ত্রয়োবিংশ পর্ব
শাহবাজ খানের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তুমুল লেখালেখি চলছে। প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে ধিক্কার জানাচ্ছে। তার অপকর্মের কথা গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে সারা বিশ্বের বাঙালিদের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বাঙালিরা অনলাইনে শাহবাজ খানের অপকর্ম নিয়ে টকশো করছে। এসব দেখে শাহবাজ খানের মাথাখারাপ অবস্থা। তিনি তার লোকদের ডেকে বলেছেন, কোনো পত্রিকা, টিভি কিংবা অনলাইনে আমার বিরুদ্ধে যদি কোনো রিপোর্ট আসে তাহলে বিজ্ঞাপন বন্ধ। বিজ্ঞাপনের বিল বকেয়া থাকলে টাকা দেওয়া বন্ধ। বুঝতে পারছোস আমার কথা!
সঙ্গে সঙ্গে শাহবাজ খানের লোকরা কাজে নেমে পড়ল। তারা কয়েকটা গ্রুপে ভাগ হয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করল। যাকে যেভাবে বলা দরকার সেভাবে বলা হলো। কাউকে কাউকে দেওয়া হলো হুমকি। ব্যাস, গণমাধ্যম একেবারে চুপ! কোনো পত্রিকা, অনলাইন পত্রিকা কিংবা টিভি মাধ্যমেই আর খবরটি দেখা যাচ্ছে না।
আসলে মিডিয়াপ্রধানরা নিরুপায়। তারা দেখলেন, শাহবাজ খানের খবরটি প্রকাশ করার মানে বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যাওয়া। এমনিতেই করোনার বাজারে বিজ্ঞাপনের মঙ্গাবস্থা। শাহবাজ খান যদি তার গ্রুপের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেন তাহলে আর্থিকসংকট আরও বাড়বে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংবাদকর্মীদের বেতন আসে বেসরকারি বিজ্ঞাপন থেকে। সরকারি বিজ্ঞাপন ছাপা হলেও বিজ্ঞাপনের বিল পাওয়া দুষ্কর। সরকারি বিলের জন্য দু-তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়। বড় কোম্পানিগুলোই যেন পত্রিকাগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে পত্রিকাওলারা টুঁ-শব্দটিও করে না। করতে পারে না। বিজ্ঞাপন না পাওয়ার ভয়ে নিজেরাই নিজেদের টুঁটি চেপে ধরছেন।
গণমাধ্যমের এই তোষণনীতির কারণে মানুষ ভীষণ ক্ষুব্ধ। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় ফেসবুকে। গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিনিয়ত বিষোদগার করছে। তারা বলছেন, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এখন আর এর কোনো অস্তিত্ব নেই। এক সময় হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই হয়ে উঠবে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ! একবিংশ শতাব্দীর বিস্ময়কর আবিষ্কার ফেসবুকই মধ্যপ্রাচ্যে আরববসন্ত সৃষ্টি করেছিল। ফেসবুকের কল্যাণে আরও কত বসন্ত আমাদের দ্বারে উপস্থিত হবে; কে জানে!
শাহবাজ খান দেখলেন, তিনি মিডিয়ার মুখ বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। এবার তিনি ফেসবুকের মুখও বন্ধ করবেন। কারা কী মন্তব্য করছে সেগুলো চিহ্নিত করার জন্য একদল আইটি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করলেন। তাদের বললেন, তোমাদের কাজ হলো, ফেসবুক ঘেঁটে তালিকা করা। কারা আমার বিরুদ্ধে লেখালেখি করছে সেগুলো খুঁজে বের করা। আমি তাদের কাউকে ছাড়ব না!
যেই কথা সেই কাজ। একদল আইটি বিশেষজ্ঞ নেমে পড়ল মাঠে। তারা রাতদিন অনুসন্ধান চালাতে লাগল। তারা ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় দেখছে আর বলছে, ইস, এগুলো যদি ডিলিট করার ব্যবস্থা থাকত!
শাহবাজ খান ইস্যুতে গণমাধ্যম ফেসবুকের কাছে ধরা খেয়ে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। পুলিশ বিপুল অঙ্কের টাকা খেয়ে শাহবাজ খান ইস্যুটিকে ধামাচাপা দিতে যাচ্ছে। সেটা জনগণের কাছেও স্পষ্ট হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে ইস্যুটিকে অন্যদিকে নিয়ে যাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে যে শাহবাজ খানকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে সেটা বুঝতে কারও গবেষণার প্রয়োজন নেই। শুরুর দিকে তরুণ পুলিশ অফিসাররা ইস্যুটিকে চমৎকারভাবে মানুষের কাছে উপস্থাপন করলেও অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ওপরের নির্দেশে ইস্যুটিকে কবর দিয়েছে। এখন তারা অন্য গীত গাইছেন। যার কোনো তাল নেই, লয় নেই, সুরও নেই। সেই বেসুরো গীত কেউ আর শুনছে না। বরং মানুষ নানা ভাষায় ঘৃণা প্রকাশ করছে। মানুষ এখন জোরেশোরেই বলছে, অর্থের কাছে বিচারের বাণী প্রকাশ্যে কাঁদে।
এক সময় বলা হতো, বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। এখন সবকিছু উল্টে গেছে। অর্থ সর্বগ্রাসী প্রভাব সর্বকালে সর্বযুগেই ছিল। অর্থের প্রভাবে দিনকে রাত আর রাতকে দিন বানানো হতো। কিন্তু তারও একটা নীতি ছিল। এখন নীতিফিতির কোনো বালাই নেই। অর্থ থাকলে সাত খুন মাফ। আর অর্থ না থাকলে নিরীহ মানুষও খুনের আসামি হয়ে যায়! শাহবাজ খানের অর্থবিত্ত কী করে তাকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে তাই মানুষ দেখছে।
গণমাধ্যমকে চুপ করাতে পেরে ভীষণ খুশি শাহবাজ খান। তিনি বুঝে গেছেন, এখন আর তাকে কেউ কিছু করতে পারবে না। পুলিশ তার হাতের মুঠোয়! এবার ফেসবুকে যারা আমার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে তাদের ধরতে হবে।
ফেসবুকে যারা নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন তাদের দীর্ঘ তালিকা শাহবাজ খানের হাতে। তিনি এবার তার নিজস্ব মিডিয়ার সাংবাদিকদের ডাকলেন। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে শুরু করলেও হঠাৎ করেই তিনি রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন। তিনি তাদের অত্যন্ত বাজে ভাষায় গালমন্দ করতে শুরু করলেন। সব সাংবাদিককে সেই গাল হজম করতে হলো। গালির বর্ষণ শেষ হওয়ার পর তিনি কিছুক্ষণ দম নিলেন। চেয়ার থেকে উঠে ফ্রিজের কাছে গেলেন। ফ্রিজ থেকে একটি বিয়ারের ক্যান বের করে ঢকঢক করে গিলতে শুরু করলেন। কেউ কেউ আড়াচোখে তার কাণ্ডকীর্তি দেখছেন। কিন্তু তিনি ওসবের তোয়াক্কা করছেন না। তিনি এবার নিজের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, আমার এই বিপদের সময় যে হালারপুত কোনো সহযোগিতা না করবে তার চাকরি নাই! আমার সোজা-সাপ্টা কথা! যারা আমার বিরুদ্ধে ফেসবুকে লিখছে তারা প্রত্যেকেই কারও না কারও পরিচিত। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই তাদের কাছে যেতে হবে। তাদের বলতে হবে, তারা যেন সমালোচনা বন্ধ করে। প্রয়োজনে তাদের হিট করতে হবে। আবারও বলছি, আমি কিন্তু কাউকে ছাড়ব না। পাবলিক সাপের লেজে পা দিয়েছে!
১৭
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বিদেশি বন্ধুদের সম্মানিত করেছে সরকার। তাদের স্বর্ণপদকে ভূষিত করা হয়েছে। এতে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের গৌরব বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সেই গৌরবের গায়ে কাঁটা বিঁধেছে ভেজাল সোনা। পদকের সোনায় নাকি অনেক খাদ ছিল। তা নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম রিপোর্ট করেছে। রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ‘পদকের সোনায় খাদ’। এই রিপোর্ট নিয়ে দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। বহির্বিশ্বের কাছে ছোট হয়েছে বাংলাদেশ। কেউ কেউ এমন কথাও বলছেন, রোজিনা দেশদ্রোহী! দেশের বিরুদ্ধে এমন রিপোর্ট কেউ প্রকাশ করে! কিন্তু যারা কাজটা করল তারা যেন কোনো দোষ করেনি!
রোজিনা একজন পেশাদার সাংবাদিক। অনেকদিন ধরেই সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত। সংবাদে তার পেশাজীবন শুরু হয়। পরে সে প্রথম আলো পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেয়। সচিবালয় বিটে কাজ করে। কাজের ক্ষেত্রে তার ভালো একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কিছু অনুসন্ধানী রিপোর্ট করে সে বেশ সাড়া ফেলেছে। তাকে নিয়ে নানারকম বদনাম রটানো হলেও রিপোর্টার হিসেবে সে যেসব কাজ করেছে তা পাগলেও খারাপ বলবে না। করোনাকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতির অনেকগুলো রিপোর্ট করে সে। তাকে নিয়ে মন্ত্রী বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েন। তাকে কীভাবে শায়েস্তা করা যায় তা নিয়ে ভাবেন তিনি। মন্ত্রণালয়ের অন্য কর্মকর্তারাও তাকে নজরে রেখেছেন। কীভাবে তাকে ধরা যায় সেই পথও খুঁজছেন তারা।
কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মন্ত্রীর দপ্তরে এসে বুঝিয়েছেন, রোজিনা মন্ত্রণালয় থেকে ফাইল চুরি করে নিয়ে যায়। তার পর উল্টাপাল্টা রিপোর্ট করে। কর্মকর্তাদের কথা শুনে মন্ত্রী ক্ষেপে গিয়ে বললেন, ফাইল কীভাবে চুরি করে? আপনারা কোথায় থাকেন? নিশ্চয়ই আপনাদের কেউ সহায়তা করে!
কর্মকর্তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে একসঙ্গে বললেন, না না স্যার! আমরা কেউ করছি না। আমরা যখন মিটিংয়ে থাকি তখন সে আমাদের কক্ষে এসে ফাইল চুরি করে নিয়ে যায়!
তাই নাকি! সত্যি বলছেন তো!
জনৈক কর্মকর্তা বললেন, জি স্যার, সত্যি বলছি।
চুরি করে যখন নিয়ে যায় তখন চোর ধরার ব্যবস্থা করেন। কি পারবেন না?
অপর এক কর্মকর্তা বললেন, জি স্যার। অবশ্যই ধরতে পারব স্যার।
তাহলে ধরেন! চোর ধরতে তো কোনো অসুবিধা নেই। দোষও হবে না। সাংবাদিক তথ্য জানতে চাইতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতার নামে অফিশিয়াল ফাইল চুরি করা তো ঠিক না! একজনকে ধরতে পারলে অন্য কেউ আর সাহস করবে না। কী বলেন?
কর্মকর্তারা সমস্বরে বললেন, জি স্যার। একদম ঠিক বলেছেন স্যার।
মন্ত্রী মনে মনে বিষয়টা নিয়ে ভাবছেন। ভালো হবে না মন্দ তা নিয়ে নিজে নিজেই চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। অন্যরাও নিজেদের মতো করে ভাবছেন। কেউ কোনো কথা বলছেন না। কিছুক্ষণের জন্য সবাই নীরব। হঠাৎ একজন কর্মকর্তা বললেন, আমি একটা কথা বলি স্যার?
হুম বলেন।
স্যার, তাকে ধরার জন্য আমরা ওত পেতে থাকব। ফাঁদও পাততে পারি স্যার।
কী রকম? মন্ত্রী জানতে চাইলেন।
কর্মকর্তা বললেন, মাছ ধরার জন্য আগে থেকে যেমন আদার লাগে; চোর ধরার জন্যও তেমন আদার লাগে। আমরা কিছু ফাইলপত্র টেবিলে এলোমেলোভাবে রেখে পুলিশ এবং আমাদের নিম্নস্তরের কিছু কর্তকর্তাকে পাহারায় রাখতে পারি। রোজিনা সাধারণত ১২টার দিকে মন্ত্রণালয়ে ঢোকে। ওই সময়টায় আমরা বোর্ডরুমে বসে মিটিং করব। অকাজের মিটিং। আমাদের কাউকে না দেখে রোজিনা টেবিলে রাখা ফাইলপত্র ঘাটবে। কেনাকাটাসংক্রান্ত ফাইলপত্র দেখলে সে সেগুলো নিজের ব্যাগে ঢোকাবে। সে সময় আমাদের লোকেরা তাকে ধরে ফেলবে। হাতেনাতে ধরা খেলে কিছুই বলার থাকবে না।
কর্মকর্তার কথায় মন্ত্রী আশ্বস্ত হলেন। তিনি বললেন, ঠিক আছে। তাই করুন। আমার দরকার চোর ধরা। মানে ওই ষন্ডা রিপোর্টারকে ফাঁসানো। তাকে যে করেই হোক ফাঁসাতে হবে।
একজন অতিরিক্ত সচিব বললেন, আপনি শুধু অপেক্ষা করেন স্যার। দেখেন কী করি!
মন্ত্রী বললেন, ঠিক আছে।
চলবে...
আরও পড়তে ক্লিক করুন-
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭, পর্ব-১৮, পর্ব-১৯, পর্ব-২০, পর্ব-২১, পর্ব-২২