কচ কচ। মচ মচ। ভয় পেল মা দোয়েল। শব্দ ধীরে ধীরে কাছে আসছে। এদিক-ওদিক তাকাল। কেউ নেই। বুকে থুথু ছিটাল। ভয় কাটানোর জন্য।
কিছুক্ষণ পর। হিস হিস। ফোঁস ফোঁস। আঁতকে উঠল মা দোয়েল। ভয়ে শরীর হিম। সাপ আসছে না তো। বাসায় কয়েকদিনের আগের দুটি ডিম। কীভাবে রক্ষা করবে! ভেবে অস্থির! মা দোয়েলের বুক ফেটে কান্না আসার উপক্রম। বাবা দোয়েল গেছে খাবারের খোঁজে। অনেকক্ষণ হয়ে গেল। ভয়ে ঘেমে একাকার। কপাল মুছল মা দোয়েল।
গত মাসে প্রথম ডিম পেড়েছিল। কিন্তু সন্তানের মুখ দেখতে পায়নি। খেয়ে ফেলেছিল দুষ্টু সাপ। মা দোয়েল কাঁদল গড়াগড়ি করে। বাবা দোয়েল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। শালিক এসে বোঝাল। চড়ুই চোখের জল মুছে দিল। ডিম হারানোর শোকে বাসা ছাড়ল দোয়েল দম্পতি। নতুন বাসা গড়ল মহল্লার কাছাকাছি। বরই গাছে। কাঁটাযুক্ত। যেন কেউ না আসতে পারে।
বাবা দোয়েল ফিরেছে। মা দোয়েল খুশিতে ডগমগ। ভয় কেটে গেছে। ভয়ানক শব্দগুলোও আর শোনা যাচ্ছে না। মা দোয়েল ভয়ের কথা জানাল। বাবা দোয়েল বলল, ভয় পেও না। এখানে কেউ আসবে না। এবার আমরা সন্তানের মুখ দেখতে পাব।
বেশ কয়েকদিন পর। চিঁচিঁ শব্দ। দোয়েলের বাসায়। তুলতুলে দুটি ছানা। চোখ ফুটেনি। মা ও বাবা দোয়েল মহাখুশি! বাবা দোয়েল গান ধরল। মা দোয়েল মুচকি হাসল। মা দোয়েল ছানাদের আদর করে। যত্ন করে। বুকে জড়িয়ে রাখে। বাবা দোয়েল খাবার আনে। হাসি-খুশিতে ভরপুর বাসা।
মখমলে পালক গজাচ্ছে ছানাদের। চোখ মেলতে শুরু করেছে। মায়ের ডানাদের নিচ থেকে বের হয়। বাসার চারপাশে ঘুরে। মা দোয়েল চোখে-চোখে রাখে। সাবধান করে বাচ্চাদের। বাবা দোয়েল আসলে ঠোঁটে ঠোঁট গুজে। আরামসে চোখ বন্ধ করে খাবার খায়।
একদিন বিকেলে বাবা দোয়েল ছানাদের নিয়ে রইল। মা দোয়েল গেল খাবারের খোঁজে। উড়তে উড়তে মা দোয়েল ভাবল, আজ ছানাদের জন্য কিছু সরিষা দানা খুঁজবে। কিন্তু এখন অসময়। মাঠে সরিষা নেই। কৃষকরা ঘরে তুলেছে। তাই মা দোয়েল এক কৃষকের বাড়ি গেল। এদিক-ওদিক চেয়ে দেখল। আশপাশে কেউ নেই। উড়ে গিয়ে বসল রান্না ঘরের পাশে। যেখানে মাটির একটা ছোট্ট গোলা। এর আগেও এই গোলা হতে সরিষা দানা নিয়ে গেছিল।
এবারও সে গোলার ওপর গিয়ে বসল। গলা বাড়িয়ে দুই ঠোকর নিল। পরের ঠোকর দিতেই কোথা হতে একটা পাজি বেড়াল পড়ল ঝাঁপিয়ে। মা দোয়েল পালাতে গিয়ে পড়ল চুলার ভেতর। চুলায় ছিল কাঠ পোড়া দগদগে আগুন। ছটফট করতে লাগল সেখানে। মা দোয়েলের ডানার ছটফটানিতে দৌড়ে এল কৃষকের বউ। চুলা থেকে তুলল মা দোয়েলকে।
ততক্ষণে পায়ের আঙুল ও ডানার কিছু পালক পুড়ে গেছে। কৃষকের বউ তাড়াতাড়ি করে তেল হলুদ মিশিয়ে বসাল। মা দোয়েল কাতরাচ্ছে। ডানায় শক্তি পাচ্ছে না। দাঁড়াতে পারছে না। পায়ের নখগুলো পুড়ে গেছে। পড়ে আছে বারান্দায়। ছানাদের কথা খুব মনে পড়ল। ডুকরে ওঠল বুকের ভেতর।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। বাবা দোয়েল ছানাদের নিয়ে অস্থির। চিন্তায় পড়ে গেল বাবা দোয়েল। নিশ্চয় কোনো বিপদ হয়েছে মায়ের। ভাবতে থাকে বাবা দোয়েল। রাত নেমে এল। মা দোয়েলের আসার নাম নেই। ছানাদের খিদে পেয়েছিল। খাবার না পেয়ে কিছুক্ষণ কুঁই কুঁই করে কেঁদেছিল। এখন ঘুমিয়ে পড়েছে। বাবা দোয়েলের সারা রাত ঘুম এল না। ছটফট করে কাটল রাত। ভোরের আলো ফুটেছে। ছানারা এখনো ঘুমে। বাবা দোয়েল উড়াল দিল আকাশে। কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক খুঁজল। কোথাও নেই মা দোয়েল। বাবা দোয়েল অঝরে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরল। ছানারা জেগেছে। বাবা দোয়েল কয়েকটা পোকা এনেছিল। সেগুলো খাইয়ে দিল ছানাদের। তারপর ডানার নিচে নিয়ে বসে থাকল।
কিছুক্ষণ পর, আবার ছানারা ঘুমিয়ে পড়ল। বাবা দোয়েল এবার মহল্লায় গেল। কয়েকটা বাড়ি খুঁজল। মা দোয়েলের দেখা নেই। বেশি সময় নিয়ে খুঁজতেও পারছে না। ছানাদের জন্য। মন খারাপ করে বাসায় ফিরছিল বাবা দোয়েল। হঠাৎ নিচের দিকে লক্ষ করল। একটা ঘরের চালার ওপর গুটিশুটি হয়ে পড়ে আছে মা দোয়েল। দেখে বাবা দোয়েলের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। নিচে নেমে কাছে গেল। চমকে উঠল বাবা দোয়েল। বাবা দোয়েলকে দেখে, মা দোয়েল পিটপিট করে তাকাল। কাতর কণ্ঠে বলল, তুমি এসেছ। ছানাদের দেখে রেখ। তারপর একটু-আধটু পুড়ে যাওয়ার ঘটনাও বলল।
বাবা দোয়েল ভেজা চোখে বাসায় ফিরল। ছানাদের খাওয়াল। একটু দূরে ছোট্ট একটা বটগাছ। সেখানে বাবা দোয়েল ছুটে গেল। সেখানে এক কাকের বাসা। খাবার খুঁজতে গিয়ে পরিচয়। বাবা দোয়েল, কাককে মা দোয়েলের বিপদের কথা বলল। কাক শুনে, বাবা দোয়েলের সঙ্গে কৃষকের বাড়িতে গেল। কাক, মা দোয়েলের ডানা ধরে নিয়ে এল বাসায়। বাবা দোয়েল, কাকের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল।
মা দোয়েলকে পেয়ে ছানারা খুশি হলো। বাবা দোয়েল খাবারের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল। খাবার এনে তিনজনকে খাইয়ে দিল। এভাবে বাবা দোয়েল প্রতিদিন খাবার আনে। খাইয়ে দেয়। বাবা দোয়েলের সেবায় মা দোয়েল ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগল।
মেহেদী