অমর একুশে বইমেলার ছয় দিন পার হয়ে গেলেও নেই তেমন পাঠক-দর্শনার্থীর উপস্থিতি। নেই আশানুরূপ বিক্রি। যেখানে দৈনিক কয়েক লাখ টাকার বই বিক্রি হতো, সেখানে কয়েক হাজার টাকার বই বিক্রি করতে বেশ হিমশিম খেতে হতে হচ্ছে প্রকাশকদের। প্রকাশক-বিক্রয়কর্মীরা বলছেন, রমজানের কারণে পাঠক-দর্শনার্থীর আনাগোনা কম। ফলে বিক্রি নেই বললেই চলে। এমন চিত্র মেলার শেষ দিন পর্যন্ত চলবে- এরকম মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন তারা।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ষষ্ঠ দিনের বইমেলা বেলা ২টায় শুরু হয়ে চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। এদিন মেলার শুরুতে সেভাবে দর্শক-পাঠকের উপস্থিতি লক্ষ করা না গেলেও বিকেলে কিছু পাঠক-দর্শনার্থীর দেখা মেলে। পরে সেই উপস্থিতি ইফতারের আগে আবার ক্ষীণ হয়ে আসে। সন্ধ্যার পর উপস্থিতি কিছু সময়ের জন্য বাড়লেও আবার কমে যায়। পাঠক-দর্শনার্থীর ঢিলেঢালা উপস্থিতির মধ্যে বই বিক্রি নিয়ে পুঁথিনিলয় প্রকাশনীর তামান্না মৃধা হতাশা প্রকাশ করলেন। দুই বছর ধরে বইমেলায় খণ্ডকালীন বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করে আসছেন তামান্না। তিনি জানান, অন্য সময়ে বই বিক্রির কারণে দম ফেলার সময় পাওয়া যেত না, সেখানে এখন বসে অলস সময় পার করতে হচ্ছে।
মন খারাপের কারণ উল্লেখ করে তামান্না মৃধা খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিক্রি একেবারেই নেই। অন্যবার যেখানে লাখ টাকার ওপরে বিক্রি হতো, সেখানে এখন মাত্র কয়েক হাজার টাকার বই বিক্রি হয়।’
বিক্রি কম হলেও হতাশ নয় আরেক বিক্রয়কর্মী সাকিবুল হাসান। মেলায় প্রথমবারের মতো কাজ করছেন সাকিবুল। তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যায় ইফতারের পর বিক্রি কিছুটা বাড়লেও অল্প সময়ের মধ্যে সেটি হারিয়ে যায়। সারা বিকেল-সন্ধ্যাজুড়ে বই বিক্রি কম। আমরা তবু আশাবাদী, হয়তো শেষের কয়েকটা দিন বিক্রি বাড়বে।’
কর্মদিবস হওয়ায় বিক্রি খুব কম, তবে গত শুক্র-শনিবার ছুটির দিনে ভালো বিক্রি হয়েছে বাতিঘরে। বাতিঘরের সহ-ব্যবস্থাপক সঞ্জয় সূত্রধর খবরের কাগজকে বলেন, ‘শুক্র-শনি আমাদের ভালো বিক্রি হয়েছে। সবমিলিয়ে খারাপ যাচ্ছে না একেবারে, যেহেতু রমজান মাস তাই উপস্থিতিও কম। তারপরেও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
বিক্রি আশানুরূপ নয় উল্লেখ করে পাঠক সমাবেশের বিক্রয়প্রধান ও ক্যাশের ইনচার্জ শামীম হোসাইন বলেন, ‘আশানুরূপ বিক্রি নেই। এবার বেশি আশাও করছি না। সামনে ঈদের কারণে বিক্রি আরও কমে যাবে। তবে সবাই বইমেলায় যদি একটু উদযাপনের জন্য আসে, তাহলে হয়ত এই বিক্রি কিছুটা বাড়বে। তারপরও মেলা হচ্ছে, এ-ই অনেক।’
অন্যবারের মেলায় বেশ ব্যস্ত সময় পার করতেন পাঞ্জেরী প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী সোলায়ান আহমেদ। বিগত মেলাগুলোতে বেশ প্রতিযোগিতার সঙ্গে অন্য বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বই বিক্রি করতেন। এবার সেই প্রতিযোগিতা নেই। সোলায়মান খবরের কাগজকে বলেন, ‘অন্যবার মেলাগুলোতে প্যাভিলিয়ন থাকত, প্যাভিলিয়নে কয়েকটা ক্যাশ কাউন্টার থাকত, এবার সেই প্রতিযোগিতা নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রথম সারির প্রকাশনীর এক প্রকাশক বললেন, ‘আমরা অনেক আগেই বলেছিলাম ঈদের পর বইমেলা হোক, কিন্তু কেন আমাদের ক্ষতি করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো এটা বোধগম্য নয়। আমাদের বই আছে, বিক্রি অন্যদের তুলনায় ভালো; তবু করোনার সময় বইমেলা আরও ভালো হয়েছিল। সামনে ঈদ, এখন মানুষ কাপড়-চোপড় না কিনে কেন বই কিনবে। বইমেলা আবার কয়েক দফা পেছানো হলো। এভাবে তো হয় না, এটি মানসিক অশান্তি। আজকাল তো মানুষ এমনিতেই বই পড়ে না, তারপরেও মেলা হচ্ছে। দেখা যাক, সামনে কী হয়। তবে আমার মনে হয় এখন যা বিক্রি হচ্ছে, আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে তাতে আরও ধস নামবে। এখন যে লোক আসছে, ১০ তারিখের পর তা একেবারেই থাকবে না।’
তবে রোজার মধ্যেও নানা জল্পনা-কল্পনার শেষে বইমেলা যে হচ্ছে তাতে সন্তুষ্ট নবীন লেখক এ কে এম সুলতান মাহমুদ। এবারের মেলায় অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে তার প্রথম বই মুখ ও মুখোশ বেরিয়েছে। সুলতান মাহমুদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘এত কিছুর পরও যে বইমেলা হচ্ছে, এটিই অনেক। আমি আশাবাদী যারা প্রকৃত অর্থে বইপ্রেমী তারা মেলায় আসবেন বই কিনবেন।’
গতকাল পর্যন্ত মেলায় নতুন বই এসেছে ২০১টি। ষষ্ঠ দিনে এসেছে ৬৫টি বই। এর মধ্যে গল্পের বই ছিল ৫টি, উপন্যাস ১৪টি, প্রবন্ধ ৩টি, কবিতা ১৯টি, গবেষণা ৩টি, শিশুসাহিত্য ৩টি, জীবনী ৩টি, মুক্তিযুদ্ধ ১টি, নাটক ১টি, ভ্রমণ ২টি, রাজনীতি ২টি, অনুবাদ ২টি ও অন্যান্য ৭টি।
আজ বুধবার মেলার সপ্তম দিন। মেলা শুরু হবে বেলা ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণ: সন্জীদা খাতুন শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মফিদুল হক। আলোচনায় অংশ নেবেন মোহাম্মদ আজম। সভাপতিত্ব করবেন ভীষ্মদেব চৌধুরী। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।