চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সলিমপুর জঙ্গলে সন্ত্রাসীদের দাপট, অনুমতি ছাড়া প্রশাসনকেও ঢুকতে দেওয়া হয় না।
সলিমপুরে দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে এবার হামলায় র্যাব-৭-এর অধীনে অভিযানে থাকা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর (বিজিবি) নায়েব সুবেদার আব্দুল মোতালেব নিহত হন।
এর আগেও পাল্টাপাল্টি বেশ কিছু খুনের ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগের পতনের পর এবার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া বিএনপির সমর্থকরা।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযানে গিয়ে র্যাব সদস্যরা হামলার শিকার হন। এ সময় তাদেরকে মাইকে ঘোষণা করে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। হামলায় অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০ জন অংশ নিয়েছিলেন বলে জানায় র্যাব। এ সময় র্যাব সদস্যদের জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয় বিএনপি অফিসে। সেখানে তাদেরকে এলোপাতাড়ি কোপে র্যাব সদস্য মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত তিন র্যাব সদস্য। বিএনপির অফিস উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা ঘটে। তবে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান চালায় র্যাব-৭।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার (ওসি) তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর জানান, এ ঘটনায় কেউ গ্রেপ্তার হয়নি এবং এখনো মামলা হয়নি।
ঘটনার পর পুলিশের কাছে পাওয়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, র্যাবের দুটি মাইক্রোবাস (হাইয়েস) সলিমপুরে যাওয়ার পর লাঠিসোঁটা নিয়ে কিছু ব্যক্তি ধাওয়া দিচ্ছেন। একপর্যায়ে মাইক্রোবাস দুটির কাঁচ ভাঙচুর করা হয়। হামলার সময় মাইকে এলাকার ফটক আটকানোর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছিল।
আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষে আহত কয়েকজন র্যাব সদস্য বসে আছেন। তাদের মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যান্ডেজ দেখা যাচ্ছে। কক্ষের মেঝে রক্তে লাল। পুলিশ সদস্যরা আহত র্যাব সদস্যদের গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন।
র্যাব-৭, চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এ আর এম মোজাফফর হোসেন সোমবার রাতে জানান, সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় ৪৩ জন র্যাব সদস্য অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযানে গিয়েছিলেন। এলাকায় র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ দুষ্কৃতী র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াসহ চারজন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। তাদের পুলিশের সহযোগিতায় উদ্ধার করে চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) পাঠানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মোতালেব হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন।
চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে জঙ্গল সলিমপুরে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনো পাহাড় কেটে চলছে প্লট-বাণিজ্য। আর এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলেছে ভূমিদস্যুরা। এলাকায় সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে এই সন্ত্রাসীরা।
এ আর এম মোজাফফর হোসেন বলেন, ‘আহত তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ হামলার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে জড়িতদের শনাক্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
জঙ্গল সলিমপুর দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় কয়েক দশক ধরে এটি সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা। গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনীতির পটপরিবর্তনের পর এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ ও খুনাখুনির ঘটনা ঘটে চলেছে। সম্প্রতি এলাকায় দখল-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হয়। এতে একজন নিহত হন। পরদিন প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন।
আহত তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ হামলার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে জড়িতদের শনাক্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এলাকায় বাসিন্দাদের প্রবেশের জন্য পরিচয়পত্র লাগে। বাসিন্দা ছাড়া বাইরের কেউ ঢুকতে পারেন না। এমনকি পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের লোকজনও প্রবেশ করতে গিয়ে অনেকবার হামলার শিকার হয়েছেন।
২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল বড়ইতলা ২ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক, সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। এ সময় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর ককটেল ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশও গুলি ছোড়ে।
এর আগে ২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি র্যাবের সঙ্গে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলি ঘটে। একই বছরের ২ আগস্ট অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে জেলা প্রশাসনের লোকজনকে বাধা দেওয়া হয়। ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আলীনগরে অবৈধ বসতি ভাঙতে গেলে সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়।
>>সীতাকুণ্ডে সন্ত্রাসীদের গুলিতে র্যাব কর্মকর্তা নিহত, আহত ৩
মুসলেহ/রিফাত/