বর্ণ ও ভাষা। ওরা দুই ভাইবোন। একসঙ্গে খেলে। একসঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। একদিন কোথায় গেল জানো? ওই যে দূরে বড় পাহাড় দেখা যাচ্ছে, ওই পাহাড়ের টিলায় ঘুরতে গেল। সেখানে ওরা পাখির সঙ্গে খেলল, গাছের সঙ্গে খেলল, প্রজাপতির সঙ্গে খেলল। ঝরনায় নেমে সাঁতার কাটল।
তখন একটা হাতিমেঘ উড়ে যাচ্ছিল। বর্ণ ও ভাষাকে দেখে সে থামল।
হাতিমেঘ বলল, ‘আরে বর্ণ ও ভাষা, তোমরা এখানে কী করছ?’
ওরা বলল, ‘একটু ঘুরতে এলাম। সবার সঙ্গে খেলতে এলাম।’
‘তা বেশ বেশ। তোমরা তাহলে ঘুড়ে বেড়াও। আমার বাপু তাড়া আছে, আজ যাই তবে,’ এই বলে হাতিমেঘ উড়তে উড়তে চলে গেল।
এদিকে ঘুরতে ঘুরতে কখন যে রাত হয়ে গেল বুঝতেই পারল না বর্ণ ও ভাষা। এখন তো ফিরতে হবে। না হলে বাবা-মা রাগ করবে। ওরা বাড়ির পথ ধরল। তবে কী হলো বলো তো? বর্ণ বাড়িতে ফিরলেও ভাষা ফেরেনি। সে ওই বড় পাহাড়ে হারিয়ে গেছে।
ভাষাকে হারিয়ে পুরো বন এখন নীরব। কেউ কোনো কথা বলছে না। পাখির মুখে গান নেই। শিয়ালগুলো ডাকতে পারছে না। ঝরনার কুল কুল শব্দও হারিয়ে গেছে। ভোমরগুলো কেবল উড়ে বেড়ায়, গুনগুন করে না। সবার মন খুব খারাপ। সবাই খুব চিন্তিত। ভাষা ছাড়া ওরা যোগাযোগ করবে কীভাবে? এভাবে তো বেঁচে থাকা যায় না! তাহলে উপায়?
উপায় খুঁজতে সবাই গেল বর্ণের কাছে। সে মন খারাপ করে পাহাড়ের নিচে বসে আছে। পাশ দিয়ে একটা নদী বয়ে গেছে। তবে সেই স্রোতে কোনো গান নেই। বনের সবাই এসে ওর সামনে বসল। বর্ণ তাদের দেখে বুঝতে পারল কেন এসেছে। বর্ণ উঠে দাঁড়ায়। সবার আগে ভাষাকে খুঁজে বের করতে হবে। না হলে এই বনে আর গান ফিরবে না।
ও হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে গেল। এক বন থেকে আরেক বনে গেল। তবে ভাষার কোনো খোঁজ নেই।
বর্ণ মনে মনে ভাবছে, ‘অনেক তো হাঁটলাম। এবার একটু জিরিয়ে নিই।’
তখন কে যেন বলল, ‘আরে বর্ণ! আমি তো তোমাকে খুঁজছি।’
একটু চমকে ওঠে বর্ণ। এই অচেনা পাহাড়ে ওকে আবার কে চেনে!
ও ভয়ে ভয়ে ভয়ে বলল, ‘তুমি কে ভাই? আমাকে কীভাবে চেন?’
‘তোমাকে তো সবাই চেনে। বর্ণ ছাড়া পৃথিবী চলে নাকি? আর আমি হলাম ব্যাকরণ’ এই বলে সে সামনে এল।
‘ব্যাকরণ! আমি তো এই নাম আগে শুনিনি। তা তোমার কাজটা কী?’ জানতে চাইল বর্ণ।
‘আমার জন্য সবাই সুন্দর করে লিখতে পারে, কথা বলতে পারে, গান গাইতে পারে,’ বলল ব্যাকরণ।
‘কিন্তু আমাদের পাহাড়ে কেউ কথা বলছে না, গান গাইছে না,’ বর্ণ বলল।
ব্যাকরণ জানতে চাইল, ‘কেন বলো তো?’
‘আমাদের ভাষা হারিয়ে গেছে,’ উত্তর দিল বর্ণ।
ব্যাকরণ বলল, ‘ভাষা তো হারায়নি। ও আমাদের এখানে এসেছিল। ওই তো দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছে।’
বর্ণ চেয়ে দেখল, হ্যাঁ, তাই তো! ভাষা আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবার সঙ্গে খেলছে। ভাষাকে দেখে বর্ণ খুব খুশি হলো।
তার পর বর্ণ, ভাষা ও ব্যাকরণ মিলে গেল বড় পাহাড়ের টিলায়। ওদের পেয়ে পাখিরা আবার গান গাইছে, ভোমর গুনগুন করছে, ঝরনার কুলু কুলু শব্দ শোনা যাচ্ছে। মাথার ওপর দিয়ে হাতিমেঘটা হাসতে হাসতে উড়ে গেল।
তার পর থেকে বর্ণ, ভাষা ও ব্যাকরণ একসঙ্গে পুরো পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। কখনো কখনো আমাদের দেশেও আসে। এজন্যই তো আমরা এত সুন্দর করে কথা বলতে পারি, লিখতে পারি, গান গাইতে পারি।