১
আমার শরীরটাই কেবল বড় হয়েছে, স্বভাবটা একদম পাল্টায়নি। উদাম গায়ে—লুঙ্গিতে কাছা মেরে, আজও ফুল-পাখির পিছু ছুটি। শুধু পাশে নাই সমবয়সীরা, ওরা সবাই সংসারী। ‘সবাই তো কিছু একটা করে, আমি না হয় কিছু না-ই করলাম।’ এই যে সটান হয়ে খোলা বারান্দায় শুয়ে আছি মাটিতে, এগুলো কি বড়দের স্বভাব? এগুলো শিশু-কিশোরের স্বভাব। আমার শিশুতোষ স্বভাব আজও যায়নি।
দুপুর দা, ও দুপুর দা।
হাঁকডাক করতে করতে বাড়িতে ঢুকল ডেউয়া।
আমি চট করে শোয়া থেকে উঠে বসলাম।
- কীরে ডেউয়া?
- দাদা শিগগির চলো। পশ্চিমপাড়ার ভিটায় দেখলাম, ছোট্ট একটা মেহগনি গাছকে লতাপাতায় যাইত্তা ধরছে।
- কছ কী!
- হ দাদা।
আমি রশির ওপর থেকে গামছাটা টান দিয়ে নিয়ে ছুটলাম।
আমার সঙ্গে সব পিচ্চিবাহিনী টেনেহিঁচড়ে নামাচ্ছে গাছ থেকে লতাপাতা। ওরাই এখন আমার সমবয়সী। ওরা আমাকে ওদের মতোই ভাবে।
২.
গাছ থেকে লতাপাতা পরিষ্কার করে এসে বসলাম ভিটার উঁচু ঢিবিতে। গামছাটা ঝাড়া মেরে মুখের ঘাম মুছতে লাগলাম। ওরা সবাই আমাকে ঘিরে বসেছে।
- গাব খাবে দাদা? সুকীবুল বলল।
- গাব কই পাইলি?
- ওই যে, ওই গাছের থেইকা আমরা সবাই পাড়ছি।
আমি গাব খাচ্ছি। আর ওরা গাব নিয়ে কাড়াকাড়ি, ঠেলাঠেলি শুরু করেছে।
- তোরা শোন
- কী দাদা, কী-কী? বলতে বলতে ওরা জড়োসড়ো হয়ে বসল।
- পৃথিবীতে সবার আগে গাছ লাগাইছে কে জানস?
- মানুষে লাগাইছে।
বলল ডেউয়া। বাকি সবাই চুপচাপ।
- মানুষ আহনের আগের থেকেই পৃথিবীতে গাছপালা ছিল। তাইলে মানুষে লাগাইল কীভাবে?
- হ তাইতো!
আরো পড়ুন: বার্লি ও গমের বীজ দিয়ে গর্ভধারণের পরীক্ষা!
- শোন পৃথিবীতে সবার আগে গাছ লাগাইছে বাতাস।
ওরা সবাই খিলখিল করে হেসে উঠল!
- তোরা হাসছ ক্যান?
- দাদা বাতাসের কি হাত-পা আছে? বলল ডেউয়া।
- নাই তো।
- তাইলে বাতাস কীভাবে গাছ লাগাইল?
- আরে ডেউয়া বাতাসের হাত-পা লাগেনি? বাতাস উড়াই নিয়া ফালাইলেই তো সেই বীজ থেকে গাছ হয়।
- তাইলে ওই বীজটা তো একটা গাছে হইছে তাই না?
- হ হইছে।
- তাইলে ওই গাছের বীজটা কই থেকে আসলো?
- তা জানি না রে। তবে পৃথিবীতে এত গাছ সবার প্রথম বাতাসে লাগাইছে মনে হয়। এই গাছের বীজ ওইখানে নিয়া ফালাইছে, আবার ওই গাছের বীজ আরেকখানে নিয়া ফালাইছে। এভাবে পৃথিবীতে গাছের বংশ বাড়ছে।
- দাদা আমার একটা ফুল গাছের ডাঁট ভাইঙ্গা গেছে, চলো না কাদামাটি দিয়া ব্যান্ডেজ করে আসি ডাঁটটাকে। বলল সুকীবুল।
- আচ্ছা চল যাই।
আমি কাদামাটি, আর ধানের নাড়া দিয়ে গাছের ডালটাকে বেঁধে দিচ্ছি। ওরা সবাই আমাকে ঘিরে বসেছে, কেউ পানি এগিয়ে দিচ্ছে, কেউ নাড়া ভিজিয়ে দিচ্ছে।
৩.
হজরত একদিন রাস্তা দিয়া যাইতে ছিল। দেখে এক কিশোর পাখির ছানা নিয়া খেলা করতাছে, আর মা পাখিটা মাথার ওপর দিয়া কিচিরমিচির করতাছে। তহন হজরত কিশোরকে কইল, শোনো বালক, তোমার মায়ের থেকে তোমারে কেউ নিয়া গেলে, তোমার মায়ের কেমন লাগবে? বালকটি বলল মা কাঁদবে। পরে হজরত কইল, বাচ্চাটার মা-ও কাঁদতেছে, যাও বাচ্চাটা বাসায় রেখে আসো।
এই ছিল আগের গপ্প, আমরা আগে এমন সব গপ্প পড়তাম মিয়া ওয়ান-টুর বইতে। আর এহন কীযে লেখে আগডুম বাগডুম।
বটগাছের তলায় চায়ের দোকানে বসে এসব বলতেছে এক মুরুব্বি, আমি টেবিলের ওপর বসে-বসে শুনলাম। বেশ ভালোই লাগল।
সঙ্গে কয় টাকা আছে কী জানি! লুঙ্গির গোছা খুলে ঝাড়া দিলাম, ১০ টাকার একটা নোট পেলাম, আরেক গোছা খুলে পেলাম সাত টাকা। মোট ১৭ টাকা। যাক হয়ে যাবে।
আমি দোকান থেকে ১৭ টাকার চিড়ামুড়ি কিনলাম, কিনে বাজারের রাস্তায় দাঁড়ালাম। শালিক পাখিগুলো কই? এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখি বাজারের বড় দোকানটার চালে বসে আছে লাইন ধরে। আমি কিছু চিড়ামুড়ি ছিটিয়ে দিলাম, ঝাঁক ধরে সব উড়ে এল।
খাচ্ছে, ওরা চিড়ামুড়ি খাচ্ছে। আজ বাজার গ্রাম ঘুরেঘুরে পাখপাখালিদের চিড়ামুড়ি খাওয়াব। ‘কারও মঙ্গল চাও, শহর-গ্রাম ঘুরে বনের পাখিদের খাদ্য ছিটিয়ে দাও’।
৪.
প্রতি বছর ফাল্গুন মাস এলে, আমার কেমন জানি শূন্য-শূন্য লাগে। কী জানি নাই-নাই লাগে। এমন শূন্যতা বিরাজ করে জ্যৈষ্ঠ মাস অবধি। এখন চৈত্র মাস, পুকুর-খাল শুকিয়ে গেছে। ‘জলাশয়ের বুকই যেখানে ফেটে হাঁ করে থাকে, সেখানে জল পাবে কী করে’!
মিষ্টির দোকান থেকে, ছোট ছোট কয়টা মাটির খোরা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছি চৈত্রের ফাটা মাঠের ধুলা উড়িয়ে। একগুচ্ছ পাটও এনেছি সঙ্গে দুইটা খোরা ঝুলাব বাড়িতে, আর দুইটা ভিটায়। এই গরমে কত পাখি না জানি তৃষ্ণায় কাতরাচ্ছে, কত পাখির না জানি জিভ বেরিয়ে যাচ্ছে।
বাড়িতে এসে মাকে ডাকলাম, ও মা, মা....
- কীরে?
- মা পাট আনছি, আমারে কয়টা শিকা বানিয়ে দাও।
- শিকা দিয়া কী করবি?
- এই খোরাগুলা ঘরের কোনায় ঝুলাইমু পানি দিয়া।
- পানি ক্যান দিবি?
- দেহ না কী গরম পড়ছে, পুকুর-খাল শুকাইয়া গেছে, পাখিরা পানি খাইতে পারে না।
মা ছ্যাত করে উঠল, আর বলতে লাগল-
- এমন কইরা আর কতদিন? তোর লগের সবাই কি সুন্দর সংসারী হইছে। আর তুই এইগুলা কী করছ? বুঝবি, যেদিন আমি থাকমু না সেই দিন বুঝবি।
মা আরও কত কী বলে শিকা বানাতে বসল। আমি মায়ের পাশে বসে খোরাগুলো পানিতে ভিজাচ্ছি। মা বিরক্ত হলেও আমার কোনো কিছুতে না করে না।
৫.
এক ঘটি পানি আগে চালে ছিটিয়ে দিলাম, যাতে পাখিরা বুঝতে পারে এখানে পানি আছে। মা মইটা ধরে রেখেছে, আমি মইয়ের ওপর দাঁড়িয়ে খোরা ঝুলিয়ে দিলাম শিকায় বেঁধে। পানি ঢেলে খোরাটা ভরে দিয়ে নেমে এলাম।
একটু পরে সত্যিই একটি পাখি এল, পাখিটি পানি খাচ্ছে। আমি মায়ের দিকে তাকালাম, মা-ও আমার দিকে তাকাল। মা হাসতে হাসতে আঁচল দিয়ে আমার মুখের ঘাম মুছে দিল। আমি মাকে জড়িয়ে ধরলাম। উঠানজুড়ে কেমন যেন গরম হাওয়া ঘুরতে লাগল, তবু একটা প্রশান্তি লাগছে মনে। ‘মানুষ-মানুষের থেকে উড়ে যায়, বনের পাখিরা না’।
বিলাশপুর, জাজিরা
শরীয়তপুর
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)