প্রচণ্ড শীত পড়েছে। এই শীতে মালতী সুবাস বাবুর কাছে নিয়মিত প্রাইভেট পড়ে এবং প্রতিদিন একই পথ ধরে যাতায়াত করে। এই নিয়মিত যাতায়াতের মাঝেই তুষারের চোখে পড়ে যায় মালতী। তুষার অনেকদিন ধরেই দূর থেকে মালতীকে ফলো করে। প্রতিদিন কোনো রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকানে মালতীকে এক নজর দেখার জন্য বসে থাকে।
তার শয়নে-স্বপনে, নিশিত-জাগরণে মালতী হয়ে উঠেছে তার ধ্যান-জ্ঞান। মালতী ছাড়া সে এখন আর ভাবতেই পারে না। খেতে বসলে মালতীকে মনে পড়ে, গোসল করতে গেলে মালতীকে মনে পড়ে, নিরিবিলি বসে থাকলেও মালতীকে মনে পড়ে। মালতীবিহীন তুষারের পৃথিবী অন্ধকার। মালতীই যেন একমাত্র আলো।
এই হাড় কাঁপানো শীতে কুয়াশার মধ্যে সে বসে থাকে মালতীকে এক পলক দেখার জন্য। মনভরা অগাধ ভালোবাসা থাকলেও মালতীর সামনে বলার সাহস নেই। সে ভীতুর ডিম। দিনের পর দিন কষ্টে কাটলেও মালতীর কাছে গিয়ে সাহস করে দাঁড়াতে পারেনি।
মালতীদের বাড়ির সবকিছুই ভালো লাগে তার। মালতীদের বাড়িতে একটা কুকুর আছে। তুষারের কাছে মনে হয়—পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কুকুর। এর মতো সুন্দর কুকুর সে আর কখনো দেখেনি। তুষার কুকুরটাকে দেখলেই রুটি-বিস্কুট কিনে দেয়। কুকুরটির সঙ্গে তুষারের খুব ভাব হয়ে গেছে।
মালতীদের বাড়ি রাস্তার পাশেই। সেই পথ দিয়েই তুষারের যাতায়াত। মালতীদের বাড়িটি দেখলেও তুষারের মনে শান্তি লাগে। মনে মনে সে নিজেকে বলে—একদিন মালতীকে তার মনের কথা বলবেই। সেদিন মালতী তাকে ফেরাবে না।
মালতীর সঙ্গে কুয়াশার ভিড়ে দেখা হয়ে গেলে সে এক চিলতে হাসি দেয়। সেই ভুবন ভোলানো হাসি তুষারের হৃদয়ের মাঝে বাড়িঘর, সংসার সবকিছু তৈরি করে ফেলে।
এভাবে আর কতদিন! একদিন তুষার সাহসী হয়ে ওঠে। সেদিনও ছিল তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশা। মনে মনে ভাবল, শুভ কাজে দেরি করতে নেই—আজই মনের কথা বলবে।
কুয়াশার ভেতর চাদর মুড়ি দিয়ে মালতীকে হেঁটে যেতে দেখে তুষারের বুক ধুকপুক করতে থাকে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সে বলে, মালতী, তোমাকে একটা কথা বলব।
চাদরের ভেতর থেকে মিহি গলায় উত্তর এল, বলো।
তুষার একটু সাহস পেল। সে বলল, মনে কিছু নিও না, প্লিজ।
চাদরের ভেতর থেকে আবার উত্তর এল, না, মনে কিছু নেব না। বলো।
এবার আর দেরি না করে তুষার বলে, অনেক দিন ধরে বলতে চাইছি আমি তোমাকে পছন্দ করি। মানে… ভালোবাসি।
চাদরের ভেতর থেকে শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন এল, সত্যিই ভালোবাসো?
তুষার সঙ্গে সঙ্গে বলল, হ্যাঁ! তুমি কী বলো?
ঠিক তখনই চাদরটা ধীরে ধীরে নামল। আর সঙ্গে সঙ্গেই তুষারের হৃদয়ও যেন নামল পায়ের কাছে। কারণ সামনে মালতী নয়, দাঁড়িয়ে আছেন মালতীর মা!
তিনি গম্ভীর স্বরে বললেন, আমি মালতী নই, আমি মালতীর আম্মু।
আর কিছু শোনার অপেক্ষা না করে তুষার দিল দৌড়। ঘন কুয়াশা ভেদ করে ঠাকুরবাড়ির পাশ দিয়ে, মাঝিবাড়ি পার হয়ে সোজা নিজের বাড়ি। এমন দৌড় সে জীবনে কখনো দেয়নি।