেন্টিস্ট, অন্য শহরে থাকে। আমার সমস্যাটা শুনে বলল, ‘আগে কুসুম গরম পানিতে লবণ দিয়ে কুলি কর। এরপর ভরা পেটে একটা ব্যথার ওষুধ খেয়ে নে। এরপর বিকেলে একটা ডাক্তার দেখা।’
লবণ পানিতে কুলি করে ডাইনিং রুমে আম্মাকে বললাম নাশতা দিতে। খেতে গিয়ে ব্যথায় কোঁ কোঁ করতে লাগলাম। ছোট ভাই আমার ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করে ক্যাপশন দিল, ‘আমাদের কুকুমনি!’
সেদিন বিকেলেই এক ডেন্টিস্টের কাছে গেলাম। সিরিয়াল পড়ল ২ নাম্বার। একটু পর আমার সিরিয়াল আসলে ডাক্তারের রুমে ঢুকে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সুন্দর সুন্দর সব ইন্টার্নি করা ডাক্তার। ডাক্তার সাহেব একজন বয়স্ক লোকের দাঁতে কী যেন করছে আর সেই বয়স্ক লোক একটু পরপর চিঁচিঁ করে উঠছে। আমাকে একটা সিটে বসিয়ে এক সুন্দরী এগিয়ে এসে বলল, ‘কী সমস্যা বলুন।’
তাকে দেখে আমার বুকে ব্যথা শুরু হলো। আমি শুধু আমার দাঁত ব্যথার কথা বললাম, বুকে ব্যথার কথা চেপে গেলাম।
— আপনার দাঁতে তো অনেক কাজ।
‘ডাক্তার দেখবে না?’ আমি চিঁচিঁ করে বললাম।
‘আমিও ডাক্তার!’ মেয়েটা রেগে গিয়ে বলল।
‘না না ঠিক আছে।’ আমি তাড়াতাড়ি বললাম। এরা কথায় কথায় দাঁত তুলে ফেলার মানুষ, এদের সঙ্গে ঝামেলায় কে জড়াবে?
এরপর মেইন ডাক্তার এলেন। উনি দেখে টেখে বললেন, ‘আপনার একটা দাঁত ফেলতে হবে, একটা ফিলিং করতে হবে, একটা রুট ক্যানাল আর দাঁতে ময়লাও আছে। স্কেলিং প্লাস পলিশ করাতে হবে। টোটাল ১২ পড়বে। আজকে ওষুধ লিখে দিচ্ছি। খেয়ে তিন দিন পরে আসবেন।’
আমি উঠে পড়লাম। ১২০০ পড়বে, বেশি না। মনে মনে ভাবলাম।
সেই সুন্দরী প্রেসক্রিপশন লিখছে। লিখে টিখে বলল, ‘স্যারের ভিজিট ৫০ দিন।’
আমি টাকা বের করতে করতে বললাম, ‘স্যার কী ভিজিটসহ ১ হাজার ২০০ বলেছেন?’
— ১ হাজার ২০০ কে বলল? টোটাল ১২ হাজার! দাঁত ফেলা ১ হাজার, ফিলিং ২ হাজার, রুট ক্যানেলসহ ক্যাপ পরা ৭ হাজার, স্কেলিং প্লাস পলিশ ২ হাজার। ৫০০ ভিজিটের বাইরে।
— ও আচ্ছা আচ্ছা। ঠিকই তো। ১২ হাজারই তো হবে। ১২ লাখ তো আর হবে না। হে হে।
মেয়েটা হাসির বিপরীতে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল। বাসায় এসে আম্মাকে বললাম, ১২ হাজার লাগবে টোটাল।
ছোট ভাই হাসতে হাসতে বলল, ‘বলো কী ভাইয়া? তোমার পুরো বডির দামও তো ১৫ হাজার হবে না।’
তিন দিন পর দাঁত ফেলতে বের হলাম। এলাকার মোড়ে বাকের ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। উনি আমাদের এলাকার নামকরা বড় ভাই।
— এই সুমন কই যাস?
— ভাই ডাক্তারের কাছে দাঁত ফেলতে।
— দাঁত ফেলতে? কত নেবে?
— দাঁত ফেলা ১ হাজার।
— কস কী? ১ হাজার! আমাকে ৫০০ দে। এখনই ফেলে দিচ্ছি!
আমি তাড়াতাড়ি সটকে পড়লাম। থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলার রেকর্ড বাকের ভাইয়ের আছে।
ডাক্তারের চেম্বারে হাজির হলাম। আজ দাঁত ফেলবে। কী যে হয় কে জানে। ওই মেয়ের হাতে পড়লে আজ খবরই আছে। দাঁতসহ টেনে আলজিহ্বা নিয়ে আসবে। আমাকে সিটে শুইয়ে রেখে সেই মেয়ে হাজির।
‘আপনি ফেলবেন?’ আমি করুণ স্বরে জিজ্ঞাসা করলাম।
— না স্যার ফেলবে। আমি অ্যানেস্থেশিয়া দেব।
আমার প্রতি ক্ষোভ ছিল বলেই না কেন জানি প্রচণ্ড ব্যথা পেলাম।
‘নড়বেন না। আরেকটা দেব।’ মেয়ের জলদ গম্ভীর কণ্ঠ।
দুটি অ্যানেস্থেশিয়ার চোটে আমার গালের বামপাশ অবশ হয়ে পড়ল।
এরপর ডাক্তার এসে চোখের নিমেষে দাঁত ফেলে দিল। বিশাল একটা তুলা মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, ‘এটা চেপে ধরুন। এক ঘণ্টা পর ফেলবেন।’
আবার সেই মেয়ে। আমার অবস্থা দেখেই বোধহয় মুচকি হেসে দিল।
— এক ঘণ্টা পর তুলা ফেলে একটা কাপ আইসক্রিম খাবেন। আগামী ২৪ ঘণ্টা নরম আর ঠাণ্ডা খাবার খাবেন। এই যে ওষুধগুলো খাবেন।
প্রেসক্রিপশন পড়ে দেখি এক জায়গায় একটা ওষুধের নাম লেখা। পাশে লেখা, পায়ুপথে দেবেন।
আমি চেম্বার থেকে বের হয়ে মনে মনে ঠিক করে ফেললাম, এখন থেকে আর অবহেলা নয়। দাঁতের যত্ন নিতে হবে। আজকেই একটা ভালো পেস্ট কিনবো। আর দাঁতের ব্রাশটা কোথায় সেটাও খুঁজে বের করতে হবে। গত ঈদে দাঁত মাজার পর কোথায় যে রেখেছি কে জানে!