ভোলার চরাঞ্চলে ২০০ বছর ধরে মহিষ পালন করা হচ্ছে। এটি বর্তমানে স্থানীয় কৃষকদের জন্য লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। মহিষের দুধ ও দই উৎপাদন করে তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। প্রতিদিন প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। এই দুধ স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করা হয়। উন্নত জাতের মহিষ প্রজনন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এখানে মহিষ পালন খাতে আরও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোলার চরের পরিবেশ ও আবহাওয়া মহিষ পালনে অত্যন্ত উপযোগী। এ অঞ্চলের সবুজ ঘাসের সমারোহ এবং বিশাল চরাঞ্চল মহিষ পালনের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। একদিকে এখানকার চাষিরা মহিষের দুধ বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে মহিষের মাংসও বিক্রি করে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। প্রতিটি মহিষের খামারে ঘরোয়া পরিবেশে ২০০ থেকে ১ হাজার পর্যন্ত মহিষ পালন হয়। তবে বর্তমানে অনেকেই নিজেদের বাড়ির গোয়ালঘরে মহিষ পালন শুরু করেছেন। এতে তারা ভালো আয়ের উৎস সৃষ্টি করেছেন।
ভোলার প্রায় অর্ধশতাধিক চরাঞ্চলে মহিষ পালন করা হয়ে থাকে। এসব চরে ২ লাখ ৬০ হাজার মহিষের হিসাব থাকলেও প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। এখানে ৯৭টি বড় মহিষ খামার (বাথান) এবং প্রায় ৭০৫টি দুগ্ধ খামার রয়েছে। এসব খামারের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। এই দুধ স্থানীয় ২১ লাখ মানুষের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অন্যান্য জেলার বাজারেও সরবরাহ করা হয়। দুধের চাহিদা মেটানো ছাড়াও এখানকার অনেক পরিবার দই তৈরি করেন।
জেলার চরের মানুষদের জন্য মহিষ পালন অর্থনৈতিক মুক্তির পথও।
অনেকেই জানাচ্ছেন, আগে মহিষ পালনে কিছু অসুবিধা ছিল, যেমন মহিষের রোগে আক্রান্ত হওয়া। তবে এখন বিভিন্ন টিকা ও ক্রিমিনাশক ওষুধের কারণে এসব সমস্যার পরিমাণ অনেকটা কমে গেছে। এতে লোকজন এখন আগের চেয়ে বেশিসংখ্যক মহিষ পালন করতে আগ্রহী।
ভোলার চর বৈরাগিয়ার এক মহিষ খামারি জাকির হাওলাদার জানান, তার পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে মহিষ পালন করে আসছেন। বর্তমানে তার খামারে ৯৫টি মহিষ রয়েছে। তিনি আরও জানান, আগে মহিষ পালনে নানা ধরনের সমস্যা থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি অনেক ভালো হয়েছে। এই খামারে প্রতিদিন প্রচুর দুধ উৎপাদিত হয়। এটি তাদের পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করছে।
ভোলা জেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম খান জানান, জেলায় সরকারি হিসাবে ১ লাখ ৪০ হাজার মহিষ রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার লিটার দুধ উৎপন্ন হয়। তিনি জানান, ভোলার মহিষের দুধ ‘জলা মহিষ’ নামে পরিচিত। এটি অত্যন্ত গুণগত মানের। মহিষের দুধ এবং মাংসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এখানে মহিষ পালনকারীরা আরও বেশি লাভবান হচ্ছেন।
এখানে অনেক কৃষক মহিষের দুধ থেকে দই তৈরি করেন, যা স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। দইয়ের পসরা গ্রামের হাটগুলোতে প্রচুর দেখা যায়। বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠানসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে মহিষের দই খাওয়া একটি প্রচলিত রীতি। বর্তমানে দইয়ের বিক্রি মূল্যও বেড়েছে। দই থেকে মাখন, ঘি ও ঘোল তৈরি হয়, যার মূল্য বাজারে অনেক বেশি।
এখানকার অনেক কৃষক ও মহিষ পালনকারী পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটেছে। চরে কৃষক মিন্টু খাঁ ২০০১ সালে মাত্র ৫০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ৪টি মহিষ দিয়ে মহিষ পালন শুরু করেন। বর্তমানে তার খামারে ৪১টি মহিষ রয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ২০ লাখ টাকা। তিনি বলেন, মহিষ পালন করে তিনি তার সংসারের খরচ মেটান এবং ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
ভোলায় মহিষ পালন, এর উৎপাদিত দুধ ও দইয়ের বাণিজ্য ব্যাপকতার কারণে দক্ষিণাঞ্চলবাসীর জন্য নতুন আশা ও আত্মবিশ্বাসের পথ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা মনে করেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত জাতের মহিষ পালনের মাধ্যমে এই শিল্প আরও প্রসারিত হবে। সরকারের উদ্যোগে উন্নত জাতের মহিষের প্রজনন খামার চালু করার ফলে ভবিষ্যতে আরও ভালো ফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।