অন্ধকার নামলেই বদলে যায় সীমান্ত–এই শিরোনামে গতকাল খবরের কাগজে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বদলে যাওয়া যে সীমান্তের কথা বলা হয়েছে, সেটি হচ্ছে শেরপুর-মেঘালয় সীমান্ত। এই সীমান্ত বদলে যায় চোরাচালানিদের তৎপরতায়। দিনের আলোয় শেরপুরের সীমান্তের গ্রামগুলো দেখলে মনে হবে সবই স্বাভাবিক রয়েছে। কাঁচা রাস্তা, সবুজ গাছপালা, উঁচু-নিচু পাহাড়, শান্ত জনপদ। রাতে চোরাচালানিদের স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ও ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বিশাল অংশজুড়ে চোরাচালান হয়। চোরাচালানের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয় ভৌগোলিকভাবে দুর্গম স্থান, পাহাড়ি এলাকা ও নদীপথ। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) এবং সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসারে সিলেট, কুড়িগ্রাম, যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, শেরপুর, পার্বত্য এলাকাসহ বিভিন্ন স্থান দিয়ে চোরাচালান হয়। বর্তমানে সীমান্তের ৭৯ শতাংশ অংশে কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে আর বেড়াবিহীন রয়ে গেছে প্রায় ২১ শতাংশ দুর্গম ভূখণ্ড। সাধারণত বেড়াবিহীন এই এলাকা দিয়েই চোরাচালান হয়। দুর্গম বলেই চোরাচালানিরা এসব এলাকাকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে।
ভারতের মেঘালয় সীমান্তের এপারে শেরপুর জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার অবস্থান। এই তিন উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চল দিয়ে সুসংগঠিতভাবে চলছে চোরাচালান কার্যক্রম। রীতিমতো সিন্ডিকেট গড়ে এটা করা হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে দেশের ভেতরে অবাধে ঢুকছে বিভিন্ন মাদকদ্রব্য, প্রসাধনী, নিষিদ্ধ পণ্য ও বিলাস সামগ্রী। কিন্তু কীভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল ও অভিযানের মধ্যে চোরাচালানিরা সক্রিয় রয়েছে, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, চোরাচালান বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি নানা সামাজিক-রাজনৈতিক অপরাধ এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার জন্য বহুলাংশে দায়ী। চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে যখন মাদক, অস্ত্র ও অবৈধ পণ্য ঢুকে পড়ে, তখন এই সংকট দেখা দেয়। চোরাচালান বন্ধের জন্য সীমান্তে বিজিবির বিশাল বাহিনী সার্বক্ষণিকভাবে গোয়েন্দা নজরদারি ও নিয়মিত টহল দিয়ে থাকে। পুলিশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তারা নিরাপত্তা সুরক্ষা এবং চোরাচালান প্রতিরোধে কাজ করে। গবেষণাতেই বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্তে চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং সেটা করা জরুরি। সেই চেষ্টা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রয়েছে। তবে বিশেষ বিশেষ সময়ে চোরাচালান বেড়ে যায়। গত জাতীয় নির্বাচনের সময় সীমান্তে কঠোর নজরদারি ছিল। দেশে যাতে অস্ত্র ঢুকে না পড়ে, নির্বাচনে অস্থিরতা তৈরি না হয়, সে জন্য সীমান্তে সতর্ক ছিল বিজিবি।
বর্তমানে নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে দেশ শাসিত হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় দেশ এখন অনেকটাই শান্ত। সীমান্ত এলাকায় কড়াকড়ি আরোপেরও তেমন খবর নেই। এ রকম শান্ত স্থিতিশীল অবস্থায় চোরাচালানিরা তৎপর হওয়াকে নিরাপদ মনে করে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ও তৎপরতা সত্ত্বেও তাদের দৃষ্টি চোরাচালানিদের ওপর সেভাবে নিবদ্ধ নেই। মাঝে মাঝে গণমাধ্যমে চোরাচালান হওয়া পণ্য আটকের খবর আসে, কিন্তু তা ততটা উল্লেখযোগ্য নয়। আমরা মনে করি, সময়টা চোরাচালানিদের জন্য অনুকূল কী প্রতিকূল, সেটা বিবেচনায় না নিয়ে সব সময়ের জন্য কঠোর নজরদারি থাকা বাঞ্ছনীয়। শেরপুরের বেলায় সেটা দেখা যাচ্ছে না। অন্যান্য সীমান্ত দিয়েও চোরাচালান হচ্ছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর কথায় তারই ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত ১২ এপ্রিল সিলেটে এক সভায় তিনি সীমান্তে চোরাচালান এবং বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি বন্ধে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিনি মাদক, অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন ও বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার এই নির্দেশ দেন। সরকারের চোরাচালানবিরোধী এই তৎপরতা শেরপুরসহ দেশের অন্যত্রও আরও জোরালো ও দৃশ্যমান থাকুক, আমরা এমনটাই প্রত্যাশা করছি। দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এটা জরুরি।