বাংলাদেশ অবশেষে বহুপ্রতীক্ষিত পরমাণু যুগের শেষ ধাপে প্রবেশ করেছে। গতকাল মঙ্গলবার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম বা জ্বালানি প্রবেশ করানোর মধ্য দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাল বাংলাদেশ। পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩তম দেশ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের লক্ষ্য হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক ধাপে চুল্লিতে ইউরেনিয়াম জ্বালানি বসাতে হয়। এ থেকে তৈরি হয় তাপ। সেই তাপে তৈরি হয় বাষ্প। সেই বাষ্প টারবাইন ঘূর্ণনের মাধ্যমে উৎপাদিত হয় বিদ্যুৎ। গতকাল রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে সেই জ্বালানি লোড করা হয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে এটিই হচ্ছে চূড়ান্ত ধাপ। এরপর কয়েক ধাপের পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ শেষে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বলেছে, এভাবে অগ্রসর হওয়ার পর আগামী আগস্টে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। পুরোপুরি উৎপাদনে সক্ষম হলে এর দুটি ইউনিট থেকে পাওয়া যাবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে পাকিস্তান আমলে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ শুরু হয় ১৯৬১ সালে। কিন্তু কয়েক বছর পরে পাকিস্তান সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। এতে ক্ষুব্ধ ছিলেন বাংলাদেশের মানুষ ও রাজনীতিবিদরা। রূপপুর প্রকল্পকে সেদিক থেকে বলা যায় বাংলাদেশের একটি স্বপ্ন প্রকল্প।
প্রকল্পটিকে এরপর হিমাগার থেকে তুলে আনা হয় স্বাধীন বাংলাদেশে, ১৯৯৫ সালে। বাংলাদেশের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সহযোগিতা চুক্তির মধ্য দিয়ে ২০১১ সালে অর্থবহভাবে প্রকল্পটি আবার যাত্রা শুরু করে। চুক্তিতে যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবলের প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ করার অঙ্গীকার করেছে রাশিয়া। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে আছে দুটি ইউনিট। দুটি ইউনিটেরই কাঠামো তৈরির কাজ প্রায় শেষ। জ্বালানি প্রবেশ করানোর পর দেখা হবে কতটা আন্তর্জাতিক মান বজায় থাকছে। সে প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কাছ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ছাড়পত্র নিতে হবে। অনুমোদন লাগবে দেশের পরমাণু সংস্থার।
আধুনিককালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পাশাপাশি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করাকে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি বলে ধরা হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা হয় পরিবেশবান্ধব জ্বালানি।
রূপপুরে কার্বন নিঃসরণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করবে। এর নির্মাণকাজে যুক্ত প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল। দীর্ঘ মেয়াদে আরও অনেকের কর্মসংস্থান হবে।
রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প দেশের এখন পর্যন্ত গৃহীত সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এ ধরনের বড় প্রকল্পে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। একে ঝুঁকিমুক্ত রাখার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে সার্বক্ষণিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে তেজস্ক্রিয়তার বিষয়টি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত রাখতে হবে।
জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে কম খরচে দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে রূপপুর। দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ থেকে ১২ শতাংশ পূরণ করবে প্রকল্পটি। এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। এক হিসাবে বলা হচ্ছে, রূপপুরের একটি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে বছরে ১০০ কোটি টাকার জ্বালানি আমদানিতে সাশ্রয় ঘটবে। সম্প্রতি আমরা দেখেছি জ্বালানি তেলের সংকট কীভাবে আমাদের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আমাদের উন্নয়নের দূরদর্শী ভাবনা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে। প্রকল্পটি আমাদের জাতিগত সক্ষমতা, আর্থিক সাশ্রয়, যুগের চাহিদা পূরণ এবং দেশের উন্নয়ন ভাবনার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে। আমরা এ প্রকল্পের সার্বিক সাফল্য কামনা করছি।