ক্যাশলেস বাংলাদেশের নির্মাণ অনিবার্য। কারণ এটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াবে এবং খরচ সাশ্রয় করবে। তবে এর প্রধান বাধা হলো দুর্বল অবকাঠামো (স্মার্টফোনের ব্যবহার কম এবং দুর্বল নেটওয়ার্ক), কম আর্থিক সাক্ষরতা এবং ডিজিটাল লেনদেনের উচ্চ ব্যয়। এমন বাস্তবতায় ক্যাশলেস বাংলাদেশ বিনির্মাণে করণীয় নির্ধারণ নিয়ে খবরের কাগজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মৃত্তিকা সাহার সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এমডি ও জয়তুন বিজনেস সলিউশনসের চেয়ারম্যান আরফান আলী। তার মতে, ব্যাংকগুলোকে তাদের মুনাফার একটি অংশ উৎসর্গ করে ডিজিটাল চার্জ কমাতে বাধ্য করতে হবে এবং সরকারকেও শক্তিশালী প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের মানুষরাও এই প্রক্রিয়ার আওতায় আসে।
খবরের কাগজ: ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতি আমাদের জন্য কেন দরকার?
আরফান আলী: ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতি আমাদের জন্য অনিবার্য। এখানে আমাদের যেতেই হবে। এর অনেক কারণ আছে। প্রথমত, আর্থিক খাতের পরিবর্তন এবং পরিশোধ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দ্বিতীয়ত অর্থের সঞ্চায়ন এবং অবৈধ অর্থের লেনদেন থেকে মুক্তি পাওয়া, তৃতীয়ত আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে ত্বরান্বিত করতে হলে ডিজিটাল ছাড়া সম্ভব না। আমাদের দেশে ব্যাংকগুলোর যে ধীরগতি, তাতে সবার জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং অন্তর্ভুক্তি সম্ভব হবে না। ফলে পরিশোধ ব্যবস্থা ডিজিটালাইজেশন ছাড়া খুব বেশি কিছু অর্জন করা যাবে না। সেই অর্থে ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যই সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকও এই খাতে গুরুত্বারোপ করে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে।
খবরের কাগজ: ক্যাশলেস অর্থনীতি বাস্তবায়নে কী ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
আরফান আলী: ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতি বাস্তবায়নে আমাদের বেশ কিছু সমস্যা আছে। আমাদের অবকাঠামো এখনো সেই মাত্রায় উন্নত নয়। এখনো দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ নগদ লেনদেন করে। মানুষের অভ্যস্ততা, আর্থিক সাক্ষরতার অভাব, এবং ডিজিটাল লেনদেনে মানুষ কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে- এগুলোই বড় সমস্যা। বিশেষ করে, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর হার অত্যন্ত কম। নেটওয়ার্ক চার্জ এখনো তেমন অনুকূল না। আর একটি বড় সমস্যা হলো ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ এবং অপারেটর (এসপিএসপি) খরচ। এই খরচ কমিয়ে না আনা পর্যন্ত লোকজনের কাছে ডিজিটাল পেমেন্ট ততটা গ্রহণযোগ্য হবে না। ডিজিটাল লেনদেনকে নগদ লেনদেনের চেয়ে কম ব্যয়বহুল হতে হবে, তবেই মানুষ এটা ব্যবহার করবে।
খবরের কাগজ: আমাদের দেশে ডিজিটাল লেনদেন বাস্তবায়নে কত সময় লাগতে পারে?
আরফান আলী: আশা করা যাচ্ছে আগামী পাঁচ বছরে মোটামুটি ভালো পরিবর্তন হবে। এ সময়ে হয়তো ৬০-৭০ শতাংশ মানুষ ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত হবে। তবে পুরোপুরি ডিজিটাল হতে হয়তো পাঁচ বছরের বেশি সময় লাগবে।
খবরের কাগজ: এটার জন্য করণীয় কী হবে?
আরফান আলী: ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে আমাদের অনেক পলিসি বা নীতি তো আছেই, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব নীতি রয়েছে সেগুলোর বাস্তবায়ন বাড়াতে হবে। যেমন আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি বাস্তবায়নের অন্যতম শর্ত ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে সবার জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। কিন্তু যথাযথ উদ্যোগ ও সমন্বয়ের অভাবে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অগ্রগতি হচ্ছে না। এ ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশে দেখেছি, সরকার ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে। যদিও ডিজিটালি কেউ লেনদেন করলে তাকে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে সরকার থেকে আসেনি। তবে এগুলো থাকা উচিত, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যাতে ব্যবসা-বাণিজ্যে নগদবিহীন লেনদেন করতে অভ্যস্ত হয়।
খবরের কাগজ: দেশের ৮৫ শতাংশ মানুষই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে যুক্ত। তাদের কীভাবে ডিজিটাল অর্থনীতির আওতায় নিয়ে আসব?
আরফান আলী: এজন্য সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে বেশ কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সস্তা করে আনতে হবে এবং মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। তাহলে মানুষ নগদ লেনদেনের পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেনে এগিয়ে আসবেন। এ জন্য কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, ব্যাংকিং লেনদেনের চার্জ কমিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং সেবার মান বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকগুলোকে তাদের সামাজিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে টার্গেট অরিয়েন্টেড হয়ে গ্রামীণ বা প্রান্তিক এলাকার গ্রাহকদের সেবা দিতে বাধ্য করতে হবে। চতুর্থত, সরকার ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে পারে। পঞ্চমত, অবকাঠামো যারা তৈরি করে এবং পেমেন্টকে স্মুথ করে, সরকার তাদের সাপোর্ট করবে। অপারেটর, পিএসপি, পিএসও-দের এগিয়ে আসতে হবে। ষষ্ঠত, সরকার এ ক্ষেত্রে কিছু প্রণোদনা বা কর রেয়াতের ব্যবস্থা করতে পারে।
খবরের কাগজ: ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ডিজিটাল ব্যাংক কতটুকু কার্যকর হবে?
আরফান আলী: এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যাংক অবশ্যই সহায়ক হবে। তবে যদি সেটি এমএফএস-এর মতো উচ্চ ব্যয়ের সার্ভিস হয়, তাহলে সাধারণ লোকজনের কাছে পৌঁছাবে না। যদি অবকাঠামোর সঙ্গে ইফেক্টিভ কানেক্টিভিটি তৈরি না হয়, তাহলে এটি শহরকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দেশের ব্যাংকগুলোর উচিত ডিজিটাল লেনদেনে আরও এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু তারা সবসময় খরচের কথা বলে পিছিয়ে থাকে।
খবরের কাগজ: এ ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর কতটা কার্যকর হবে বলে মনে করেন?
আরফান আলী: বাংলা কিউআর যদি আরও বিস্তৃত করা যায়, তবে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে বলে আমার বিশ্বাস। বাংলা কিউআর-এর সঙ্গে যে চার্জ জিরো পার্টিসিপেশন, এটা করতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে তো ব্যাংকগুলোকে চার্জ নিতে নিষেধ করা হয়েছে। আমাদের দেশেও ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করতে হবে যেন ব্যাংকগুলো বাধ্যতামূলকভাবে এটি করে। বৃহত্তর সুবিধার জন্য ব্যাংকগুলোকে এই মুনাফাটুকু ত্যাগ করতে হবে। অতীতে দেখেছি, অনেক ব্যাংক বোর্ডের দোহাই দিয়ে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে খরচ করেনি। অথচ সেসব ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।