কনকনে শীতের সকাল। জানালার বাইরে কুয়াশার চাদর। কিন্তু তিতুর মনে আজ দারুণ উত্তেজনা। সে ড্রয়িং খাতা আর রং পেনসিল নিয়ে বসেছে। কাল ১৬ ডিসেম্বর। স্কুলের আর্ট প্রতিযোগিতায় তাকে আঁকতে হবে ‘আমার দেশ’।
তিতু সবুজ রং দিয়ে একটা বড় আয়তক্ষেত্র আঁকল। তার মাঝখানে টকটকে লাল একটা গোল বৃত্ত দিল। কিন্তু সমস্যা হলো, বৃত্তটা কিছুতেই গোল হচ্ছে না। তিতু মুখ গোমড়া করে বসে রইল।
এমন সময় দাদু ঘরে ঢুকলেন। হাতে গরম চায়ের কাপ। তিতুকে দেখে বললেন, ‘কী দাদুভাই, মুখটা এমন মেঘলা কেন? আকাশে তো আজ রোদ উঠেছে।’
তিতু বলল, ‘দাদু, দেখো না, পতাকার সূর্যটা কিছুতেই গোল হচ্ছে না।’
দাদু মুচকি হেসে বললেন, ‘আরে বোকা, এই লাল বৃত্তটা শুধু একটা গোল্লা নয়। এটা আমাদের সাহসের সূর্য। এসো, তোমাকে একটা জাদুর গল্প বলি। তাহলেই দেখবে ছবি আঁকা সহজ হয়ে গেছে।’
তিতুর ছোট বোন তিন্নিও দৌড়ে এল, ‘গল্প? আমিও শুনব।’
দাদু দুজনকে দুই পাশে বসিয়ে শুরু করলেন, ‘অনেক দিন আগের কথা। সালটা ১৯৭১। আমাদের এই দেশটা তখন শত্রুদের দখলে ছিল। ওরা আমাদের নিজের ভাষায় কথা বলতে দিত না, গান গাইতে দিত না। ওরা চেয়েছিল আমাদের সুন্দর দেশটাকে ধ্বংস করে দিতে।’
তিন্নি চোখ বড় বড় করে বলল, ‘তারপর? তোমরা ভয় পাওনি দাদু?’
দাদু হাসলেন, ‘ভয়? বাঙালিরা কি ভয় পায়? আমরা হলাম বীরের জাতি। গ্রামের কৃষক, শহরের ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক- সবাই মিলে এক হলাম। আমাদের হাতে তখন অস্ত্র কম, কিন্তু বুকে অনেক সাহস। আমরা বন-জঙ্গল, নদী-নালায় লুকিয়ে শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তাম। আমাদের সেই দলের নাম ছিল মুক্তিযোদ্ধা।’
তিতু অবাক হয়ে বলল, ‘তুমিও তো মুক্তিযোদ্ধা, তাই না দাদু?’
‘হ্যাঁ দাদুভাই। ৯ মাস আমরা যুদ্ধ করলাম। অবশেষে ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে শত্রুরা আমাদের কাছে হার মানল। বিকেলের পড়ন্ত রোদে আমরা সবাই মিলে উড়ালাম আমাদের এই লাল-সবুজের পতাকা। চারদিকে আনন্দ! তাই, এই লাল রঙের মধ্যে মিশে আছে আমাদের হাজারো ভাইয়ের বুকের রক্ত আর ভালোবাসা। আর ওই যে সবুজ রং, ওটাতে আছে আমাদের এই সুন্দর প্রকৃতি।’
গল্পটা শুনতে শুনতে তিতুর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। সে মনে মনে ভাবল, এই পতাকাটা সাধারণ কোনো ছবি নয়, এটা তো দাদুর সাহসের গল্প।
তিতু আবার রং পেনসিল হাতে নিল। এবার খুব যত্ন করে, বুকের সবটুকু ভালোবাসা মিশিয়ে সে লাল বৃত্তটা আঁকল। আশ্চর্য! এবার বৃত্তটা একদম নিখুঁত গোল হলো।
পরদিন সকালে স্কুলের মাঠে তিতু তার আঁকা ছবিটা উঁচু করে ধরল। বিজয়ের রোদে সেই লাল-সবুজ রং যেন চিকচিক করে উঠল। এরপর স্কুলের সবাই মিলে চিৎকার করে উঠল, ‘শুভ জন্মদিন, বাংলাদেশ।’