— এই সুমন, উঠ তাড়াতাড়ি। এতবার ডাকেও উঠে না ছেলে। রাতে কি চুরি করতে গিয়েছিলি নাকি?
মায়ের চিৎকার চেঁচামেচিতে কোনোমতে চোখ কচলে কচলে উঠে নিজের বিছানায় বসল সুমন। মোবাইলের ডিসপ্লে জ্বালিয়ে সময় দেখল। সকাল ৭টা ৩ মিনিট। দেখেই মাথা গরম হয়ে গেল তার। ঘুমাতে গেছে কাল রাতে সেই ২টার দিকে। তার মেজো খালামনি এসেছিল গতকাল। তাদের রাতে সিএনজি ঠিক করে দিয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত ২টা। এখন আবার সকাল সকাল ডাকাডাকি। আজ এর একটা বিহিত করতে হবে ভাবল সুমন। নিজের রুম থেকে বের হয়ে দেখল বাবা পেপার পড়ছে আর মা বসে কী একটা তরকারি কাটছে।
‘কী ব্যাপার? হয়েছে কী তোমাদের?’ চেঁচাল সুমন।
‘কী আর হবে। পরোটা নিয়ে আয়। তোর বাবা নাশতা খাবে।’ সুমনের মা নির্লিপ্ত।
— বলি আমি তো একটা মানুষ। রাতে কয়টায় ঘুমিয়েছি দেখেছ? খালামনিকে গাড়ি ঠিক করে দিয়ে এসে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত ২টা। তোমরা কি আমাকে ঠিকমতো ঘুমাতেও দেবে না?
কেউ কোনো জবাব দিল না। খালি তার বাবা পেপারটা মুখের সামনে থেকে নামিয়ে বলল, ‘পরোটা দুইপাশ ভালো করে সেকে লাল করে আনিস।’
রাগে-দুঃখে কিছু বলল না সুমন। এলাকার পরোটার দোকানে গিয়ে দেখে এই সকালেই বিশাল লাইন। এলাকার সবাইকে নুরুল হকের পরোটাই খেতে হবে, নইলে যেন কোষ্ঠ পরিষ্কার হবে না। লাইনে দাঁড়িয়ে কোনোভাবে পরোটা নিয়ে বাসায় এসে সে শুয়ে পড়ল। দেখে ঘুম পালিয়ে গেছে, সে আর আসে না। একটু পর উঠে মুখ-হাত ধুয়ে পড়তে বসে গেল। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা তার। সকাল ১০টার দিকে কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য বের হতেই তার মা বলল, ‘শোন, কোচিংয়ে যাওয়ার আগে গ্যাসের বিলটা দিয়ে আসিস।’
স্তব্ধ হয়ে গেল সুমন। ৯৯ রানে কোনো ব্যাটসম্যান ক্লিন বোল্ড হয়ে গেলে যেমনটা হয়।
— মা আমার ১১টা থেকে কোচিং। এখন আবার বিল দিতে যাব কীভাবে?
‘রিকশা করে চলে যা।’ তার বাবা পাশ থেকে বলল। এই ভদ্রলোকের ভাবসাব যেন সে ডেইলি ঘোড়ার গাড়ি করে যায়।
‘ভাইয়া শোন, এই নোটসগুলো দিবি আমার বান্ধবী শিল্পাকে।’ রুম থেকে বের হয়ে সুমনের ছোট বোন রুমী বলল।
— কোন শিল্পী-টিল্পিকে কিছু দিতে পারব না। থাপ্পড় খাইস না, সরে দাঁড়া।
— শিল্পী না তো, শিল্পা। পারবি না দিতে কেন?
সুমন তার বোনের বাক্য চয়নে অবাক হয়ে তাকাল। এই মেয়ে সামনে এসএসসি দেবে। ইদানীং কথা বলে কবিতার মতো করে। যেখানে বলার কথা, ‘কেন দিতে পারবি না?’
সে বলবে, ‘পারবি না দিতে কেন?’
— পারব না, কারণ আমি তোদের কাজের ছেলে না। পারব না কারণ সামনে আমার এইচএসসি পরীক্ষা। পারব না কারণ সকাল থেকে অলরেডি অনেক কাজ করে ফেলসি। এখন আবার বিল দিয়ে তারপর ক্লাসে যাব।
— আরে ক্লাসের পরেই হবে দিলে। এমন করিস না ভাই আমার লক্ষ্মী।
আর কিছু বলল না সুমন। নোটসগুলো নিয়ে নিল। এখানে দাঁড়িয়ে এই ভাষায় বেশিক্ষণ কথা চালালে মাথা ধরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বিল দিতে গিয়ে ক্লাসে যেতে দেরি হয়ে গেল তার। ক্লাসে ঢোকার সময় স্যার বলল, ‘বাংলার শেষ নবাবের এত দেরি। খাজনার হিসাবনিকাশ করে আসলেন নাকি জাহাপনা?’
ক্লাসের সবাই হো হো করে হেসে উঠল। এরপর ক্লাস শেষেই সে দৌড়াল তার বোনের নোটসগুলো দিতে। তার বোনের বান্ধবী শিল্পা নোটসগুলো হাতে নিয়ে ভেতরের প্যাকেটটা ভালো করে দেখে বলল, ‘উপটানের প্যাকেটটা কই?’
‘কীসের প্যাকেট?’ অবাক সুমন।
— একটা উপটানের প্যাকেট দেওয়ার কথা ছিল।
‘কোন টান ফান কিছু দেয়নি আর।’ এই বলে বাসার দিকে গেল সুমন। তখন সন্ধ্যা ৭টা হয়ে গেছে। বাসায় গিয়ে পড়তে যখন বসেছে, তখন ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে। হিসাববিজ্ঞানের অঙ্ক করতে গিয়ে দেখে ক্যালকুলেটর নেই।
— আম্মা আমার ক্যালকুলেটর কোথায়?
— ড্রয়িং রুমে সোফার আশপাশে আছে কোথাও। কালকে তোর মেজো খালামনির ছেলে কান্না করছিল, তাকে খেলতে দিয়েছি।
‘মানে কী?’ ধৈর্যের ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে গেল তার। ‘ওইটা কি খেলার জিনিস?’
সোফার নিচ থেকে ক্যালকুলেটর বের করতে যখন সোফার নিচে ঢুকেছে, তার বোন রুমী এসে বলল, ‘দেখ তো ভাইয়া, আমার একটা ক্লিপ পাচ্ছি না সেই অনেক দিন ধরে। সোফার নিচে আছে কি না?’
সোফা থেকে ক্যালকুলেটর উদ্ধার করে দেখল তার ডিসপ্লের এক পাশ ভেঙে গেছে।
— রুমী তোর সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটরটা দে তো।
‘আরে পাগল নাকি। আমার ক্যালকুলেটর অনেক দামি আর আমার একটু পরেই করতে হবে অঙ্ক।’ এই বলে রুমী তার রুমে ঢুকে গেল।
সেই ভাঙা ক্যালকুলেটর আর এতসব ঝামেলার মধ্য থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিল সুমন। পেল জিপিএ ৪.২৫। আর ওদিকে তার বোন সেবার এসএসসিতে পেল গোল্ডেন ফাইভ।
পুনশ্চ রেজাল্টের পরদিন পত্রিকাতে একটা খবর পড়ছিল সুমন। পড়ালেখায় এবারও ছেলেদের থেকে এগিয়ে মেয়েরা। এ সময় তার মা ভেতর থেকে বলল, ‘সুমন ময়লাটা একটু নিচে নামিয়ে দে, ময়লার গাড়ি আসছে।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজ জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল সুমন। আকাশটা আজ এত নীল কেন?