ঢাকা ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ছয় লাখ শিক্ষক-কর্মচারী ঈদের আগে বেতন না পাওয়ায় সংসদে ক্ষোভ চীন-মঙ্গোলিয়া যৌথ মহড়ায় নজর কাড়লো রোবটিক উলফ চকরিয়ায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশুসহ নিহত ২ জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় নীতিমালা আধুনিকায়ন করছে সরকার: ত্রাণমন্ত্রী দেশে প্রতিবছর অপচয় হয় ৩৫ লাখ টন খাদ্য: প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী গৃহকর্মী রোবট! দেশের সম্মান রক্ষায় জীবন বাজি রাখছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রামিসার মৃত্যু, অপরাধীর শাস্তি এবং সমাজের দায় বিশ্বকাপের উন্মাদনা এবার রঙ বাংলাদেশে নাচোলে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে মৎস্য সমবায় সমিতির নিবন্ধন জাতিসংঘ: উন্নয়ন অংশীদার নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নদী-খাল কিছু নেই তবুও নির্মাণ হচ্ছে ব্রিজ শাহরাস্তিতে সরকারি গাছ কেটে নিলেন পৌর বিএনপির নেতা বানিয়াচংয়ে দুই ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ, আহত ৫০ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কবর খুঁড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃত্যু ২ প্রাকৃতিক ভূগোল অধ্যায়ের ১৩টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, এইচএসসির ভূগোল ১ম পত্র নর্ডিক দেশসমূহ: প্রকৃতি, সমৃদ্ধি ও মানবিক উন্নয়নের অনন্য দৃষ্টান্ত জনবল নেবে ব্যাংক এশিয়া টুঙ্গিপাড়ায় বিদ্যালয়ের ফ্যান, জানালা, বই-খাতা বিক্রির অভিযোগ শাবনূরকে নিয়ে যা বললেন পূর্ণিমা হাম-উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ শিশুর মৃত্যু নওগাঁয় পানিতে ডুবে ১৩ মাসের শিশুর মৃত্যু টুঙ্গিপাড়ায় এইচএসসি পরীক্ষাকেন্দ্র পরিবর্তনের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ পুশইন বন্ধে ভারতকে ১০-১২টি চিঠি দিয়েছে সরকার: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসএসসি-সমমান পরীক্ষার ফলাফলের তারিখ ঘোষণা সিলেটে হাম উপসর্গে আরও ১ শিশুর মৃত্যু ভাঙ্গায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যুবকের মৃত্যু সরিষাবাড়ীতে চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃত্যু সিরাজউদ্দৌলা নাটকের ৪টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, এইচএসসির বাংলা ১ম পত্র প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণের চেষ্টা, এলাকাবাসীর তৎপরতায় রক্ষা
Nagad desktop

সাক্ষাৎকারে রূপালী চৌধুরী সংগ্রাম ছাড়া সফলতা আসে না

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৫, ০৮:৪৮ এএম
আপডেট: ১১ মে ২০২৫, ০৮:৫১ এএম
সংগ্রাম ছাড়া সফলতা আসে না
দেশের প্রথম নারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী

বহুজাতিক কোম্পানিতে দেশের প্রথম নারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী। প্রতিযোগিতার কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে সাধারণ একজন কর্মকর্তা থেকে আজকে এ অবস্থানে এসেছেন। সাফল্যের অন্তরালে আছে কঠিন পরিশ্রম। কর্মপরিকল্পনায় রয়েছে মেধার স্বাক্ষর। নেতৃত্ব দানের অসাধারণ গুণাবলি রয়েছে রূপালী চৌধুরীর। ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মতো বড় বড় সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে বহুজাতিক কোম্পানি বার্জার পেইন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের। বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির (সিআইপি) স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার। তার শিক্ষাজীবন, কর্মজীবনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের ডেপুটি বিজনেস এডিটর ফারজানা লাবনীর সঙ্গে। 

খবরের কাগজ: অনেকে লেখাপড়া শেষ করে সরকারি চাকরিতে যান। আপনি বেসরকারি চাকরি বেছে নেন। আপনার প্রথম প্রতিষ্ঠান কোনটি ছিল?

রূপালী চৌধুরী: পড়াশোনা শেষ করে বন্ধুবান্ধবীদের বেশির ভাগই যখন সরকারি চাকরিতে ঢোকার চেষ্টা করছে, সেই সময়ে আমি খানিকটা স্রোতের বিপরীতে যাত্রা শুরু করি। ১৯৮৪ সালে বহুজাতিক কোম্পানি সিবা গেইগি বাংলাদেশে সাধারণ কর্মী হিসেবে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করি। এরপর ১৯৯০ সালে বার্জার পেইন্টসে যোগ দিয়েছি।

খবরের কাগজ: বার্জার পেইন্টসে যোগ দেওয়ার ঘটনা সম্পর্কে কিছু বলুন। 

রূপালী চৌধুরী: বার্জারে যোগ দেওয়ার গল্পটাও শুরু হয় ভিন্নভাবে। মূলত, ১৯৮৯ সালে একসময়ের সহপাঠী আব্দুল হকের সঙ্গে বিয়ে হয় আমার। বিয়ের এক বছর পরেই চট্টগ্রামে বদলি হন আব্দুল হক। আমিও সিদ্ধান্ত নিই চট্টগ্রাম চলে যাওয়ার। এ কারণে রাজধানীতে সিবা গেইগির চাকরি ছেড়ে দিই। আমি চট্টগ্রামে থাকার জন্য একটি চাকরি খুঁজছিলাম। পত্রিকায় বার্জারের একটি পদে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখলাম। আমি আবেদন করার পর প্রতিষ্ঠানটি থেকে বেশ কয়েক দফা সাক্ষাৎকার নিল। পরিকল্পনা ব্যবস্থাপক পদে একটি মেয়ে কাজ করতে পারবে কি না, এটা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দ্বিধায় ছিল। ওই পদে সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করতে হবে, কাস্টমসের সঙ্গে কাজ করতে হবে, বন্দরে যেতে হবে। ওই সময় একটি মেয়ে এসব কাজ করতে পারবে, সেটা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, আস্থা আনতে পারছিলেন না। কয়েক ধাপের সাক্ষাৎকারে উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাই বার্জারে।

খবরের কাগজ: আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন।

রূপালী চৌধুরী: আমার ছাত্রজীবন কিছুটা অন্য রকম। বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করে ডাক্তার হওয়ার কথা বলেছিল পরিবার থেকে। এইচএসসি পাসের পর মেডিকেল কলেজে পরীক্ষা দিয়েও ভর্তির সুযোগ পাইনি। মেডিকেল কলেজে চান্স না পাওয়ায় আরও ভালো জায়গায় ভর্তি হওয়ার কঠিন সংকল্প নিই। মেডিকেলে চান্স না পাওয়াটা আমার পরিবারের জন্য ছিল হৃদয়বিদারক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের রসায়নে স্নাতক করি। পরে আর স্নাতকোত্তরে ভর্তি হই না। ভর্তি হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে (আইবিএ)। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হওয়ায় শুরুতে ব্যবসায় প্রশাসনের অনেক কিছুই দুর্বোধ্য লাগত। তবে পরবর্তী সময়ে চেষ্টা করে সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠি। এমবিএ সম্পন্ন করে যোগ দিই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে। এরপর মেধা ও চেষ্টা দিয়ে পার হই একেকটা ধাপ।

খবরের কাগজ: নারী হিসেবে শিক্ষকতা বা এ জাতীয় কিছু না করে এত চ্যালেঞ্জের কাজে কেন এলেন?

রূপালী চৌধুরী: আমি চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসি। বিভিন্ন বিভাগে কাজ করার পর ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত হই। আমি নারী, এই ভেবে নিজে থেকে কখনো গুটিয়ে রাখিনি। পারব না তা-ও ভাবিনি। কঠিন পরিশ্রম করেছি। পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একই প্রতিষ্ঠানেই আছি বহু বছর ধরে। মার্কেটিং, সেলস, সাপ্লাই চেইন, সিস্টেমসহ বিভিন্ন বিভাগে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। এর মধ্যে ২০০৪ সালে ডিরেক্টর (অপারেশনস) হিসেবে পদোন্নতি পাই। ২০০৮ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। কাজ করতে গিয়ে কখনো হতাশ হইনি, হাল ছাড়িনি। সব সময় পরিশ্রম করেছি। সময়ের কাজ সময়মতো করেছি, কাজ ফেলে রাখিনি। নিজেকে আর পাঁচজন কর্মীর মতো সাধারণ ভেবেছি। ফলে সবাই খুব সহজে গ্রহণ করেছে। এ সবকিছুই আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনকে নিয়মের অঙ্কে বেঁধে এগিয়েছি।

খবরের কাগজ: কাজের বাইরেও আপনি বিভিন্ন স্বীকৃতি ও সম্মাননা পেয়েছেন। এ বিষয়ে কিছু বলেন।

রূপালী চৌধুরী: সফল হিসেবে আমাকে অনেকবার পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সরকারের মর্যাদাপূর্ণ ‘সিআইপি’ স্বীকৃতি। অনেকবার এই স্বীকৃতি পেয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনপ্রিয় সাময়িকীর পাতায় আমার সাক্ষাৎকার ছাপিয়েছে। স্বনামধন্য সাময়িকীতেও আমার ভাবনা তুলে ধরতে পেরে আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করেছি।

খবরের কাগজ: আপনার সফলতার পেছনের শক্তি কী?

রূপালী চৌধুরী: আমার সফলতার পেছনে সততা, কাজের প্রতি একাগ্রতা, প্রতিশ্রুতি এবং কঠোর পরিশ্রমই শক্তি। অনেকেই মনে করেন আমি মেধার বলে সর্বোচ্চ পর্যায়ে এসেছি। কিন্তু মেধা বা ট্যালেন্ট শুধু একটা বিষয়। বাকিটা হলো ইনোভেশন, অনেস্টি, ইন্টেগ্রিটি, কমিটমেন্ট অ্যান্ড হার্ড ওয়ার্কিং।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি ও এখানকার দুর্নীতি নিয়ে কিছু বলুন।

রূপালী চৌধুরী: নিয়ন্ত্রক সংস্থার আশীর্বাদ ছাড়া দুর্নীতি হতে পারে না। যেকোনো কোম্পানির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ঝামেলা থাকলে, তার সনদ বাতিল করতে হবে। আমাদের উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে, যারা দুর্নীতি করে, তাদের কিছু না কিছু শাস্তি পেতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমন হতে হবে, যে দোষ করবে, তাকে শাস্তি দেবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে কোনো কিছু করল না, বলল না- তাহলে তো ওই লোকগুলো আরও বেশি সুযোগ পেয়ে যাবে। পুঁজিবাজারে গতি আনতে হলে আস্থা ফেরাতে হবে। ভালো বিনিয়োগকারী আনতে হবে।

খবরের কাগজ: পুঁজিবাজার গতিশীল করতে হলে কী করা উচিত বলে মনে করেন?  

রূপালী চৌধুরী: দেশে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি আছে, যারা এখনো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির অভাব রয়েছে। এ জন্য দেশি-বিদেশি কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসার পথ বা বিনিয়োগ করার পথ আকর্ষণীয় করতে হবে। তালিকাভুক্ত হলে বেশি লাভ ও সুবিধা পাবে, এমন সুযোগ তৈরি করতে হবে। সুবিধা না পেলে কেন কোম্পানিগুলো আইপিওতে আসবে? পুঁজিবাজারের গতিশীলতা বিদেশি বিনিয়োগসহ একাধিক কারণে প্রভাবিত হয়। বছরের পর বছর ধরে অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী চলে যাওয়ায় এর প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়েছে। টাকার দাম কমে যাওয়ায় তাদের মূলধন কমে গেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুনঃবিনিয়োগে উৎসাহিত করা জরুরি। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হলে পুঁজিবাজার থেকে আয় ব্যাংকের সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। আর একটি সমস্যা হলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে চাওয়া মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম।

খবরের কাগজ: দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে কিছু বলুন। 

রূপালী চৌধুরী: ডলারের বিপরীতে টাকার দাম স্থিতিশীল হয়েছে। রিজার্ভ স্থিতিশীল হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন। আশা করি, ভবিষ্যতে এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল থাকলে ও ক্রেতাদের আস্থা বাড়লে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব। ব্যবসায়ী নেতারা এখন বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি দেশে মূল্যস্ফীতি ও ঋণের বাড়তি সুদ হারের মধ্যে চলতি বছরটি কীভাবে কাটবে সেদিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। সার্বিক প্রেক্ষাপটে মন্দার ঝড় বয়ে যাওয়া সত্ত্বেও অনেক ব্যবসায়ী নেতা আশা প্রকাশ করে বলছেন যে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করেছে। আমি বিশ্বাস করি অর্থনীতি গতিশীল হলে পুঁজিবাজারেরও গতি আসবে।

খবরের কাগজ: দেশে-বিদেশে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে এবং খানিকটা আর্থিক মন্দা চলছে। এ সম্পর্কে কিছু বলুন। 

রূপালী চৌধুরী: সব প্রতিষ্ঠান মন্দায় পড়েছে তেমনটি নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়লেও খরচ বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা কমেছে। কোনোটির মুনাফা বাড়েনি। মূল্যস্ফীতি এর বড় কারণ। করোনা মহামারির পর পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলো- এসব কারণে পণ্যের দাম বেড়েই চলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টাকার দাম অনেক কমে যাওয়ায় দেশের বাজারে পণ্যের দাম আরও বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমেছে। উৎপাদন খাতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের শুরুর দিকে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা বাড়ানোর পরিকল্পনা স্থগিত করে। এলসি বিধিনিষেধের কারণে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়। ঋণের সুদের বাড়তি খরচের কারণে মুনাফা কমেছে। অনেক কারখানা আমদানি করা কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে। ডলারের বিনিময় হারের অস্থিরতা তাদের ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।

খবরের কাগজ: আগের চেয়ে এলসি খোলার সুযোগ বেড়েছে কি ? 

রূপালী চৌধুরী: ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শর্তসাপেক্ষে এলসি খুলতে বাধ্য করা হয়। ফলে টাকার বিনিময় হার ঝুঁকিতে পড়ে। এলসি খোলা ও বিরতির সময়ে সুদের হারের ফারাক আর্থিক সংকট বাড়িয়েছে। এই অর্থনৈতিক পরিবেশ থেকে ব্যাংকিং খাত লাভবান হয়েছে। যখন উৎপাদন ও পরিষেবা খাত হিমশিম খাচ্ছে তখন ব্যাংকগুলো তাদের মুনাফা বাড়াতে পেরেছে। ক্রমবর্ধমান সুদের হারের কারণে ব্যাংকগুলো ঋণের টাকা থেকে বাড়তি অর্থ পেয়েছে। যদিও এটি ব্যবসার জন্য ঋণ নেওয়াকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।

খবরের কাগজ: ব্যবসায় এখন অন্যতম বাধা কী বলে মনে করেন?

রূপালী চৌধুরী: প্রধান বাধা ক্রেতাদের আস্থা কম। অর্থনীতিতে যখন অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, ক্রেতারা তখন খরচ কমিয়ে দেন। এটি বাজারের চাহিদাকে প্রভাবিত করে। নির্মাণ খাতে মন্দার কারণে ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্প অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও আশার আলো দেখছি। অর্থনীতি চাঙা হওয়ার লক্ষণ দেখেছি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি বছরে আমরা আরও স্থিতিশীলতা দেখতে পাব। রেমিট্যান্স বেড়েছে। রপ্তানি দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। যদিও বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানা বন্ধ আছে। ফলে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন।

খবরের কাগজ: অর্থনীতিতে গতি বাড়াতে আপনার পরামর্শ কী?

রূপালী চৌধুরী: কমপ্লায়েন্সের নিয়মনীতি সহজ হলে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে আসবে। তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে করপোরেট করের ব্যবধান কমলেও আইপিওর মাধ্যমে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহ দিতে আরও প্রণোদনা প্রয়োজন। স্বতন্ত্র পরিচালকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। এদের দায়িত্ব অনেক। যোগ্য পেশাদারদের আনতে আকর্ষণীয় পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত। চলতি বছরে সংকট থাকলে সম্ভাবনাও আছে। সুদের হার বেশি থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠান নগদ অর্থের সংকটে পড়ে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে ক্রেতাদের খরচ বাড়াতে হবে। ক্রেতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাজের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ব্যাংকিং খাতের গুরুত্ব আছে। খেলাপি ঋণ এখনো উদ্বেগের বিষয়। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান টাকার জন্য ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি কমাতে সরকার প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনছে। আশা করি এর সুফল আসবে।

খবরের কাগজ: রাজস্ব নীতি কেমন হওয়া উচিত?

রূপালী চৌধুরী: সরকারকে অনুমানযোগ্য রাজস্বনীতি অনুসরণ করতে হবে। কর ও শুল্ক কাঠামোতে হঠাৎ পরিবর্তন অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। কার্যকরভাবে পরিকল্পনা করার জন্য ব্যবসায় অনুমানযোগ্য নীতি প্রয়োজন। স্বয়ংক্রিয় কর ব্যবস্থা দুর্নীতি কমাবে। স্বচ্ছতা বাড়াবে। শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিকে উপকৃত করবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সঠিকভাবে তথ্য সমন্বয় করতে হবে।

খবরের কাগজ: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের ফলে কী প্রভাব পড়বে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে?  

রূপালী চৌধুরী: শুল্ক বাড়ানো ঠিক হবে না। এই মুহূর্তে শুল্ক বাড়ানো হলে ব্যবসা-বাণিজ্য চাপ নিতে পারবে না। সরকারের উচিত হবে বাড়তি শুল্কের চাপ থেকে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে রক্ষা করা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এর জন্য বিনিয়োগ আহ্বান করতে হবে।

খবরের কাগজ: দেশে শিল্প বিনিয়োগ আশানুরূপভাবে বাড়ছে না। বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার কাজ করছে। অনেক পদক্ষেপ নিচ্ছে। সম্প্রতি বিনিয়োগ সামিট হয়েছে। বিনিয়োগ সামিট থেকে বাংলাদেশ কতটা সুফল পাবে বলে মনে করেন?  

রূপালী চৌধুরী: এবারের বিনিয়োগ সামিট আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং হয়েছে। অনেক দেশের বিনিয়োগকারীরা অংশ নিয়েছেন। কারখানা গড়ে তোলার জায়গা সরেজমিনে গিয়ে দেখানো হয়েছে। তবে এসব সুফল পেতে হলে বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে। এসব সমস্যার সমাধান করা হলে বিনিয়োগকারীরা সহজভাবে বিনিয়োগ করতে পারবেন। দেশি বিনিয়োগকারীদেরও বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে হবে। মনে রাখতে হবে দেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেশি উৎসাহিত হয়।  

খবরের কাগজ: দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে আপনার সুপারিশ কী?

রূপালী চৌধুরী: সরকারের বিভিন্ন সংস্থার বা প্রতিষ্ঠানের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। বিশেষভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিনিয়োগ বোর্ড এবং এনবিআরের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাজে গতিশীলতা ব্যাহত হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সুষ্ঠুভাবে কাজ করা কঠিন পড়ে। শিল্পসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে এসব সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাহলে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোও স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে পারবে।

খবরের কাগজ: বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আরও কোন কোন বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে?

রূপালী চৌধুরী: বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সরকারকে অবশ্যই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসা সহায়কনীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি চাঙা হওয়ার ইতিহাস আছে। আমরা সম্ভাবনায় বিশ্বাস করি। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইতিবাচক উদ্যোগ হবে এ আশা করছি। কোরিয়ান ইপিজেডকে ঘিরে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান করতে হবে। সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আনতে কাজ করছে। উন্নত প্রযুক্তি আনবে। কাজের সুযোগ তৈরি হবে।

খবরের কাগজ: বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডে  যোগ দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নে আপনি কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

রূপালী চৌধুরী: ৯০ এর দশকে উন্নত দেশগুলোর শিল্প-কারখানা অফিস আদালতে উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়ার আমূল বদলে যেতে থাকে। সারা পৃথিবীতে যন্ত্র ব্যবহারে সে সময় একটা বিপ্লব ঘটছে। অথচ বার্জার পেইন্টসে তখনো কাজ চলত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিই, প্রতিযোগিতায় অন্যান্য সমজাতীয় প্রতিষ্ঠান থেকে সবার প্রথমে থাকতে হলে অল্প সময়ে বেশি কাজ করতে হবে। তাই প্রযুক্তিনির্ভরতার কোনো বিকল্প নেই। কোম্পানির বিভিন্ন বৈঠকে সহকর্মীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি। ধাপে ধাপে এগিয়ে যাই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের দিকে।

খবরের কাগজ: আপনার অভিজ্ঞতা কীভাবে বার্জার পেইন্টসের উন্নয়নে কাজে লাগিয়েছেন?

রূপালী চৌধুরী: প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন শাখায় কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এতে কাজের অভিজ্ঞতা বেড়েছে। ‘বেতনের বিনিময়ে কাজ করি’ বিষয়টি এমন আর থাকে না। ভালোবাসা জড়িয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে। অনেক আপন মনে হয় বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটিকে। সেই শুরু থেকেই দিনরাত ভেবেছি কীভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও একটু সামনে এগিয়ে নেওয়া যায়। ১৯৫০ সালে বিশ্ব বাজারে বার্জার পেইন্টসের জন্ম হলেও বাংলাদেশে এ প্রতিষ্ঠানটি আত্মপ্রকাশ করে ১৯৭০ সালে। জামানির লুইস বার্জার এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে তার ছেলেরা তা গতিশীল রাখেন। পৃথিবীর অনেক দেশে বার্জার পেইন্টসের শাখা রয়েছে।

খবরের কাগজ: প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক বাজারে, একই সঙ্গে দেশের বাজারেও অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এর পেছনের কথাগুলো বলেন।

রূপালী চৌধুরী: ‘বার্জার মানে নতুন কিছু, বার্জার মানের স্বপ্নের মতো কিছু’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন একটি ধারণা তৈরি করতে চেয়েছি ভোক্তার কাছে। আমদানি করা কাঁচা মালের ওপর নির্ভরশীল পেইন্টের উৎপাদন। এ নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে প্রতিষ্ঠানের কারখানায় কাঁচামাল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। ইমালসন, রেজিন এখানেই তৈরি সম্ভব হচ্ছে। এমনকি পেইন্টে ব্যবহৃত ক্যানটিও আমাদের কারখানায় প্রস্তুত করা হয়। আরও নতুন আবিষ্কারের চেষ্টায় আছেন বার্জারের গবেষকরা। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পেইন্ট তৈরি করা হয়। তাই গবেষণার ওপর জোর দিয়েছি সবচেয়ে বেশি। এ খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ থাকে প্রতিষ্ঠানটির বাজেটে। কম দামে উন্নতমানের পণ্য সরবরাহের চেষ্টা করা হয় আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে। কারণ ব্যবসা এক দিনের জন্য নয়। বাজারে যেকোনো পণ্যের ‘গুড উইল’ তৈরিতে পার হয় দীর্ঘদিন, খরচ হয় বহু মেধার, দিতে হয় অনেক শ্রম। তাই নিম্নমানের পণ্য দিয়ে ভোক্তাকে প্রতারিত করা মানে পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা নষ্ট করা।

খবরের কাগজ: সাধারণ মানুষের হাতে বার্জারের পেইন্টস পৌঁছে দিতে কী করছেন?

রূপালী চৌধুরী: ক্রেতার পছন্দ বিবেচনায় রেখে বার্জার থেকে বিভিন্ন ধরনের পেইন্ট সরবরাহ করা হয়। সারা দেশেই এসব বিক্রি করা হয়। ভোক্তার চাহিদা বাড়ছে। স্থানীয় বাজারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারও আমাদের লক্ষ্য। সারা বিশ্বেই আজ রঙের চাহিদা বেড়েই চলেছে। এ চাহিদাকে কাজ লাগাতে চাই।

খবরের কাগজ: দেশে রঙের বাজার সম্পর্কে কিছু বলুন।

রূপালী চৌধুরী: এ দেশে চাহিদার তুলনায় রং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক কম। অনেক উদ্যোক্তা আছেন যারা এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী। কিন্তু জ্বালানি সংকট ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। শিল্প খাতে সমৃদ্ধি আনতে প্রয়োজন সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ। জেনারেটর দিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। ছোট-বড় ইমারত, শিল্প-কারখানা, ঘরের দেয়ালসহ ইট-বালু-সুরকির যেকোনো কাঠামো দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে রঙের ব্যবহার বাধ্যতামূলক। রংকে আমাদের দেশে বিলাসজাত পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ আধুনিক দেশগুলোতে রং অতি জরুরি পণ্যের তালিকায় আছে। আমাদের দেশের অনেক মানুষই জানেন না রং ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কতখানি। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। সম্মিলিতভাবে রঙের বাজার সম্প্রসারণে কাজ করতে হবে।  

খবরের কাগজ: চলার পথে বাধা পেলে কী করেছেন?

রূপালী চৌধুরী: চলার পথ কখনো মসৃণ হয় না। কেউ কাউকে দয়া করে এতটুকু জায়গা ছেড়ে দেয় না। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি হতে হলে কর্মরত প্রতিষ্ঠানের সব বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে, নেতৃত্ব দানের মতো গুণাবলি অর্জন করতে হবে এবং সহকর্মীদের প্রতি থাকতে হবে শ্রদ্ধাবোধ। সহকর্মীদের কাছ থেকে মেয়ে হিসেবে অসহযোগিতা বা দয়া পাওয়ার সুযোগ না দিলে সমস্যা তৈরি হয় না কর্মক্ষেত্রে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হতে হলে মেধার স্বাক্ষর রাখতে হয় প্রতি মুহূর্তে। এখানে সিদ্ধান্ত কে দিচ্ছে, মেয়ে না ছেলে তা নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ থাকে কম। কাজ জানার বিকল্প কিছু নেই।

খবরের কাগজ: আপনি কর্মজীবী নারীর পাশাপাশি একজন মা। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।

রূপালী চৌধুরী: একটি নারীকে বাড়তি কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়। একজন নারী কখনো একজন কর্মকর্তা, একজন মা ও স্ত্রী। তাকে স্বামীর ও বাবার বাড়ির লোকজনের প্রতি যত্নশীল হতে হয়। এখানে স্বামী বা পরিবারের সহযোগিতা ছাড়া কোনো নারীর পক্ষে কাজ করা সম্ভব হয় না। 

খবরের কাগজ: আপনাকে সবাই সফল নারী বলেন। এ বিষয়ে বক্তব্য কী?

রূপালী চৌধুরী: আমার সাফল্যটাই সবাই দেখছে, এর পেছনে যে কঠিন পরিশ্রম ও অধ্যবসায় আছে অনেকে তা জানেন না।

খবরের কাগজ: আপনার কয় সন্তান?

রূপালী চৌধুরী: মেয়ে পূর্ণা ও ছেলে রাহুল। তারা দুজনই বিদেশে পড়ালেখা করেছে। মায়ের আজকের এই অবস্থানে তারা গর্বিত।

খবরের কাগজ: আপনার স্বামীর কতটা সহযোগিতা পেয়েছেন?

রূপালী চৌধুরী: কর্মজীবনের সাফল্যের জন্য আমার স্বামীর অনেক অবদান। আমি এজন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনিও বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্তাব্যক্তি। তিনি ব্যক্তিজীবনে থেকেছেন বন্ধুর মতো। আমার কোনো কাজেই আপত্তি করেননি।

খবরের কাগজ: সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন আপনার?

রূপালী চৌধুরী: আমার সহকর্মীদের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ আছে। তাদের নিজের পরিবারের সদস্য মনে করি। মনে করি বার্জার পেইন্টস আমার আরেকটা পরিবার।

খবরের কাগজ: আপনাকে ধন্যবাদ।

রূপালী চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবির মুরগির বাচ্চার দাম নির্ধারণে সরকারি নজরদারি জরুরি

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৩ এএম
মুরগির বাচ্চার দাম নির্ধারণে সরকারি নজরদারি জরুরি
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (CVASU) পোলট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের পরিচালক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির

দেশের পোলট্রি খাতকে স্থিতিশীল রাখতে মুরগির এক দিন বয়সী বাচ্চার (DOC) দাম নির্ধারণে সরকারের কার্যকর মনিটরিং অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে ছোট খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এমনটাই জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (CVASU) পোলট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের পরিচালক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির। তার সঙ্গে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান ইফতেখারুল ইসলাম।

খবরের কাগজ: মুরগির এক দিন বয়সী বাচ্চার উৎপাদন খরচ কত?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: এক দিন বয়সী ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদনের খরচ সাধারণত ৩০ টাকার বেশি। লেয়ার বাচ্চার ক্ষেত্রে তা ৩৫ টাকার ওপরে। তবে ফিডের দাম, প্যারেন্ট স্টকের মান এবং হ্যাচারির ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে এই খরচ কিছুটা কমবেশি হতে পারে।

খবরের কাগজ: খামারিদের অভিযোগ, দেশের পোলট্রি শিল্পের নিয়ন্ত্রণ বড় কোম্পানির হাতে চলে গেছে। এর বাস্তবতা কতটুকু?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: খামারিদের এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বর্তমানে ফিডের দাম অনেক বেড়েছে, ভ্যাকসিনের খরচও রয়েছে। অন্যদিকে ডিম উৎপাদনের গড় খরচ এখন প্রায় ১০–১২ টাকার মধ্যে হলেও অনেক ক্ষেত্রে খামারিদের কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজারে তাদের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় তারা প্রায়ই উৎপাদন খরচের নিচে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। ফলে ছোট খামারিদের টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

খবরের কাগজ: পোলট্রি খাতের প্রধান সমস্যাগুলো কী?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: এই খাত এখনো অনেকাংশে আমদানিনির্ভর। ডলারের দাম বাড়ায় ভুট্টা, সয়াবিনসহ খাদ্য উপাদান আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি বাজারে মাঝে মাঝে কৃত্রিম সংকটও তৈরি করা হয়। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব বিপণনব্যবস্থা থাকায় তারা সহজে পণ্য বিক্রি করতে পারে, কিন্তু ছোট খামারিরা সরাসরি বাজারে প্রবেশ করতে পারেন না। এটিই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

খবরের কাগজ: দেশের অর্থনীতিতে পোলট্রিশিল্পের ভূমিকা কীভাবে দেখেন?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: ঈদুল আজহার আগে-পরে প্রায় দেড় থেকে দুই মাস ডিম ও মুরগির চাহিদা কিছুটা কম থাকে, তবে বাকি সময়ে বাজার স্থিতিশীল থাকে। পোলট্রি খাত সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম উৎস। গরু বা খাসির মাংসের তুলনায় মুরগির মাংস অনেক সস্তা, ফলে সাধারণ মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গ্রামাঞ্চলে পোলট্রি খামার স্থাপন করে অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

খবরের কাগজ: এ ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় কী?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: মুরগির এক দিন বয়সী বাচ্চার দাম নির্ধারণে সরকারের কার্যকর নজরদারি থাকা জরুরি। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি গ্রহণযোগ্য মূল্যসীমা নির্ধারণ করা গেলে বাজারে অস্থিরতা কমবে। একই সঙ্গে বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো গোষ্ঠী এককভাবে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। এতে ছোট খামারিরা টিকে থাকতে পারবেন এবং ভোক্তারাও ন্যায্যমূল্যে পণ্য পাবেন।

খবরের কাগজ: অনেকেই বলেন, বায়োসিকিউরিটি ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে খামারিরা লোকসানে পড়েন–এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: বিদেশি জাতের মুরগি তুলনামূলকভাবে সংবেদনশীল। তাই খামার শুরু করার আগে এ বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা অর্জনের পর খামার পরিচালনা করলে ঝুঁকি অনেক কমে যায়। বড় কোম্পানি, সরকারি প্রাণিসম্পদ দপ্তর এবং খামারিদের সংগঠনগুলো সমন্বিতভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে পুরো খাতই উপকৃত হবে।

খবরের কাগজ: মুরগির খাদ্যের আমদানি-নির্ভরতা কমাতে কী করা যেতে পারে?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: মুরগির খাদ্যের প্রধান উপাদান ভুট্টা। দেশে ভুট্টা উৎপাদনের সম্ভাবনা অনেক বেশি। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে ভুট্টা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন, কারণ এর উৎপাদন খরচ আমদানির তুলনায় কম। তবে বাজার নিশ্চয়তা দিলে আরও বেশি কৃষক এই খাতে আসবেন। এতে করে আমদানি-নির্ভরতা কমবে এবং উৎপাদন ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

সাক্ষাৎকারে সুমন হাওলাদার সিন্ডিকেট ভাঙার ক্ষেত্রে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১১ এএম
সিন্ডিকেট ভাঙার ক্ষেত্রে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার

ঈদ, আশুরা, রমজান মাসসহ বিভিন্ন ইভেন্টকে লক্ষ্য রেখে কোম্পানিগুলো রুটিন করে মুরগির বাচ্চার দাম বাড়ায়। এই সিন্ডিকেট ভাঙার ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলেছেন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খবরের কাগজ চট্টগ্রামের ব্যুরোপ্রধান ইফতেখারুল ইসলাম।

খবরের কাগজ: পোলট্রি খাতে খামারিদের অবস্থা কী?
সুমন হাওলাদার: এককথায় বলতে গেলে ভালো নেই। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এখন এই খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অন্য কর্মে চলে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের ২০০৭ সালে খামারির সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫ হাজার। ২০১২ সালে তা কমে হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার। বর্তমানে ৬৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার খামারি কোনোভাবে টিকে আছেন। 

খবরের কাগজ: কারণ কী?
সুমন হাওলাদার: খামারিরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও যখন কোনো লাভ পাচ্ছেন না, তাই তারা অন্য খাতে চলে যাচ্ছেন। অনেকেই পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এভাবে চলতে থাকলে দেশের একসময় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে যখন সাধারণ মানুষ আর মুরগি কিনে খেতে পারবেন না। গরু-ছাগলের মাংসের মতো মুরগির মাংসও নিম্নআয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। ২০২৩ সালে একবার সংকট সৃষ্টি হয়েছিল। তখন ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা হয়েছিল ব্রয়লার মুরগির দাম। এখন যেভাবে চলছে সরকার যদি হস্তক্ষেপ না করে তাহলে সেই পরিস্থিতি তৈরি হতে দেরি নেই।

খবরের কাগজ: এই সংকট কীভাবে তৈরি হচ্ছে?
সুমন হাওলাদার: কোম্পানিগুলো ঈদ, রমজান মাস, শবেবরাত, নববর্ষসহ বিভিন্ন উৎসব এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রুটিন তৈরি করে মুরগির বাচ্চার দাম বাড়ায়। এবারের ঈদে ভোক্তারা যে মুরগি কেজি ২০০ টাকার বেশি দামে কিনে খেয়েছেন সেই বাচ্চা দেশের বিভিন্ন এলাকার খামারিদের কিনতে হয়েছে প্রতিটি ৮৫ টাকা থেকে ১০০ টাকায়। কোম্পানিগুলো লাভ আগে নিয়ে নেয়। যখন চাহিদা বাড়বে তার আগেই তারা বাচ্চার দাম বাড়িয়ে ফেলে। 

খবরের কাগজ: এই খাতের ওপর কোম্পানিগুলোর এত শক্ত নিয়ন্ত্রণ কীভাবে প্রতিষ্ঠা পেল?
সুমন হাওলাদার: যারা বাচ্চা উৎপাদন করে তারাই ফিড উৎপাদন করে। এ ছাড়া ওষুধ, ভ্যাকসিন সবকিছুই তারা করে। তারা চুক্তিভিত্তিক ফার্ম করে। বাজার নিয়ন্ত্রণও তারা করে। 

খবরের কাগজ: পোলট্রি শিল্পের নীতিমালা নেই? 
সুমন হাওলাদার: নীতিমালা হয়েছে। তবে তা দুর্বল নীতিমালা। সরকারের আমলারা করপোরেট গ্রুপের কাছ থেকে সুবিধা নেয়। করপোরেট গ্রুপের হাতে পুরো খাতটা তুলে দিচ্ছে। এতে বেকারত্ব বেড়ে যাচ্ছে। দেশের অর্ধকোটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে বেকার করে দিচ্ছে। 

খবরের কাগজ: কোম্পানিগুলোর অভিযোগ হলো অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে বাচ্চা বিক্রি করতে হয়।
সুমন হাওলাদার: এটা তাদের লোকদেখানো বক্তব্য। যেকোনো ব্যবসার নিয়ম হলো যখন চাহিদা বাড়ে কিংবা বিক্রি বাড়ে, তখন কম লাভে পণ্য বিক্রি করা। কিন্তু পোলট্রি খাতে তার উল্টো চিত্র। বিক্রি বাড়লে তারা দুই থেকে তিন গুণ দামে বিক্রি করে। খামারিরা যখন লোকসানে পড়ে খামার বন্ধ করে দেন, তখন তারা কম দামে বাচ্চা বিক্রি করেন। ১০ থেকে ১২টা কোম্পানি সিন্ডিকেট করে এই জটিলতা তৈরি করেছে। দেশে প্রতি সপ্তাহে বাচ্চার চাহিদা প্রায় ২ কোটি। বাচ্চার সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। 

খবরের কাগজ: অভিযোগ আছে, বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করতে না পারার কারণে অনেক সময় মুরগি মারা যায়।
সুমন হাওলাদার: এই রোগের জন্যও কোম্পানিগুলো দায়ী। তারা কম দামে প্যারেন্ট স্টক কেনার জন্য বার্ড ফ্লু হয়েছে এমন দেশ থেকে বাচ্চা কিনে আনে। তাহলে খামারে রোগ তো আসবেই। তারা শুধু নিজেদের লাভের জন্য সেই কাজটি কেন করে।

সাক্ষাৎকারে নাছির উদ্দিন ১৫ দিন অন্তর মুরগির বাচ্চা ও মুরগির দাম নির্ধারণ করা উচিত

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০৭ এএম
আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১২ এএম
১৫ দিন অন্তর মুরগির বাচ্চা ও মুরগির দাম নির্ধারণ করা উচিত
প্রান্তিক খামারি মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন

একজন ক্ষুদ্র খামারি তার সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে পারেন না। ভালোভাবে চলতে পারেন না। সরকারের উচিত অন্তত ১৫ দিন অন্তর মুরগি এবং মুরগির এক দিন বয়সী বাচ্চার দাম নির্ধারণ করে দেওয়া। তাহলে কেউ রাতারাতি সবকিছু পরিবর্তন করতে পারবে না। একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন, ফটিকছড়ি উপজেলার সুয়াবিল ইউনিয়নের প্রান্তিক খামারি মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খবরের কাগজের চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান ইফতেখারুল ইসলাম। 

খবরের কাগজ: খামার করতে এসে অনেকেই টিকতে পারছেন না কেন? 
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন: খামার করতে এসে টিকতে না পারার উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে সঠিক সময়ে উৎপাদন করতে না পারা। খামার ব্যবস্থাপনায় অজ্ঞতা, সঠিক পরিচর্যার অভাব। খামার রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ। এখানে বাজারজাত করার একটি ব্যাপারও রয়েছে। বাজারে মূল্য পেতে হলে সঠিক সময়ে বিক্রি করতে হবে।

খবরের কাগজ: খাবারের দাম বেশি, বাচ্চার দাম বেশি কীভাবে সামাল দিচ্ছেন? 
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন: বর্তমানে মুরগির পাইকারি দাম কেজি ১৪৫ টাকা থেকে ১৫০ টাকা। তবে খাবারের দাম আর একটু কম থাকলে ভালো হতো। পর্যাপ্ত খাবার, টিকা ওষুধ দিয়ে উৎপাদনের দেখা গেল বাজারে মূল্য কম। সরকার যদি বাজার মনিটরিং করে ১৫ দিন অন্তর বাচ্চা এবং মুরগির দাম নির্ধারণ করে দিতে তাহলে সবাই উপকৃত হতো। 

খবরের কাগজ: সরকার আর কী করলে খামারিদের উপকার হবে? 
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন: বেসরকারিভাবে খামার তৈরি হচ্ছে। খামারিরা কীভাবে উৎপাদন করছে, সেটিও দেখাশোনার কেউ নেই। এতে মাঝারি ও ক্ষুদ্র খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বন্ধ করে অন্য পেশায় চলে যান। খামার টিকিয়ে রাখতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। বাচ্চা ক্রয় থেকে লালনপালন ও বিক্রি সব ক্ষেত্রে যদি সরকারি নজরদারি রাখে তাহলে সবার জন্য মঙ্গল। কেউ রাতারাতি যা খুশি তা করতে পারবে না। 

খবরের কাগজ: রোগবালাই নিরসনের ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত? 
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন: আমার খামারে যেকোনো রোগবালাই নিজেই চিকিৎসা করি। একজন খামারি হিসেবে খামার সম্পর্কে রোগবালাই সম্পর্কে জ্ঞান রাখা খুবই দরকার। খামারে সমস্যা দেখা গেলে কেন সৃষ্টি হচ্ছে সেটি খুঁজে বের করতে হবে। এই যে সমস্যা নির্ণয় করা, সেটি একজন খামারি ছাড়া বেশি কেউ বুঝবে না। তাই বলছি, খামারিকে ট্রেনিং নিতে হবে। রোগ বালাইয়ের লক্ষণ বুঝতে হবে। 

খবরের কাগজ: যারা নতুন খামার করতে আসছে তাদের উদ্দেশে কিছু বলেন। 
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন: বিভিন্ন স্থানে ট্রেনিং নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। খামার করতে হলে আধুনিকভাবে করতে হবে। অর্থাৎ কাজ জেনে খামারে নামতে হবে। কিছু জানাশোনা থাকলে বাকি কাজটা করতে গিয়ে শিখতে পারবে। 

খবরের কাগজ: একসময় অনেক খামার ছিল, এখন প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে কেন?
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন: এই ব্যবসাকে অনেকেই ভালো চোখে দেখেন না। এখানে ঝুঁকি বেশি। অনেকে না বুঝে এসে আটকে যান। সামনেও যেতে পারেন না, পেছনেও যেতে পারেন না। অনেকে ৬ মাস এক বছর খামার করে বন্ধ করে দেন। লাভ করতে না পেরে অনেকেই অন্য ব্যবসায় চলে যান। খামার ব্যবসায় মধ্যস্বত্বভোগীরা বেশি উন্নতি করেন, খামারিরা করতে পারেন না। 

খবরের কাগজ: আপনিতে নিজেই অনেক অভিজ্ঞ, আপনার কতটুকু উন্নতি হয়েছে? 
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন: ঠিক বলেছেন, সেভাবে উন্নতি করতে পারিনি। বিগত ১০ বছর ধরে এ ব্যবসায় রয়েছি। একজন খামারি তার ছেলেমেয়েকে ভালো স্কুলে পড়াতে পারেন না, ভালো কিছু খেতে পারেন না। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীরা বেশি লাভ করছেন। আমরা লাভ করতে পারি না।

সাক্ষাৎকারে মাসাদুল আলম মাসুদ নীতি-সহায়তা বাড়ালে রডের বাজার স্থিতিশীল হবে

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫৩ এএম
নীতি-সহায়তা বাড়ালে রডের বাজার স্থিতিশীল হবে
শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম মাসুদ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে উন্নয়নকাজে ধাক্কা লাগে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ থমকে যায়। রডের প্রতিটনে দাম কমে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। অবশেষে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে দেশে। বিনিয়োগকারীদের মনে আশা জাগে। কিন্তু কয়দিন না যেতেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে টালমাটাল হয়ে যায় নির্মাণসামগ্রীর বাজার। বিশেষ করে রডের টনে বেড়েছে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। এভাবে হঠাৎ করে অস্বাভাবিকভাবে দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই হতভম্ব হয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখছেন। এ অবস্থা থেকে কীভাবে উত্তরণ সম্ভব। এসব জানতে খবরের কাগজ কথা বলেছে বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম মাসুদের সঙ্গে। তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাহাঙ্গীর আলম

খবরের কাগজ: বর্তমানে রডের বেচা-বিক্রি কেমন হচ্ছে? 
এস কে মাসাদুল আলম: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পরে উন্নয়নকাজ থমকে যায়। বেচাবিক্রি খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। অনেক ঠিকাদার পালিয়ে যান। আবার বেসরকারি খাতের নতুন করে কেউ বিনিয়োগও করেননি। এ জন্য দেশে রড ও সিমেন্ট বেচাবিক্রি একেবারে কমে যায়। কিন্তু নির্বাচিত সরকার গঠনের পর আমরা আশায় বুক বাঁধি। কিন্তু সরকার গঠনের কয়দিন না যেতেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। তার ধাক্কা লাগে নির্মাণসামগ্রীতে। বিশেষ করে রডের কাঁচামাল স্ক্যাপের দাম অনেক বেড়ে গেছে। আগের কোনো স্টক ছিল না। তাই দাম বেড়ে গেছে। বেচাকেনা মোটামুটি হচ্ছে।

খবরের কাগজ: রডের দাম যাওয়ার কারণ কী? 
এস কে মাসাদুল আলম: গত সরকার ২০২৪ সালে যখন দায়িত্ব নেয় তখন বেচাকেনা কমে যায়। ফলে রডের দামও প্রতিটনে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা কমে যায়। লোকশান করে ব্যবসা করতে হয়। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর আমাদের মৌসুম শুরু হয়। চাহিদা আগের তুলনায় বেড়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধও শুরু হয়েছে। এ জন্য টনে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।   

খবরের কাগজ: যুদ্ধের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কেন রডের দাম বাড়ল। উৎপাদন তো সেই এলসি খোলার কাঁচামাল থেকে হয়নি?
এস কে মাসাদুল আলম: এ সময়ে চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদনও অনেক কমে যায়। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে অনেক ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। মৌসুমে সব পণ্যের দাম বাড়ে। নির্মাণসামগ্রীর মৌসুমও শীতকাল। তাই জানুয়ারি থেকেই একটু একটু দাম বাড়ে। যুদ্ধের কারণে আরও বেড়ে যায়। স্ক্যাপ ও পরিবহনের ভাড়াও বেড়ে গেছে। তবে এলসি খোলার পর সেই পণ্য দেশে আসতে ২ থেকে আড়াই মাস সময় লাগে। এটা অস্বীকার করা যাবে না। তবে যুদ্ধের প্রভাবেই রডের দাম বেড়েছে। শুধু রড না এর সঙ্গে তার, কেবল, ইলেকট্রিক, গ্লাস সব কিছুর দাম বাড়ছে।  

খবরের কাগজ: রডের দাম অনেক বেড়ে গেছে। বর্তমানে চাহিদা কেমন? 
এস কে মাসাদুল আলম: চাহিদা মোটামুটি আছে। কারণ এখন নির্মাণ খাতের মৌসুম।  ৯০ থেকে ৯৮ হাজার টাকা টন হয়েছে, যা কমে কিছুদিন আগে ৭৭ থেকে ৮৪ হাজার টাকায় নামে। এভাবে দাম কমে যাওয়ায় অনেককেই লোকশান করে ব্যবসা করতে হয়। তবে যারা বড় কোম্পানি লোকশান থেকে রেহাই পেতে স্টক করে রাখেন। অনেকেই টিকতে না পেরে কারখানা বন্ধ রাখেন। ৪০টির মধ্যে প্রায় ১৫টি অটোমেটিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া অনেক ছোট কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে।  

খবরের কাগজ: এ অবস্থার কী পরিবর্তন হবে?
এস কে মাসাদুল আলম: দেশে স্থিতিশীলতা দরকার। ভালো সরকার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব না। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর আমরা আশা করলেও বাস্তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। শঙ্কার মধ্যেই ব্যবসা করতে হয়েছে। কেউ নতুন করে বিনিয়োগ করেননি। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যবসা-বাণিজ্যের খারাপ অবস্থা। আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে সারা বিশ্বে। আগে ইউরোপ থেকে কাঁচামাল আসত। বিভিন্ন কারণে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। আমরা যারা এ শিল্পে বিনিয়োগ করেছি তারা ভুক্তভোগী। তাই নির্বাচিত বিএনপি সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা এবারের বাজেটে যেন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আসে। তা হলেই এ অবস্থার পরিবর্তন আসবে। এক সময়ে করোনা গেল। তারপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, তা শেষ না হতেই আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। তাই সরকারকে আমাদের উদারভাবে সমর্থন দিতে হবে। তা না হলে টিকা কঠিন হয়ে যাবে। ব্যাংকের সহায়তা পেলে আমরা ঘুরে দাঁড়াব।

খবরের কাগজ: সরকার কী করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে?
এস কে মাসাদুল আলম: ডলারের দাম বৃদ্ধি বা টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা অনেক কমে গেছে। কারণ ব্যাংকও আগের তুলনায় খারাপ অবস্থায় থাকায় চাহিদামতো আমাদের সুবিধা দিচ্ছে না। কাঁচামালের ওপর শুল্ক বেশি, তা কমাতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কালাকালুন আইন বন্ধ করতে হবে। সরকার ও ব্যাংকের নীতি-সহায়তা (পলিসি সাপোর্ট) বাড়াতে হবে। তবে দেশের বাজার স্থিতিশীল হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। 

খবরের কাগজ: এই শিল্পে বিনিয়োগ কেমন হবে?
এস কে মাসাদুল আলম: প্রথমে কম থাকলেও বর্তমানে ৪০টির মতো অটো স্টিলমিলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া ম্যানুয়ালি রডের কারখানা আগে ৩০০ মতো ছিল। বর্তমানে ১৫০টির মতো টিকে আছে। সব মিলিয়ে এ শিল্পে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেন প্রায় ২ লাখ মানুষ। পরোক্ষভাবে জড়িত ২ কোটি পরিবার। কারণ দেশের গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের আনাচে-কানাচে ফেরিওয়ালা থেকে শুরু করে বন্দরের পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত সবাই এর সঙ্গে পরোভাবে যুক্ত। রডের যেখানে ব্যবহার হয় সেখানে ইট, বালি, সিমেন্ট, থাই, গ্লাসেও ব্যবহার হয়। তারাও পরোক্ষভাবে এই শিল্পে জড়িত। কাজেই দেশে ব্যবসা ভালো চললে সবাই ভালো থাকবেন।

সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ আবদুর রহিম যুদ্ধের প্রভাবে কমেছে সিমেন্ট বিক্রি

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৪ এএম
আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৫ এএম
যুদ্ধের প্রভাবে কমেছে সিমেন্ট বিক্রি
ডায়মন্ড সিমেন্টের মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) মোহাম্মদ আবদুর রহিম

সিমেন্টের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চাহিদাও কমে গেছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামালের অন্যতম বাজার হলো মধ্যপ্রাচ্য। আর যুদ্ধের প্রভাবে সেখানে কাঁচামালের দাম বাড়ার পাশাপাশি প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে। অপর দিকে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। খবরের কাগজের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান ডায়মন্ড সিমেন্টের মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) মোহাম্মদ আবদুর রহিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান ইফতেখারুল ইসলাম। 

খবরের কাগজ: কবে থেকে সিমেন্টের দাম বৃদ্ধি শুরু।
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ হামলা শুরু হয় এর কয়েক দিন পর থেকেই মূলত সিমেন্টের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। 

খবরের কাগজ: যুদ্ধের সঙ্গে সিমেন্টের সম্পর্ক কোথায়?
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরের সপ্তাহ থেকে সিমেন্টের কাঁচামালের দাম প্রতিটনে ১০ থেকে ১৫ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যায়। প্রতিটন মানে ২০ ব্যাগ। অধিকাংশ কাঁচামাল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। সৌদি আরবের জেবল আলী বন্দর থেকে এসব কাঁচামাল মূলত জাহাজীকরণ করা হয়। যে কারণে কাঁচামালের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়ভাবেও কিছু সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

খবরের কাগজ: মধ্যপ্রাচ্য থেকে সিমেন্টের কোন কোন কাঁচামাল আনা হয়?
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: লাইমস্টোন, জিপসাম, ক্লিংকারসহ প্রায় সব ধরনের কাঁচামাল আমদানি করা হয়।

খবরের কাগজ: স্থানীয় সংকট কীভাবে সৃষ্টি হলো?
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: দেশে জ্বালানিসংকটের কারণে গাড়ির ভাড়া বেড়ে গেছে। সিমেন্ট হচ্ছে ভারী পণ্য। এই পণ্যটি পরিবহন করতে হয় সতর্কভাবে। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান কিংবা জলযানে জ্বালানি তেল পেতে কষ্ট হচ্ছে। দূর-দূরান্তে সিমেন্ট পাঠানোর সময় গাড়িচালকরা তাদের গাড়ি কয়েক জায়গায় দাঁড়িয়ে তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছে। যে কারণে তারা বাড়তি ভাড়া দাবি করছেন। আমরাও দিতে বাধ্য হচ্ছি। এই বাড়তি ভাড়া সিমেন্টের দামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।  

খবরের কাগজ: সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি। বলছে সংকটও নেই।
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি ঠিক। কিন্তু নানা কারণে সংকট দূর করতে পারেনি। এখানে সরকারের আন্তরিকতা থাকলেও জ্বালানি তেলের যে সংকট চলছে তা দূর করতে রাষ্ট্রের যেসব যন্ত্র ভূমিকা রাখার কথা তারা যথাযথভাবে রাখতে পারেনি।  

খবরের কাগজ: সিমেন্টের দাম কী হারে বেড়েছে?
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: প্রতি ব্যাগে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আমাদের উৎপাদন খরচ যে হারে বেড়েছে, তা সিমেন্টের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সমন্বয় করার চেষ্টা করেছি। বাস্তবতা হলো যতটুকু খরচ বেড়েছে ততটুকু বাড়ানো যায়নি। 

খবরের কাগজ: যুদ্ধের আগে যেসব পণ্যের লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলা হয়েছে সেসব পণ্য এখনো দেশে পৌঁছায়নি।
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: না আসেনি। কাঁচামাল রপ্তানিকারী দেশগুলোতে কাঁচামাল উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। তাদের ক্লিংকারের কারখানা আছে, যা অতি উচ্চমাত্রায় সেদ্ধ করতে হয়। তাদেরও জ্বালানিসংকট এবং জ্বালানির দাম বেড়েছে। তাই তারা আগের দামে পণ্য রপ্তানি করতে রাজি হচ্ছে না। বাড়তি দাম যোগ করলে পণ্য পাঠাবে। নতুবা পাঠাবে না। এই কথা আমাদের জানিয়ে দিয়েছে।

খবরের কাগজ: দামের কারণে সিমেন্টের বাজারে কোনো প্রভাব পড়েছে?
মোহাম্মদ আবদুর রহিম:  অবশ্যই পড়েছে। তবে শুধু দামের কারণে প্রভাব পড়েছে এ কথা সত্য নয়। যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বেশ ভালোভাবেই পড়েছে। যুদ্ধের কারণে অনেক প্রবাসী শ্রমিক বাসায় বসে কোনো রকমের দিন কাটাচ্ছেন। প্রবাসী ব্যবসায়ীদের ব্যবসাও ভালো যাচ্ছে না। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বৈধ এবং অবৈধ উপায়ে রেমিট্যান্স পাঠানোর ওপর। মূলত নির্মাণশিল্প পণ্যের বড় গ্রাহক প্রবাসীরা। তারা বিদেশ থেকে টাকা পাঠান। দেশে নিজের বাড়ি করেন। এমনকি তারা দান দক্ষিণাও বেশি করেন। দেশের মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণের ক্ষেত্রে তারা ভূমিকা রাখেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রবাসীরা যেখানে নিজে খেয়েপরে বেঁচে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। সেখানে নিজের বাড়িতে টাকা পাঠানো তাদের জন্য কঠিন। আর মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের হাতে টাকা থাকলে তা তারা নিজের কাছে জমা রাখেন না, দেশে পাঠিয়ে দেন। 

খবরের কাগজ: বাজারে কী পরিমাণ চাহিদা কমেছে?
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: গত মার্চ মাসে দেশে সিমেন্ট বিক্রি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩৪ লাখ টন। চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনে তার চেয়ে ১৫ শতাংশ বিক্রি কমে গেছে।