দুপুরের শুয়ে আছি। সবেমাত্র চোখটা লেগে এসেছে। এই সময় ফোন আসাটা মশার কামড়ের মতোই বিরক্তিকর। বালিশের পাশে ফোনটা বেজে উঠতেই আমি চোখ বন্ধ রেখেই ফোনটা উল্টো করে আবার পাশ ফিরলাম। কিন্তু ফোনের ওপাশের মানুষটা নাছোড়বান্দা, আবার বাজতে শুরু করল।
বাধ্য হয়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরলাম। ওপাশ থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এল, ‘কীরে, কেমন আছিস?’
ঘুম জড়ানো গলায় বললাম, ‘ভালো। কিন্তু... আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না।’
ওপাশ থেকে খিলখিল করে হাসির শব্দ। মেয়েটি বলল, ‘আমাকে চিনতে পারলি না? আমি তোর ভাবি।’
আমার ঘুমের রেশ তখনো কাটেনি। অবাক হয়ে বললাম, ‘ভাবি মানে? আমার তো কোনো ভাই নেই। আমি তো একা।’
ওপাশ থেকে মেয়েটি এবার একটু ধমকের সুরে বলল, ‘একা মানেই বোকা। সাদ্দাম নামের কাউকে চিনিস?’
নামটা শুনেই ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। মনে পড়ল, আরে। মেজো চাচার ছেলে সাদ্দাম ভাইয়া তো দুই মাস আগেই বিয়ে করেছে আর ভাবিকে তো আমি ছোট থেকেই চিনি।
আমি তোতলামি করে বললাম, ‘ও... তুমি।’
ভাবি তখন হাসতে হাসতে আমাকে একটা কঠিন অঙ্ক বুঝিয়ে দিল।
— মনে রাখবি, ভাই হয় পাঁচ রকমের। নিজের ভাই, চাচাতো ভাই, ফুফাতো ভাই, খালাতো ভাই আর মামাতো ভাই। এখন তোর মামার একটা মাত্র মেয়ে, ওদিকে তোর তো খালাই নেই। তোর ফুফুর দুটোই মেয়ে। আর চাচাদের মধ্যেও সব মেয়ে, শুধু মেজো চাচার একটা ছেলে আছে, সাদ্দাম। তাহলে লজিক কী বলে? তোর ভাই তো এই একটাই।
আমি বোকার মতো মাথা নেড়ে ফোনে বললাম, ‘হুম, লজিক তো ঠিকই আছে।’
ফোন রাখার পর ভাবলাম, ছোটবেলা থেকে ‘একা’ বলে নিজেকে খুব স্পেশাল ভাবতাম। কিন্তু মনে হচ্ছে দুনিয়াটা আসলে সম্পর্কের মাকড়সার জাল, আর আমি সেখানে আটকে থাকা একটা বোকা মাছি।
পরদিন কলেজে গেলাম। সমাজবিজ্ঞান ক্লাসে ম্যাম পড়াচ্ছেন ‘পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিকীকরণ’। হঠাৎ আমাকে দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘ত্যাগ জিনিসটা মানুষ পরিবার থেকে কীভাবে শেখে? জীবন থেকে একটা উদাহরণ দাও তো।’
আমি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললাম, ‘ম্যাম, আমি তো একমাত্র সন্তান। আমাকে কিছু স্যাক্রিফাইস করতে হয় না। টিভির রিমোট থেকে শুরু করে মুরগির রান—সবই আমার। তাই ত্যাগের বিষয়টা...।’
ম্যাম আমার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসলেন, ‘ভাইবোন থাকলে মানুষ শেয়ার করা শেখে, মিটমাট করা শেখে। তুমি তো একা বড় হয়েছ আর একা মানেই যে কিছুটা বোকা, সেটা তোমার উত্তর থেকে...।’
পুরো ক্লাস হাসিতে ফেটে পড়ল। আমি বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।
মনটা খুব খারাপ। সবাই আমাকে বোকা ভাবছে। ভাবলাম নতুন ভাবি ফোন দিল, তাকে একটা গিফট পাঠিয়ে প্রমাণ করে দেব, আমি বেশ স্মার্ট ও দায়িত্ববান দেবর।
একটা শাড়ি গিফট করব ভাবলাম। কিন্তু আজকালকার মেয়েরা তো শাড়ি পরে না। ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে একটা পেজ পেলাম—এক্সক্লুসিভ থ্রি-পিস। সেখানে চমৎকার কিছু ছবি। দাম লেখা ৩ হাজার টাকা, কিন্তু অফারে মাত্র ১ হাজার ২০০। এটাই সুযোগ। সঙ্গে সঙ্গে ইনবক্স করলাম, ‘থ্রি-পিসটা নিতে চাই। ক্যাশ অন ডেলিভারি হবে তো?’
আমি তো আর বোকা নই যে আগেই টাকা দেব। কিন্তু ওপাশ থেকে রিপ্লাই এল খুব ভদ্র ভাষায়, ‘স্যার, অবশ্যই সিওডি হবে। কিন্তু, আপনি তো এটা গিফট হিসেবে পাঠাবেন, তাই না?’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ, ভাবিকে দেব। কিন্তু আপনি বুঝলেন কীভাবে?’
— স্যার, ডেলিভারি এড্রেস আর আপনার প্রোফাইলের লোকেশন আলাদা। আপনি ভাবিকে গিফট পাঠাচ্ছেন। এখন ডেলিভারি ম্যান গিয়ে যদি ভাবির কাছে টাকা চায়, বিষয়টা কি আপনার সম্মানে লাগবে না?
লজিকটা শুনে আমি থমকে গেলাম। ভাবির হাতে প্যাকেট যাবে আর ডেলিভারিওয়ালা টাকা চাইবে—ছিঃ ছিঃ। এটা তো আমার মান-ইজ্জতের প্রশ্ন। দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে ১ হাজার ২০০ টাকা আর ডেলিভারি চার্জসহ সেন্ড মানি করে দিলাম।
টাকা পাঠানোর পর লিখলাম, ‘অর্ডার কনফার্ম।’
মিনিট দুয়েক পর মেসেজ সিন হয়েছে। কিন্তু রিপ্লাই নেই। ভাবলাম হয়তো প্যাকিংয়ে ব্যস্ত। ৫ মিনিট পর আবার পেজে ঢুকতে গেলাম। দেখি লেখা—একটি সমস্যা হয়েছে।
প্রথমে ভাবলাম নেটের সমস্যা। আরেকটা আইডি দিয়ে সার্চ দিলাম। পেজ ঠিকই আছে, কিন্তু আমাকে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে বিছানায় বসে রইলাম। সবমিলিয়ে জীবনের অঙ্কটা খুব পরিষ্কার হয়ে গেল।
একমাত্র সন্তান হওয়ার রাজকপাল নিয়ে জন্মেছি ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে দুনিয়াদারির প্যাঁচে আমি আসলেই কাঁচা। চারপাশের সবাই আমাকে বুঝিয়ে দিল—একা মানেই বোকা।