হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব দেশের স্বাস্থ্য খাতের ভেতরে সৃষ্টি হওয়া গভীর ক্ষত সামনে এনেছে। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে সারা দেশে হাম ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ একাধিক হাসপাতালে শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানীর বাইরের অবস্থা আরও শোচনীয়। আক্রান্ত হচ্ছে শত শত শিশু, বাড়ছে মৃত্যুর হার। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা। আক্রান্তদের ৬৯ শতাংশই এই বয়সসীমার মধ্যে, যার মধ্যে ৩৪ শতাংশ মাত্র ৯ মাসের কম বয়সী। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ পরিস্থিতি শুধু একটি ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নয়, বরং দেশের দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভেতরের ভঙ্গুর কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। টিকাদানব্যবস্থার ফাঁক, হাসপাতালের চাপ, ইমিউনিটি গ্যাপ এবং অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) কাঠামোর ভাঙন, জনবলসংকট- সব মিলিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন এক অনিশ্চিত বাস্তবতার মুখে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সব জেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৬১০ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ৯৭৬ জনের শরীরের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। আইসিইউ সুবিধার অভাবে শিশুদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। মাঠপর্যায়ের তথ্যে মৃত্যুর সংখ্যা ১১৩-এর বেশি। সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি বাতিল করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি চিকিৎসাসেবা চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা ভিন্ন- জনবলসংকট ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে এ উদ্যোগ পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, দ্রুত কার্যকর সংক্রমণ কর্মসূচি না বাড়ালে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। নতুন এলাকাও ঝুঁকির মধ্যে আসতে পারে।
১৯৯৮ সাল থেকে চালু থাকা অপারেশনাল প্ল্যান কাঠামোর মাধ্যমে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং পুষ্টি কর্মসূচি পরিচালিত হতো। কিন্তু বিকল্প কাঠামো ছাড়া এ পরিকল্পনা বাতিল হওয়ায় কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যন্ত সমন্বয় ভেঙে গেছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের এ বিস্ফোরণ শুধু একটি রোগের গল্প নয়, এটি একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। ঠিকাদান ঘাটতি থেকে শুরু করে নীতিগত শূন্যতা- সব মিলিয়ে এটি এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে বিলম্ব মানেই আরও বড় মানবিক বিপর্যয়। গত রবিবার স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, বিগত সরকারের সময় ঠিকাদান কার্যক্রম ‘নিয়মিত’ করা হয়নি। যার কারণে এবার হাম ‘বজ্রপাতের মতো’ হানা দিয়েছে।
এপ্রিলের শুরুতেই দেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ফলে ডেঙ্গু এবং অন্যান্য ভেক্টর-বর্ন রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। এদিকে সারা দেশের সরকারি হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ে সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে জলাতঙ্ক রোগের টিকা এবং অ্যান্টিভেনম সরবরাহ বন্ধ রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। হামের পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগকে এ বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। মাঠপর্যায় ছাড়াও কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ে দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে। টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে। সরকার দীর্ঘ মেয়াদে রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদার এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করবে, এটাই প্রত্যাশা।