এবারের বইমেলা একটু ভিন্ন রকম। আগে বাংলা একাডেমি চত্বরে বইমেলা হতো। একাডেমি চত্বরে মানুষ ধারণক্ষমতা কম থাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলা প্রসারিত করা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনার প্রভাব বইমেলায় পড়েছে। সে কারণেই এবারের বইমেলা একটু ভিন্ন ধরনের হচ্ছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রকাশকরা বেশি বই প্রকাশ করতে আগ্রহী নন।
কবিতা ভিন্ন রকমের এক শিল্প। পাঠক সহজেই গদ্য পড়ে যেতে পারেন। কিন্তু কবিতা পড়াটা তেমন নয়। শিল্পের মধ্যে সবচেয়ে সুচারু রূপ হলো কবিতা। কবিতা পড়তে গেলে একটু অন্য রকম করে পড়তে হয়। মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব, দর্শন ও বিজ্ঞানের আবিষ্কার কবিদের সংবেদনশীল মনে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে। সেই বিষয় বা দর্শনগুলো কবিরা সারাংশ আকারে কবিতায় তুলে ধরেন। অল্প জায়গার মধ্যে কবিতায় দর্শন ফুটিয়ে তুলতে হয়। গো-পদে আকাশ দেখার মতো। বর্ষাকালে গরু চলার সময় মাটিতে যে ছাপ পড়ে সেখানে পানি জমে থাকে। বৃষ্টি থেমে গেলে একটু আলোয় সেই গর্তের পানিতে আকাশ দেখা যায়। অর্থাৎ ছোট একটা জায়গায় বড় আকাশটা দেখা। কবিতা ঠিক তেমনই। সবাই কিন্তু কবিতার পাঠক নয়। সবাই বলে, তারা কবিতা বুঝতে চায়। কবিতা বোঝার কিছু নেই। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, কবিতা বোঝার ব্যাপার না। কবিতা মানুষের ভেতরে কোনো তরঙ্গ তোলে কি না, সেটা দেখার বিষয়। কবিতা যেহেতু সাহিত্যের বিশেষায়িত ধরন, সেখানে সবাই কবিতা বুঝে উঠতে পারে না। কবিতা সব সময় কম পাঠক পড়ে থাকেন।
লেখককে কখনো কোনো প্রকাশক বড় করে তুলতে পারেন না। কবি ও লেখকরা নিজের আত্মাকে উন্মুক্ত করে দেওয়ার জন্য লেখালেখি করেন। প্রকাশক তাদের বই প্রকাশ করতে পছন্দ করেন, যাদের বই বাজারে চলে। বুর্জোয়া ডেভেলপমেন্টের জায়গা থেকে প্রকাশকরা সাহিত্যে বিনিয়োগ করতে চান না। প্রকাশকরা লেখককে লেখানোর ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। প্রকাশকরা মূলত ব্যবসায়ী। তারা ব্যবসা ছাড়া অন্য কোনো কিছু চিন্তা করতে পারেন না। যেমন, হুমায়ূন আহমেদের বই প্রকাশ করতে সব প্রকাশক আগ্রহী থাকেন। কারণ সেখানে ব্যবসা আছে। অথচ নতুন কোনো কবি বা লেখকের বই তারা প্রকাশ করতে চান না।
কবিদের একটা বড় অংশ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে জড়িত ছিলেন। আমি জানি না, কবি ও লেখকরা কীভাবে একটি সরকারের তোষামোদি বা সহযোগিতা করতে পারেন। কোনো সরকার বা শাসক কোনো সময়ই কবিকে পাত্তা দেয় না। কবি বা সৃজনশীল মানুষ সরকারের জন্য বড় ঝামেলার বিষয়। কারণ রাষ্ট্র এমন একটা মেশিনারি, যা একজন সংবেদনশীল মানুষকে বিকশিত হওয়ার জন্য যে পরিবেশ দরকার তা দেয় না।
আমাদের দেশে বিপ্লবী লেখকের খুব অভাব। এ দেশের লেখকদের বড় রকমের কোনো আত্মত্যাগ নেই। দেশের বেশির ভাগ বুদ্ধিজীবীই আগের সরকারের তোষামোদি করেছে। কোনো সরকার বা শাসকের প্রতিনিধিত্ব করা কবি ও লেখকের কাজ নয়। লেখকরা সব সময় প্রতিবাদী হন। লেখকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংঘর্ষ অনিবার্য।
লেখক: কবি
অনুলিখন: সানজিদ সকাল