গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পবির্তনের ফলে উন্নয়ন কাজে ধাক্কা লাগে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ থমকে গেছে। এর প্রভাবে দেশে রড ও সিমেন্টের চাহিদাও একেবারে কমে গেছে। বেচাবিক্রি খুবই খারাপ অবস্থা চলছে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়ে গেছে কয়েক হাজার শ্রমিক। এ অবস্থা থেকে কিভাবে উত্তরণ সম্ভব। এসব ব্যাপারে খবরের কাগজ কথা বলেছে বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম মাসুদের সঙ্গে। তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাহাঙ্গীর আলম।
খবরের কাগজ: বর্তমানে রড ও সিমেন্টের বেচাবিক্রি কেমন হচ্ছে?
এসকে মাসাদুল আলম: সরকার পরিবর্তনের পরে উন্নয়ন কাজ হচ্ছে না। বেচাবিক্রি খুবই খারাপ অবস্থা। একেবারে মন্দা যাচ্ছে। কখনো এমন দেখিনি। অনেক ঠিকাদার পালিয়ে গেছেন। যাদের হাতে বেশি টাকা ছিল সেই মালিকরা দেশ ছাড়া হয়েছেন। আবার বেসরকারি খাতে নতুন করে কেউ বিনিয়োগও করছেন না। এ জন্য দেশে রড ও সিমেন্ট বেচাবিক্রি একেবারে কমে গেছে।
খবরের কাগজ: বিক্রি কমে যাওয়ার কারণ কী?
এসকে মাসাদুল আলম: গত সরকার ২০২৪ সালে যখন দায়িত্ব নেয় তখন থেকে বেচাবিক্রি কমতে শুরু করে। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর দেশে এটা আরও খারাপ পর্যায়ে চলে যায়। উন্নয়ন কাজ তেমন হচ্ছে না। সরকারের উন্নয়ন কাজের মাত্র ৬৫ শতাংশ হয়েছে। বেসরকারি খাতও থমকে গেছে। এ জন্য বেচাবিক্রি একেবারে কমে গেছে। এ ব্যাপারে কেউ কিছু ভাবেন না। সবাই নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত।
খবরের কাগজ: বর্তমানে বিভিন্ন রড সিমেন্টের কারখানায় কেমন উৎপাদন হচ্ছে?
এসকে মাসাদুল আলম: চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদনও অনেক বন্ধ হয়ে গেছে। ৪০ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে অনেক ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু এটা নিয়ে কেউ ভাবে না। শুধু রড না এর সঙ্গে তার, ক্যাবল, ইলেকট্রিক, গ্লাস কারখানা জড়িত। তবে চাহিদা বাড়লে দ্রুত দাম বাড়বে।
খবরের কাগজ: চাহিদা তো অনেক কমে গেছে। দাম কেমন কমেছে?
এসকে মাসাদুল আলম: চাহিদা কমে যাওয়ায় বছরের ব্যবধানে দামও অনেক কমেছে। ৯০ থেকে ৯৮ হাজার টাকা টনের রডের দাম কমে ৭৭ থেকে ৮৪ হাজার টাকায় নেমেছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় দাম কমেছে। এভাবে দাম কমে যাওয়ায় অনেককেই লোকশান করে ব্যবসা করতে হচ্ছে। তবে যারা বড় কোম্পানি লোকশান থেকে রেহাই পেতে স্টক করে রাখছেন। তারপরও লোকশান হচ্ছে। কারণ উৎপাদন করে বিক্রি করতে না পারলে লাভের মুখ দেখা যায় না।
খবরের কাগজ: এ অবস্থার কি পরিবর্তন হবে?
এসকে মাসাদুল আলম: দেশে স্থিতিশীলতা দরকার। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব না। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর আমরা আশা করলেও বাস্তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। শঙ্কার মধ্যেই ব্যবসা করতে হচ্ছে। কেউ নতুন করে বিনিয়োগ করছেন না। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যবসা-বাণিজ্যের খারাপ অবস্থা। সবাই নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনীতি নিয়ে ভাবেন না। বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। নিম্ন আয়ের মানুষ ধার করে সংসার চালাচ্ছে। কে ক্ষমতায় যাবে তা নিয়ে সবাই ব্যস্ত। দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। আমরা যারা শিল্পে বিনিয়োগ করেছি তারা ভুক্তভোগী।
খবরের কাগজ: সরকার কি করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে?
এসকে মাসাদুল আলম: রড সিমেন্টের দর অনেক কমলেও কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম কমেনি। ডিটেইবল এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) ত্রুটির কারণে ডেভলপাররা কাজ করতে পারছে না। ডলারের কারণে উৎপাদন সক্ষমতাও কমে গেছে। কারণ ব্যাংকও আগের তুলনায় খারাপ অবস্থায়। তাই চাহিদা মতো সুবিধা দিচ্ছে না। কাঁচামালের ওপর শুল্ক বেশি। তা কমাতে হবে। সরকার তথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও ব্যাংকের নীতি সহায়তা (পলিসি সাপোর্ট) বাড়াতে হবে। দেশে স্থিতিশীলতা দরকার। এসব কার্যকর হলে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। অর্থনীতি চাঙ্গা হবে।
খবরের কাগজ: এই শিল্পে বিনিয়োগ কেমন হবে?
এসকে মাসাদুল আলম: বর্তমানে ৩০টির মতো অটো স্টিল মিল আছে। ম্যানুয়ালি রডের কারখানা আগে ৩০০-এর মতো ছিল। বর্তমানে ১৫০টির মতো আছে। সবমিলে এ শিল্পে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেন প্রায় ২ লাখ মানুষ। পরোক্ষভাবে জড়িত ২ কোটি পরিবার। কারণ দেশের গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের আনাচে-কানাচে ফেরিওয়ালা থেকে শুরু করে বন্দরের পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত সবাই এর সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত। রড যেখানে ব্যবহার হয় ইট, বালি, সিমেন্ট, থাই, গ্লাস সেখানে ব্যবহার হয়। তারাই পরোক্ষভাবে এই শিল্পে জড়িত।