জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে শর্ত সাপেক্ষে মায়ানমারের বেসামরিক লোকজনের জন্য করিডর দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের শুরুর দিকে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করেছিল জাতিসংঘ। এ জন্য গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে বাংলাদেশের কাছে জাতিসংঘ করিডর দেওয়ার অনুরোধ করে। সেই প্রেক্ষাপটে গত রবিবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন রাখাইনে করিডর দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানান। মানবিক বিষয়ের নামে করিডর সুবিধা দিতে গিয়ে নতুন কোনো সমস্যা সৃষ্টি হয় কি না, সে ব্যাপারে সতর্কতামূলক পরামর্শ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
রাজনীতিকরা মনে করেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা। করিডর ইস্যুতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ে জনসংযোগকালে এ কথাই বলেছেন। মানুষের পাশে দাঁড়াতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে বিষয়টি অবশ্যই জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। আরেকটি গাজার মতো পরিস্থিতি তারা চান না। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, রাখাইনের জন্য মানবিক করিডরের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। এ বিষয়টি জাতির সামনে স্পষ্ট করা দরকার। কারণ এর সঙ্গে অনেক নিরাপত্তার বিষয় জড়িত থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার মানবিক সহায়তার কথা বলে যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছিল, সেটিই এখন দেশের জন্য সবচেয়ে বড় গলার কাঁটা হয়ে আছে। তার মাঝে আবারও ‘মানবিক করিডরের’ সুযোগ দিয়ে যদি নতুন সংকট তৈরি হয়, সেটা দেশের জন্য আরও বড় ক্ষতি হবে। তাই শর্ত সাপেক্ষে মানবিক করিডরের বিষয়গুলো জনগণের সামনে স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বিবিসিকে বলেন, প্রস্তাবিত মানবিক করিডরের ব্যবস্থাপনা জাতিসংঘের হাতে থাকলেও এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতেই থাকতে হবে। যাতে প্রয়োজনে বাংলাদেশ নিজেই তা বন্ধ করে দিতে পারে। অন্যথায় অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে যেতে পারে। তবে সরকার নীতিগতভাবে রাজি হয়ে ভালো করেছে, কারণ যে করিডর দিয়ে সহায়তা যাবে, সেই একই করিডর দিয়ে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠিয়ে তাদের জন্য সেখানেই মানবিক সহায়তার কথা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলতে পারবে।
শর্ত সাপেক্ষে মানবিক করিডর নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, শর্ত সাপেক্ষে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। কী সেই শর্তগুলো, সেটা সবার সামনে উন্মুক্ত হওয়া প্রয়োজন। মায়ানমারের রাখাইন কোনো সাধারণ এলাকা নয়। এখানে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা রয়েছে। পাশাপাশি রাখাইনে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ-সংঘাত চলছে, এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সেখানে যুক্ত হওয়াটা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।
রাখাইনে মানবিক করিডর বিষয়টির উদ্দেশ্য ও শর্তগুলো পরিষ্কার হওয়া দরকার। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোই এখন মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। বিশেষ করে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এমন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এ করিডর সুবিধা দিতে গিয়ে রোহিঙ্গা সংকট ও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাসংকট যাতে দীর্ঘস্থায়ী না হয়, সেদিকে সতর্ক নজরদারি থাকতে হবে। আশা করছি, অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি আমলে নিয়ে দেশের চলমান রোহিঙ্গা সংকট দূরীকরণে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।