সপ্তবিংশ পর্ব
অমিক্রনে আক্রান্ত হয়েছেন আনোয়ারা বেগম। যদি তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিয়েছেন। বুস্টার ডোজের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পর তিনি নিজেও কিছুটা নিশ্চিন্ত ছিলেন। আর আক্রান্ত হওয়ার ভয় নেই এমন একটা ধারণা তার মধ্যে ছিল। অমিক্রন তাকে নিশ্চিন্তে থাকতে দেয়নি।
মোহিনীর ভয় অন্য জায়গায়। তিনি প্রথম ধাপে স্বামীকে হারিয়েছেন। দ্বিতীয় ধাপে বাবাকে হারানোর পর তিনি ভীষণভাবে ভেঙে পড়েন। তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটা গুটিয়ে এনে হাসপাতাল নির্মাণকাজে বিশেষ করে মানুষের সেবার ব্রত নিয়ে কাজ শুরু করেন। আনোয়ারা বেগমও সেই কাজে তাকে বিশেষভাবে সহায়তা করেন। সেই কাজ করতে গিয়েই আনোয়ারা বেগম আক্রান্ত হলেন।
আনোয়ারা বেগম প্রথম দিকে ভেবেছিলেন বাসায় থেকেই চিকিৎসা করাবেন। কিন্তু শরীরের অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাওয়ায় মোহিনী তাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করান। এভারকেয়ার হাসপাতালের একদল অভিজ্ঞ চিকিৎসক তাকে দেখভাল করছেন। মোহিনী তাদের বলে দিয়েছেন, যত টাকা লাগুক তাতে কোনো সমস্যা নেই। আনোয়ারা বেগমের সেবার যেন কোনো কমতি না হয়। চিকিৎসার কোনো অবহেলা যাতে না হয়!
মোহিনী নিজেও সার্বক্ষণিক ডিউটি দিচ্ছেন হাসপাতালে। স্বামী এবং বাবাকে হারানোর পর এবার মাকে হারানোর ভয়ে অস্থির তিনি। ভয় এবং দুশ্চিন্তা তাকে পেয়ে বসে। করোনায় সবচেয়ে কাছের মানুষগুলো হারিয়ে কেমন যেন হয়ে গেছেন মোহিনী। এখন আর তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন না। তিনি বর্তমানকে ভালো রাখতে চান। বর্তমান ভালো না হলে ভবিষ্যৎ ভালো হয় না। ভালো রাখা যায় না। ভবিষ্যতের পথটা সুগম করতেই সুন্দর একটা বর্তমান দরকার।
দ্বিতীয় ঢেউয়ের নাম দেওয়া হয় ডেলটা ভেরিয়েন্ট। ভারত এবং বাংলাদেশে ডেলটা ভেরিয়েন্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হয় এবং আক্রান্ত বয়স্ক রোগীদের অনেকেই মারা যান। ফলে সারা দেশের মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ভারতের পরিস্থিতি ছিল আরও শোচনীয়। লকডাউন দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে বেশ খানিকটা সময় নেয়। তবে প্রতিটি ধাপেই চীন, আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
টানা দুই বছর বিমান চলাচল বন্ধ। পর্যটন বন্ধ। ফলে যেসব দেশ পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল, সেসব দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। শ্রীলঙ্কা এতটাই সংকটে পড়ে যে, দেশটির সরকার পতনের মুখে পড়ে। নানা চেষ্টা করেও দেশটি সংকট কাটিয়ে উঠতে পারছে না। শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক আয়ের একটা বড় অংশ আসত পর্যটন থেকে। আরেকটি অংশ ছিল প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। করোনা মহামারির কারণে পর্যটন খাত মুখথুবড়ে পড়ে। আর প্রবাসী আয়ও অনেকটা কমে যায়। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একেবারেই কমে যায়।
মোহিনী শ্রীলঙ্কার কথা ভাবতে গিয়ে বাংলাদেশের বিষয়টিও তার মাথায় আসে। তিনি মনে মনে বলেন, বাংলাদেশের ভাগ্য ভালো। প্রবাসী আয়ের ওপর খুব বেশি প্রভাব পড়েনি। আবার তৈরি পোশাক খাতও শুরুর দিকে সংকটের মুখে পড়লেও দ্রুতই সংকট কাটিয়ে ওঠে। দেশের অর্থনীতি নিয়ে মানুষের মধ্যে দুশ্চিন্তা থাকলেও তেমন অস্থিরতা নেই।
মোহিনী মনে মনে শোকরিয়া আদায় করেন এই বলে, আমাদের ওপর আল্লাহর রহমত আছে। তা না-হলে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের এমন বিপদ কাটিয়ে ওঠা রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার ছিল। কানাডা ফ্রান্সের-মতো অনেক বড় দেশই যেখানে হিমশিম খাচ্ছে; সেখানে বাংলাদেশের রিজার্ভ সন্তুষ্টির জায়গায় আছে। এটা অনেক বড় ব্যাপার।
মোহিনীকে আনমনা দেখে আনোয়ারা বেগম জানতে চাইলেন, কীরে! তোর আবার কী হলো?
হঠাৎ আনোয়ারা বেগমকে বসা দেখে মোহিনী বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। দৌড়ে তার বেডের কাছে গিয়ে বলে, মা আপনি কখন উঠলেন! এখন কি শরীরটা ভালো লাগছে! কিছু খাবেন? আনতে বলি? স্যুপ বা অন্য কিছু?
আনোয়ারা বেগম জোরে শ্বাস নিতে নিতে বললেন, আর শুয়ে থাকতে ভালো লাগছে না। শরীরের ভেতরে কেমন জানি করছে। বুকের ভেতরটাও ধরফর করছে।
শ্বাস কষ্ট হচ্ছে নাকি! মা, অক্সিজেন দিতে বলব?
আমার মনে হয় শ্বাস নিতেই সমস্যা হচ্ছে। মানে শ্বাস নেওয়ার সময় একটা কষ্ট অনুভব করছি।
মোহিনী দৌড়ে দরজা খুলে চিৎকার দিয়ে নার্স ডাকে। কে আছেন, তাড়াতাড়ি আসেন। অক্সিজেন দিতে হবে মাকে!
দুজন নার্স দৌড়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মোহিনীকে উদ্দেশ করে বলল, আপনি ডেকেছেন? ম্যামকে অক্সিজেন দিতে হবে?
আনমনা হয়ে যান মোহিনী। নানা নেতিবাচক ভাবনা তার মাথায় ঘুরপাক খায়। তিনি উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তিনি কথার জবাব দিতে গিয়েও দিতে পারছেন না। একজন নার্স মোহিনীকে সরিয়ে রুমের ভেতরে ঢোকে। তার পর আনোয়ারা বেগমের কাছে জানতে চায়, আপনার কি শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে?
আনোয়ারা বেগম খুব ধীরস্থির ভঙ্গিতে বললেন, সে রকমই লাগছে। দেখেন না অক্সিজেন মাস্কটা লাগিয়ে! আমার মনে হয় শ্বাস টানতে কষ্ট হচ্ছে।
নার্স দেরি করল না। একজন আনোয়ারা বেগমকে শুইয়ে দিল। আরেকজন অক্সিজেন মাস্ক মুখে পরিয়ে দিয়ে বলল, এবার শ্বাস নিন তো! কোনোরকম কষ্ট হলে বলবেন।
মোহিনী এতক্ষণ বিস্ময়ের সঙ্গে আনোয়ারা বেগমকে দেখছিলেন। অক্সিজেন মাস্ক লাগানোর পর তিনি আনোয়ারা বেগমের মাথার কাছে চেয়ার টেনে বসলেন। নরম গলায় বললেন, মা কেমন লাগছে এখন? শ্বাস টানতে পারছেন তো?
আনোয়ারা বেগম মাথা নেড়ে সায় দিলেন। মোহিনীর অস্থির মন কিছুটা শান্ত হলো। তবে তার বুকের মধ্যে ধরফরানি চলছেই।
আনোয়ারা বেগমের অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। সারাক্ষণ তাকে অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে রাখতে হচ্ছে। শরীরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিছুই খেতে পারেন না। তাকে চব্বিশ ঘণ্টা স্যালাইন দিতে হচ্ছে। তার অবস্থার অবনতি দেখে চিকিৎসক দল তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করতে বলেছেন। এতে মোহিনী আরও বেশি ভেঙে পড়েন। তিনি চিকিৎসক দলকে বলেছেন, মাকে বাঁচানোর জন্য যদি বিদেশেও নিতে হয় তাহলে ব্যবস্থা রাখুন। আমি কোনো রকম ঝুঁকি নিতে চাই না। মাকে বাঁচাতেই হবে।
চলবে...
আরও পড়তে ক্লিক করুন-
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭, পর্ব-১৮, পর্ব-১৯, পর্ব-২০, পর্ব-২১, পর্ব-২২, পর্ব-২৩, পর্ব-২৪,