বহু আলোচনা-সমালোচনার পরও প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতা থামেনি। এর ফলে প্রশাসনের অন্দরমহলে তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে বৈষম্য নিরসনের জন্য ছাত্র-জনতা আন্দোলন করল। কিন্তু বৈষম্য রয়েই গেল। অন্তর্বর্তী সরকারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের গোলকধাঁধা থেকে বের হতে পারেনি। বর্তমানে অবসরে যাওয়া ২০ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। প্রশাসনকে গতিশীল করতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষে থেকে বলা হয়েছে। এ প্রসংগে প্রশাসনের বেশ কিছু কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে প্রশাসনে গতিশীলতার পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। নিয়মিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনিয়মিত সচিবদের মানসিক সমন্বয়ের অভাবে এমনটি হচ্ছে বলে তারা মনে করেন। দীর্ঘ সময় প্রশাসনের বাইরে থাকায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এসব সিনিয়র সচিব স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে ‘অ্যাডজাস্ট’ করতে পারছেন না। এ অস্থিরতার মধ্যেই এখন যোগ হয়েছে প্রশাসনের নানা স্তরে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক ট্যাগ দেওয়া। ক্ষমতাপ্রত্যাশী দেশের অন্যতম বড় দুই দলের সমর্থক কর্মকর্তা নিয়োগের চাপাচাপিতে শূন্য পদে নিয়োগ দিতে না পারার ব্যর্থতা, কর্মকর্তাদের যথাসময়ে পদোন্নতি না দিতে পারাও একটা বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থাহীনতা বাড়ছে। এতে প্রশাসনের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড থেমে গেছে। এভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এমন পরিস্থিতিতে চুক্তি কমিয়ে চাকরিরত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল হয়। সেখানেও রদবদলের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার অনেক কর্মকর্তা। কয়েকজন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে বিতর্কিত, অযোগ্য ও দুর্নীতির অভিযোগে শাস্তির মুখোমুখি হওয়া অনেক কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিতে সে সময় সমর্থ হন। এমনিতেই উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে রয়েছে। এরপরও নৈমিত্তিক কাজগুলোও ঠিকমতো হচ্ছে না। তা ছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে কিছু কর্মকর্তার অদৃশ্য দৌরাত্ম্য ও ক্ষমতা প্রদর্শন প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ের পরিবেশকে অস্থির করে রেখেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি সম্প্রতি প্রশাসনের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় নিয়োগকে কেন্দ্র করে বড় দুই রাজনৈতিক দলের রশি টানাটানিতে প্রায় ভেঙে পড়েছে প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড। কর্মকর্তারা জানান, প্রশাসনে সমন্বয়ের অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাব এতটাই কাজ করছে যে, কয়েক মাস আগে ২৪তম ব্যাচের জেলা প্রশাসক পদের কর্মকর্তারা যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেলেও এখনো তাদের উপযুক্ত পদে পদায়ন করতে পারেনি সরকার। সূত্র মতে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বর্তমান ডিসিদের প্রত্যাহার করে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে কয়েকটি জেলা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ওই জেলাগুলোতে ডিসিদের প্রত্যাহার করা নাও হতে পারে।
প্রশাসনকে গতিশীল করতে অন্তর্বর্তী সরকারকে আরও কৌশলী ভূমিকা পালন করতে হবে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের পুনরায় নিয়োগ না দিয়ে চাকরিরত অধিকতর দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিতে হবে, তাহলে প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। বিশেষায়িত পদের ক্ষেত্রে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। আশা করছি, সরকার প্রশাসনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।