বহুজাতিক কোম্পানিতে দেশের প্রথম নারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী। প্রতিযোগিতার কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে সাধারণ একজন কর্মকর্তা থেকে আজকে এ অবস্থানে এসেছেন। সাফল্যের অন্তরালে আছে কঠিন পরিশ্রম। কর্মপরিকল্পনায় রয়েছে মেধার স্বাক্ষর। নেতৃত্ব দানের অসাধারণ গুণাবলি রয়েছে রূপালী চৌধুরীর। ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মতো বড় বড় সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে বহুজাতিক কোম্পানি বার্জার পেইন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের। বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির (সিআইপি) স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার। তার শিক্ষাজীবন, কর্মজীবনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের ডেপুটি বিজনেস এডিটর ফারজানা লাবনীর সঙ্গে।
খবরের কাগজ: অনেকে লেখাপড়া শেষ করে সরকারি চাকরিতে যান। আপনি বেসরকারি চাকরি বেছে নেন। আপনার প্রথম প্রতিষ্ঠান কোনটি ছিল?
রূপালী চৌধুরী: পড়াশোনা শেষ করে বন্ধুবান্ধবীদের বেশির ভাগই যখন সরকারি চাকরিতে ঢোকার চেষ্টা করছে, সেই সময়ে আমি খানিকটা স্রোতের বিপরীতে যাত্রা শুরু করি। ১৯৮৪ সালে বহুজাতিক কোম্পানি সিবা গেইগি বাংলাদেশে সাধারণ কর্মী হিসেবে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করি। এরপর ১৯৯০ সালে বার্জার পেইন্টসে যোগ দিয়েছি।
খবরের কাগজ: বার্জার পেইন্টসে যোগ দেওয়ার ঘটনা সম্পর্কে কিছু বলুন।
রূপালী চৌধুরী: বার্জারে যোগ দেওয়ার গল্পটাও শুরু হয় ভিন্নভাবে। মূলত, ১৯৮৯ সালে একসময়ের সহপাঠী আব্দুল হকের সঙ্গে বিয়ে হয় আমার। বিয়ের এক বছর পরেই চট্টগ্রামে বদলি হন আব্দুল হক। আমিও সিদ্ধান্ত নিই চট্টগ্রাম চলে যাওয়ার। এ কারণে রাজধানীতে সিবা গেইগির চাকরি ছেড়ে দিই। আমি চট্টগ্রামে থাকার জন্য একটি চাকরি খুঁজছিলাম। পত্রিকায় বার্জারের একটি পদে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখলাম। আমি আবেদন করার পর প্রতিষ্ঠানটি থেকে বেশ কয়েক দফা সাক্ষাৎকার নিল। পরিকল্পনা ব্যবস্থাপক পদে একটি মেয়ে কাজ করতে পারবে কি না, এটা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দ্বিধায় ছিল। ওই পদে সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করতে হবে, কাস্টমসের সঙ্গে কাজ করতে হবে, বন্দরে যেতে হবে। ওই সময় একটি মেয়ে এসব কাজ করতে পারবে, সেটা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, আস্থা আনতে পারছিলেন না। কয়েক ধাপের সাক্ষাৎকারে উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাই বার্জারে।
খবরের কাগজ: আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন।
রূপালী চৌধুরী: আমার ছাত্রজীবন কিছুটা অন্য রকম। বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করে ডাক্তার হওয়ার কথা বলেছিল পরিবার থেকে। এইচএসসি পাসের পর মেডিকেল কলেজে পরীক্ষা দিয়েও ভর্তির সুযোগ পাইনি। মেডিকেল কলেজে চান্স না পাওয়ায় আরও ভালো জায়গায় ভর্তি হওয়ার কঠিন সংকল্প নিই। মেডিকেলে চান্স না পাওয়াটা আমার পরিবারের জন্য ছিল হৃদয়বিদারক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের রসায়নে স্নাতক করি। পরে আর স্নাতকোত্তরে ভর্তি হই না। ভর্তি হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে (আইবিএ)। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হওয়ায় শুরুতে ব্যবসায় প্রশাসনের অনেক কিছুই দুর্বোধ্য লাগত। তবে পরবর্তী সময়ে চেষ্টা করে সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠি। এমবিএ সম্পন্ন করে যোগ দিই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে। এরপর মেধা ও চেষ্টা দিয়ে পার হই একেকটা ধাপ।
খবরের কাগজ: নারী হিসেবে শিক্ষকতা বা এ জাতীয় কিছু না করে এত চ্যালেঞ্জের কাজে কেন এলেন?
রূপালী চৌধুরী: আমি চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসি। বিভিন্ন বিভাগে কাজ করার পর ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত হই। আমি নারী, এই ভেবে নিজে থেকে কখনো গুটিয়ে রাখিনি। পারব না তা-ও ভাবিনি। কঠিন পরিশ্রম করেছি। পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একই প্রতিষ্ঠানেই আছি বহু বছর ধরে। মার্কেটিং, সেলস, সাপ্লাই চেইন, সিস্টেমসহ বিভিন্ন বিভাগে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। এর মধ্যে ২০০৪ সালে ডিরেক্টর (অপারেশনস) হিসেবে পদোন্নতি পাই। ২০০৮ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। কাজ করতে গিয়ে কখনো হতাশ হইনি, হাল ছাড়িনি। সব সময় পরিশ্রম করেছি। সময়ের কাজ সময়মতো করেছি, কাজ ফেলে রাখিনি। নিজেকে আর পাঁচজন কর্মীর মতো সাধারণ ভেবেছি। ফলে সবাই খুব সহজে গ্রহণ করেছে। এ সবকিছুই আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনকে নিয়মের অঙ্কে বেঁধে এগিয়েছি।
খবরের কাগজ: কাজের বাইরেও আপনি বিভিন্ন স্বীকৃতি ও সম্মাননা পেয়েছেন। এ বিষয়ে কিছু বলেন।
রূপালী চৌধুরী: সফল হিসেবে আমাকে অনেকবার পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সরকারের মর্যাদাপূর্ণ ‘সিআইপি’ স্বীকৃতি। অনেকবার এই স্বীকৃতি পেয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনপ্রিয় সাময়িকীর পাতায় আমার সাক্ষাৎকার ছাপিয়েছে। স্বনামধন্য সাময়িকীতেও আমার ভাবনা তুলে ধরতে পেরে আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করেছি।
খবরের কাগজ: আপনার সফলতার পেছনের শক্তি কী?
রূপালী চৌধুরী: আমার সফলতার পেছনে সততা, কাজের প্রতি একাগ্রতা, প্রতিশ্রুতি এবং কঠোর পরিশ্রমই শক্তি। অনেকেই মনে করেন আমি মেধার বলে সর্বোচ্চ পর্যায়ে এসেছি। কিন্তু মেধা বা ট্যালেন্ট শুধু একটা বিষয়। বাকিটা হলো ইনোভেশন, অনেস্টি, ইন্টেগ্রিটি, কমিটমেন্ট অ্যান্ড হার্ড ওয়ার্কিং।
খবরের কাগজ: বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি ও এখানকার দুর্নীতি নিয়ে কিছু বলুন।
রূপালী চৌধুরী: নিয়ন্ত্রক সংস্থার আশীর্বাদ ছাড়া দুর্নীতি হতে পারে না। যেকোনো কোম্পানির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ঝামেলা থাকলে, তার সনদ বাতিল করতে হবে। আমাদের উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে, যারা দুর্নীতি করে, তাদের কিছু না কিছু শাস্তি পেতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমন হতে হবে, যে দোষ করবে, তাকে শাস্তি দেবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে কোনো কিছু করল না, বলল না- তাহলে তো ওই লোকগুলো আরও বেশি সুযোগ পেয়ে যাবে। পুঁজিবাজারে গতি আনতে হলে আস্থা ফেরাতে হবে। ভালো বিনিয়োগকারী আনতে হবে।
খবরের কাগজ: পুঁজিবাজার গতিশীল করতে হলে কী করা উচিত বলে মনে করেন?
রূপালী চৌধুরী: দেশে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি আছে, যারা এখনো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির অভাব রয়েছে। এ জন্য দেশি-বিদেশি কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসার পথ বা বিনিয়োগ করার পথ আকর্ষণীয় করতে হবে। তালিকাভুক্ত হলে বেশি লাভ ও সুবিধা পাবে, এমন সুযোগ তৈরি করতে হবে। সুবিধা না পেলে কেন কোম্পানিগুলো আইপিওতে আসবে? পুঁজিবাজারের গতিশীলতা বিদেশি বিনিয়োগসহ একাধিক কারণে প্রভাবিত হয়। বছরের পর বছর ধরে অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী চলে যাওয়ায় এর প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়েছে। টাকার দাম কমে যাওয়ায় তাদের মূলধন কমে গেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুনঃবিনিয়োগে উৎসাহিত করা জরুরি। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হলে পুঁজিবাজার থেকে আয় ব্যাংকের সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। আর একটি সমস্যা হলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে চাওয়া মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম।
খবরের কাগজ: দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে কিছু বলুন।
রূপালী চৌধুরী: ডলারের বিপরীতে টাকার দাম স্থিতিশীল হয়েছে। রিজার্ভ স্থিতিশীল হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন। আশা করি, ভবিষ্যতে এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল থাকলে ও ক্রেতাদের আস্থা বাড়লে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব। ব্যবসায়ী নেতারা এখন বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি দেশে মূল্যস্ফীতি ও ঋণের বাড়তি সুদ হারের মধ্যে চলতি বছরটি কীভাবে কাটবে সেদিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। সার্বিক প্রেক্ষাপটে মন্দার ঝড় বয়ে যাওয়া সত্ত্বেও অনেক ব্যবসায়ী নেতা আশা প্রকাশ করে বলছেন যে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করেছে। আমি বিশ্বাস করি অর্থনীতি গতিশীল হলে পুঁজিবাজারেরও গতি আসবে।
খবরের কাগজ: দেশে-বিদেশে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে এবং খানিকটা আর্থিক মন্দা চলছে। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।
রূপালী চৌধুরী: সব প্রতিষ্ঠান মন্দায় পড়েছে তেমনটি নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়লেও খরচ বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা কমেছে। কোনোটির মুনাফা বাড়েনি। মূল্যস্ফীতি এর বড় কারণ। করোনা মহামারির পর পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলো- এসব কারণে পণ্যের দাম বেড়েই চলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টাকার দাম অনেক কমে যাওয়ায় দেশের বাজারে পণ্যের দাম আরও বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমেছে। উৎপাদন খাতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের শুরুর দিকে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা বাড়ানোর পরিকল্পনা স্থগিত করে। এলসি বিধিনিষেধের কারণে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়। ঋণের সুদের বাড়তি খরচের কারণে মুনাফা কমেছে। অনেক কারখানা আমদানি করা কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে। ডলারের বিনিময় হারের অস্থিরতা তাদের ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।
খবরের কাগজ: আগের চেয়ে এলসি খোলার সুযোগ বেড়েছে কি ?
রূপালী চৌধুরী: ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শর্তসাপেক্ষে এলসি খুলতে বাধ্য করা হয়। ফলে টাকার বিনিময় হার ঝুঁকিতে পড়ে। এলসি খোলা ও বিরতির সময়ে সুদের হারের ফারাক আর্থিক সংকট বাড়িয়েছে। এই অর্থনৈতিক পরিবেশ থেকে ব্যাংকিং খাত লাভবান হয়েছে। যখন উৎপাদন ও পরিষেবা খাত হিমশিম খাচ্ছে তখন ব্যাংকগুলো তাদের মুনাফা বাড়াতে পেরেছে। ক্রমবর্ধমান সুদের হারের কারণে ব্যাংকগুলো ঋণের টাকা থেকে বাড়তি অর্থ পেয়েছে। যদিও এটি ব্যবসার জন্য ঋণ নেওয়াকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।
খবরের কাগজ: ব্যবসায় এখন অন্যতম বাধা কী বলে মনে করেন?
রূপালী চৌধুরী: প্রধান বাধা ক্রেতাদের আস্থা কম। অর্থনীতিতে যখন অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, ক্রেতারা তখন খরচ কমিয়ে দেন। এটি বাজারের চাহিদাকে প্রভাবিত করে। নির্মাণ খাতে মন্দার কারণে ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্প অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও আশার আলো দেখছি। অর্থনীতি চাঙা হওয়ার লক্ষণ দেখেছি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি বছরে আমরা আরও স্থিতিশীলতা দেখতে পাব। রেমিট্যান্স বেড়েছে। রপ্তানি দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। যদিও বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানা বন্ধ আছে। ফলে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন।
খবরের কাগজ: অর্থনীতিতে গতি বাড়াতে আপনার পরামর্শ কী?
রূপালী চৌধুরী: কমপ্লায়েন্সের নিয়মনীতি সহজ হলে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে আসবে। তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে করপোরেট করের ব্যবধান কমলেও আইপিওর মাধ্যমে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহ দিতে আরও প্রণোদনা প্রয়োজন। স্বতন্ত্র পরিচালকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। এদের দায়িত্ব অনেক। যোগ্য পেশাদারদের আনতে আকর্ষণীয় পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত। চলতি বছরে সংকট থাকলে সম্ভাবনাও আছে। সুদের হার বেশি থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠান নগদ অর্থের সংকটে পড়ে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে ক্রেতাদের খরচ বাড়াতে হবে। ক্রেতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাজের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ব্যাংকিং খাতের গুরুত্ব আছে। খেলাপি ঋণ এখনো উদ্বেগের বিষয়। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান টাকার জন্য ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি কমাতে সরকার প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনছে। আশা করি এর সুফল আসবে।
খবরের কাগজ: রাজস্ব নীতি কেমন হওয়া উচিত?
রূপালী চৌধুরী: সরকারকে অনুমানযোগ্য রাজস্বনীতি অনুসরণ করতে হবে। কর ও শুল্ক কাঠামোতে হঠাৎ পরিবর্তন অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। কার্যকরভাবে পরিকল্পনা করার জন্য ব্যবসায় অনুমানযোগ্য নীতি প্রয়োজন। স্বয়ংক্রিয় কর ব্যবস্থা দুর্নীতি কমাবে। স্বচ্ছতা বাড়াবে। শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিকে উপকৃত করবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সঠিকভাবে তথ্য সমন্বয় করতে হবে।
খবরের কাগজ: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের ফলে কী প্রভাব পড়বে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে?
রূপালী চৌধুরী: শুল্ক বাড়ানো ঠিক হবে না। এই মুহূর্তে শুল্ক বাড়ানো হলে ব্যবসা-বাণিজ্য চাপ নিতে পারবে না। সরকারের উচিত হবে বাড়তি শুল্কের চাপ থেকে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে রক্ষা করা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এর জন্য বিনিয়োগ আহ্বান করতে হবে।
খবরের কাগজ: দেশে শিল্প বিনিয়োগ আশানুরূপভাবে বাড়ছে না। বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার কাজ করছে। অনেক পদক্ষেপ নিচ্ছে। সম্প্রতি বিনিয়োগ সামিট হয়েছে। বিনিয়োগ সামিট থেকে বাংলাদেশ কতটা সুফল পাবে বলে মনে করেন?
রূপালী চৌধুরী: এবারের বিনিয়োগ সামিট আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং হয়েছে। অনেক দেশের বিনিয়োগকারীরা অংশ নিয়েছেন। কারখানা গড়ে তোলার জায়গা সরেজমিনে গিয়ে দেখানো হয়েছে। তবে এসব সুফল পেতে হলে বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে। এসব সমস্যার সমাধান করা হলে বিনিয়োগকারীরা সহজভাবে বিনিয়োগ করতে পারবেন। দেশি বিনিয়োগকারীদেরও বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে হবে। মনে রাখতে হবে দেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেশি উৎসাহিত হয়।
খবরের কাগজ: দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে আপনার সুপারিশ কী?
রূপালী চৌধুরী: সরকারের বিভিন্ন সংস্থার বা প্রতিষ্ঠানের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। বিশেষভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিনিয়োগ বোর্ড এবং এনবিআরের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাজে গতিশীলতা ব্যাহত হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সুষ্ঠুভাবে কাজ করা কঠিন পড়ে। শিল্পসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে এসব সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাহলে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোও স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে পারবে।
খবরের কাগজ: বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আরও কোন কোন বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে?
রূপালী চৌধুরী: বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সরকারকে অবশ্যই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসা সহায়কনীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি চাঙা হওয়ার ইতিহাস আছে। আমরা সম্ভাবনায় বিশ্বাস করি। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইতিবাচক উদ্যোগ হবে এ আশা করছি। কোরিয়ান ইপিজেডকে ঘিরে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান করতে হবে। সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আনতে কাজ করছে। উন্নত প্রযুক্তি আনবে। কাজের সুযোগ তৈরি হবে।
খবরের কাগজ: বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডে যোগ দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নে আপনি কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
রূপালী চৌধুরী: ৯০ এর দশকে উন্নত দেশগুলোর শিল্প-কারখানা অফিস আদালতে উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়ার আমূল বদলে যেতে থাকে। সারা পৃথিবীতে যন্ত্র ব্যবহারে সে সময় একটা বিপ্লব ঘটছে। অথচ বার্জার পেইন্টসে তখনো কাজ চলত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিই, প্রতিযোগিতায় অন্যান্য সমজাতীয় প্রতিষ্ঠান থেকে সবার প্রথমে থাকতে হলে অল্প সময়ে বেশি কাজ করতে হবে। তাই প্রযুক্তিনির্ভরতার কোনো বিকল্প নেই। কোম্পানির বিভিন্ন বৈঠকে সহকর্মীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি। ধাপে ধাপে এগিয়ে যাই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের দিকে।
খবরের কাগজ: আপনার অভিজ্ঞতা কীভাবে বার্জার পেইন্টসের উন্নয়নে কাজে লাগিয়েছেন?
রূপালী চৌধুরী: প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন শাখায় কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এতে কাজের অভিজ্ঞতা বেড়েছে। ‘বেতনের বিনিময়ে কাজ করি’ বিষয়টি এমন আর থাকে না। ভালোবাসা জড়িয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে। অনেক আপন মনে হয় বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটিকে। সেই শুরু থেকেই দিনরাত ভেবেছি কীভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও একটু সামনে এগিয়ে নেওয়া যায়। ১৯৫০ সালে বিশ্ব বাজারে বার্জার পেইন্টসের জন্ম হলেও বাংলাদেশে এ প্রতিষ্ঠানটি আত্মপ্রকাশ করে ১৯৭০ সালে। জামানির লুইস বার্জার এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে তার ছেলেরা তা গতিশীল রাখেন। পৃথিবীর অনেক দেশে বার্জার পেইন্টসের শাখা রয়েছে।
খবরের কাগজ: প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক বাজারে, একই সঙ্গে দেশের বাজারেও অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এর পেছনের কথাগুলো বলেন।
রূপালী চৌধুরী: ‘বার্জার মানে নতুন কিছু, বার্জার মানের স্বপ্নের মতো কিছু’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন একটি ধারণা তৈরি করতে চেয়েছি ভোক্তার কাছে। আমদানি করা কাঁচা মালের ওপর নির্ভরশীল পেইন্টের উৎপাদন। এ নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে প্রতিষ্ঠানের কারখানায় কাঁচামাল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। ইমালসন, রেজিন এখানেই তৈরি সম্ভব হচ্ছে। এমনকি পেইন্টে ব্যবহৃত ক্যানটিও আমাদের কারখানায় প্রস্তুত করা হয়। আরও নতুন আবিষ্কারের চেষ্টায় আছেন বার্জারের গবেষকরা। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পেইন্ট তৈরি করা হয়। তাই গবেষণার ওপর জোর দিয়েছি সবচেয়ে বেশি। এ খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ থাকে প্রতিষ্ঠানটির বাজেটে। কম দামে উন্নতমানের পণ্য সরবরাহের চেষ্টা করা হয় আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে। কারণ ব্যবসা এক দিনের জন্য নয়। বাজারে যেকোনো পণ্যের ‘গুড উইল’ তৈরিতে পার হয় দীর্ঘদিন, খরচ হয় বহু মেধার, দিতে হয় অনেক শ্রম। তাই নিম্নমানের পণ্য দিয়ে ভোক্তাকে প্রতারিত করা মানে পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা নষ্ট করা।
খবরের কাগজ: সাধারণ মানুষের হাতে বার্জারের পেইন্টস পৌঁছে দিতে কী করছেন?
রূপালী চৌধুরী: ক্রেতার পছন্দ বিবেচনায় রেখে বার্জার থেকে বিভিন্ন ধরনের পেইন্ট সরবরাহ করা হয়। সারা দেশেই এসব বিক্রি করা হয়। ভোক্তার চাহিদা বাড়ছে। স্থানীয় বাজারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারও আমাদের লক্ষ্য। সারা বিশ্বেই আজ রঙের চাহিদা বেড়েই চলেছে। এ চাহিদাকে কাজ লাগাতে চাই।
খবরের কাগজ: দেশে রঙের বাজার সম্পর্কে কিছু বলুন।
রূপালী চৌধুরী: এ দেশে চাহিদার তুলনায় রং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক কম। অনেক উদ্যোক্তা আছেন যারা এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী। কিন্তু জ্বালানি সংকট ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। শিল্প খাতে সমৃদ্ধি আনতে প্রয়োজন সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ। জেনারেটর দিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। ছোট-বড় ইমারত, শিল্প-কারখানা, ঘরের দেয়ালসহ ইট-বালু-সুরকির যেকোনো কাঠামো দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে রঙের ব্যবহার বাধ্যতামূলক। রংকে আমাদের দেশে বিলাসজাত পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ আধুনিক দেশগুলোতে রং অতি জরুরি পণ্যের তালিকায় আছে। আমাদের দেশের অনেক মানুষই জানেন না রং ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কতখানি। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। সম্মিলিতভাবে রঙের বাজার সম্প্রসারণে কাজ করতে হবে।
খবরের কাগজ: চলার পথে বাধা পেলে কী করেছেন?
রূপালী চৌধুরী: চলার পথ কখনো মসৃণ হয় না। কেউ কাউকে দয়া করে এতটুকু জায়গা ছেড়ে দেয় না। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি হতে হলে কর্মরত প্রতিষ্ঠানের সব বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে, নেতৃত্ব দানের মতো গুণাবলি অর্জন করতে হবে এবং সহকর্মীদের প্রতি থাকতে হবে শ্রদ্ধাবোধ। সহকর্মীদের কাছ থেকে মেয়ে হিসেবে অসহযোগিতা বা দয়া পাওয়ার সুযোগ না দিলে সমস্যা তৈরি হয় না কর্মক্ষেত্রে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হতে হলে মেধার স্বাক্ষর রাখতে হয় প্রতি মুহূর্তে। এখানে সিদ্ধান্ত কে দিচ্ছে, মেয়ে না ছেলে তা নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ থাকে কম। কাজ জানার বিকল্প কিছু নেই।
খবরের কাগজ: আপনি কর্মজীবী নারীর পাশাপাশি একজন মা। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।
রূপালী চৌধুরী: একটি নারীকে বাড়তি কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়। একজন নারী কখনো একজন কর্মকর্তা, একজন মা ও স্ত্রী। তাকে স্বামীর ও বাবার বাড়ির লোকজনের প্রতি যত্নশীল হতে হয়। এখানে স্বামী বা পরিবারের সহযোগিতা ছাড়া কোনো নারীর পক্ষে কাজ করা সম্ভব হয় না।
খবরের কাগজ: আপনাকে সবাই সফল নারী বলেন। এ বিষয়ে বক্তব্য কী?
রূপালী চৌধুরী: আমার সাফল্যটাই সবাই দেখছে, এর পেছনে যে কঠিন পরিশ্রম ও অধ্যবসায় আছে অনেকে তা জানেন না।
খবরের কাগজ: আপনার কয় সন্তান?
রূপালী চৌধুরী: মেয়ে পূর্ণা ও ছেলে রাহুল। তারা দুজনই বিদেশে পড়ালেখা করেছে। মায়ের আজকের এই অবস্থানে তারা গর্বিত।
খবরের কাগজ: আপনার স্বামীর কতটা সহযোগিতা পেয়েছেন?
রূপালী চৌধুরী: কর্মজীবনের সাফল্যের জন্য আমার স্বামীর অনেক অবদান। আমি এজন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনিও বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্তাব্যক্তি। তিনি ব্যক্তিজীবনে থেকেছেন বন্ধুর মতো। আমার কোনো কাজেই আপত্তি করেননি।
খবরের কাগজ: সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন আপনার?
রূপালী চৌধুরী: আমার সহকর্মীদের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ আছে। তাদের নিজের পরিবারের সদস্য মনে করি। মনে করি বার্জার পেইন্টস আমার আরেকটা পরিবার।
খবরের কাগজ: আপনাকে ধন্যবাদ।
রূপালী চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ।