অবৈধ ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলা ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে বিদ্যুৎ খরচ অনেক বাড়ছে। রিকশার সংখ্যা রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও গ্রাম পর্যায়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এসব রিকশার অধিকাংশই অননুমোদিত চার্জ করা হয়, যা জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এর ফলে একদিকে বিদ্যুৎ-সংকট আরও প্রকট হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য বলছে, রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যানের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষের কাছেই নেই। অবৈধভাবে এসব বাহন চার্জ করতে গিয়ে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, তারও কোনো হিসাব বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট খাতের কর্মকর্তাদের ধারণা, দেশে ১ কোটির বেশি এমন যান চলাচল করছে, যার বড় অংশই অনিবন্ধিত। যাত্রী কল্যাণ সমিতি থেকে এসব রিকশা নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেওয়া হলেও সরকারের এ বিষয়ে কোনো মনোযোগই নেই বলে জানান যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব। এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের দাপট রাজধানীসহ দেশব্যাপী। অধিকাংশ ইজিবাইক রাতে আবাসিক লাইনে চার্জ দেওয়া হয়, যা বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে, প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে অন্তত ৭০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে শুধু ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জিংয়ের জন্য। এসব চার্জিং স্টেশনের অধিকাংশই অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এতে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১ হাজার গ্যারেজে নিয়মিত অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জিং কার্যক্রম চলছে, যার একটি বড় অংশই অবৈধ সংযোগনির্ভর।
পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, দেশে তীব্র বিদ্যুৎ-সংকট চললেও ব্যাটারিচালিত রিকশার বিষয়ে সরকারের কার্যকর কোনো নজরদারি নেই। কোথায় এসব রিকশার যন্ত্র তৈরি হচ্ছে বা কোথায় গ্যারেজ রয়েছে, সেসব বিষয়েও তদারকি করা হচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারের নীতিমালা থাকলেও তার বাস্তবায়ন নেই। নিয়মিত তদারকি ও সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটকে জবাবদিহির আওতায় আনা না গেলে এ খাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। প্রতিদিনই বাড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা, বাড়ছে বিদ্যুৎ চুরি। অথচ জাতীয় সম্পদের এ অপচয় যেন দেখার কেউ নেই।
লাইসেন্সবিহীন ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় যানজট তীব্র হচ্ছে এবং নগরবাসীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশার অবৈধ চার্জের কারণে বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে। চুরি ও অপচয়ের কারণে গ্রাহকরা ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। শহরে লোডশেডিং এখন নিত্যদিনের ঘটনা। কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে। ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যাপারে সরকারের নীতিমালা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় গ্রাম ও শহরাঞ্চলের গ্রাহকদের দর্ভোগ আরও বাড়বে। আশা করছি, সরকার বিদ্যুতের বিপর্যয় মোকাবিলায় অর্থাৎ জাতীয় গ্রিডের অপচয় রোধকল্পে ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যবহারে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।