জীবন মানেই যুদ্ধ। আর লড়াইটা যখন নিজের সঙ্গে, তখন জয়-পরাজয়ের সমীকরণ জটিল এক ধাঁধা। ভালোবাসার ফুটবল লিওনেল মেসিকে ঠিক একই অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে দাঁড়িয়ে ৯ মাসের যুদ্ধ ঘোষণা করলেন আর্জেন্টাইন এই ফুটবল জাদুকর।
ফুটবলে হ্যামিলিওনের বাঁশিওয়ালা মেসি। তার জাদুতে ফুটবলের প্রেমে পড়েছেন অনেকে। তার অনুপ্রেরণায় অনেকে হয়েছেন ফুটবলারও। সংখ্যাটা কোটির ঘরে বললেও ভুল হবে না। তাই বাঁশিওয়ালার বেদনার সুরে কাঁদল ফুটবল বিশ্ব। আবার তার পায়ের ছন্দে নাচলও ফুটবল বিশ্ব। ‘দেশের মাটিতে এটাই আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ ম্যাচ’- এমন ঘোষণা দিয়ে গত শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) ভেনেজুয়েলার মুখোমুখি হয় মেসি। শেষটা রাঙান জোড়া গোলে, দলকে জেতান ৩-০ গোলে। এই আনন্দ ভেন্যু মনুমেন্টাল এবং গোটা বিশ্বে জাগিয়ে তোলে আনন্দের ঢেউ।
সুখের মাঝেই আর্জেন্টাইনদের হৃদয় কেঁপে ওঠে এই ভাবনায়- দেশের মাটিতে আর দেখা যাবে না মেসির নাচ। এমন ভাবনায় ডুবেন মেসিও। তাই তো চোখের জল আটকে রাখতে পারেননি। নিষ্ঠুর এই দিনে সঙ্গ পেতে মেসি মাঠে ছিলেন তার স্ত্রী এবং তিন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে। এরপর গোল আর জয়ে সবকিছুই হয়ে থাকল অবিস্মরণীয় এক চিত্র। এমনই দিনে ৯ মাসের যুদ্ধ ঘোষণায় কোটি কোটি ভক্তের মনের উৎকণ্ঠা আরও বাড়িয়ে দেন মেসি।
কাতার বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই একটি প্রশ্ন বারবার উঠছে- মেসি কি খেলবেন ২০২৬ বিশ্বকাপ। প্রশ্নটা যুক্তিসঙ্গত। কারণ পরের বিশ্বকাপে তার বয়স হবে ৩৯। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন শরীরের চেয়ে দ্রুত এগোনো নয় বরং যতদিন সম্ভব খেলা চালিয়ে যাওয়া এবং শরীর কীভাবে সাড়া দেয় তা দেখা। এখন হোম ভেন্যুতে শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার পর মেসি জানালেন, ৯ মাস এখনো অনেক সময়। অর্থাৎ আজও ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চান না তিনি। এখনো সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিলেন শরীরের ওপর।
পেশির ধারাবাহিক চোট মেসিকে প্রভাবিত করেছে, যা তার ধারাবাহিকতা নষ্ট করেছে এবং এগুলো তাকে ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত করে তুলেছে। তিনি লা আলবিসেলেস্তেদের সঙ্গে থাকতে চান, তবে কখনোই দলের ভারী নোঙরের মতো নয়। থাকতে চান, যদি নিজেকে ভালোভাবে প্রস্তুত মনে করেন। সামনের বছর, জুনে পর্দা উঠবে ২০২৬ বিশ্বকাপের। মেসি ফুটবল বিশ্বকে বাড়তি আশার মোহে ফেলতে চান না। বয়স ৩৮, সামনে ২০২৬ বিশ্বকাপে কোনো না কোনোভাবে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও তিনি স্পষ্ট করে দিলেন এই বয়সে ৯ মাস অনেক সময়।
মেসি বলেন, ‘যখন আমি ভালো অনুভব করি, তখন উপভোগ করি। আর যদি ভালো না থাকি, সত্যি বলতে খুব কষ্ট হয়, তখন বরং না থাকাই ভালো লাগে। তাই কিছু বলার নেই, সময়ই বলে দেবে। আমি যা বলছি, সবই ম্যাচ বাই ম্যাচ ভাবার ব্যাপার। ৯ মাস যেমন দ্রুত কেটে যায়, একই সঙ্গে অনেক সময়ও বটে। বছরের শেষে মায়ামির মৌসুম শেষ করব। এরপর আমার একটা প্রি-সিজন করতে হবে। তখন হাতে থাকবে ছয় মাস। তখনই দেখব শরীর কেমন থাকে।’
মনুমেন্টালের মাঠে ওলের সঙ্গে আলাপে মেসির মুখে শোনা গেল, ‘আমি এটা ভালোবাসি, খেলতে ভীষণ ভালো লাগে, চাই না এটা কখনো শেষ হোক। শেষটা কাছে চলে আসছে। তবে সেটা স্বাভাবিকভাবেই আসবে, যখন আসার কথা। ধাপে ধাপে এগোতে হবে, প্রতিদিন নিজের ভেতরে নতুন অনুভূতি খুঁজতে হবে…।’ মেসি কখনোই তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে চান না। চোটের কারণে সতর্ক থাকতে হচ্ছে তাকে। ফিফা থেকে শুরু করে স্পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলো সবাই অপেক্ষা করছে মেসির নিশ্চয়তার জন্য, কিন্তু তিনিই সেটি এড়িয়ে যাচ্ছেন।
নতুন করে যা বললেন, তা আসলে তার আগের অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি। দিন দিন, ধাপে ধাপে নিজের শরীরের অনুভূতি অনুযায়ী এগোতে চান। ৩৮ বছরে কেমন লাগছে, ৩৯-এ গিয়ে অবদান রাখতে পারবেন কি না- সেটাই মূল প্রশ্ন। যদিও আর্জেন্টিনা তাকে যেভাবেই হোক দলে রাখতে চায়। কারণ তিনি শুধু খেলোয়াড় নন, অধিনায়ক এবং প্রতীকও। মেসির খেলা থামা দেখার জন্য এখনই কেউ প্রস্তুত নন। সমর্থকরা প্রস্তুত নয়; ফুটবল বিশ্ব প্রস্তুত নয়। কারণ ভেনেজুয়েলা ম্যাচে মেসি যা দেখিয়েছেন তাতে ২০২৬ বিশ্বকাপে তার না খেলার কোনো কারণ নেই।
অনিক/নিলয়/