ঢাকা ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

স্বাদে-গুণে ভরা পানিতাল

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৪, ১২:৫৩ পিএম
স্বাদে-গুণে ভরা পানিতাল
পানিতাল কাটছেন বিক্রেতা। ছবি: খবরের কাগজ

আর কয়েক দিন পরই বিদায় নেবে বৈশাখ মাস। দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে জ্যৈষ্ঠ। এরই মধ্যে ডালি সাজিয়ে গ্রীষ্মকালীন নানা ধরনের ফল উঠতে শুরু করেছে বাজারে। খরতাপের কারণে গ্রীষ্মকাল অনেকের পছন্দ না হলেও এই সময়ের রসালো ফল পছন্দ নয় এমন মানুষ পাওয়া ভার। কিছুদিন ধরেই বাজারে দেখা মিলছে স্বাদে ও দর্শনে লোভনীয় ফল পানিতালের। এলাকাভেদে অনেকের কাছে এটি তালের শাঁস হিসেবে পরিচিত।

ভ্যানের মধ্যে নিয়ে গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে হালকা সবুজ ও কালো রঙের মিশেলে কাঁদি কাঁদি কচি তাল। ভ্যানকে ঘিরে ভিড় করছেন গরমে কাহিল ও ক্লান্ত পথচারী। ক্রেতা এলেই হাতে থাকা দা দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে খোসা কেটে ছাড়াচ্ছেন বিক্রেতা। প্রতিটি কোপের সঙ্গে বের হয়ে আসছে পানিতে ভরা স্বচ্ছ শাঁস। প্রতি কামড়ে মিষ্টি পানি ও তুলতুলে শাঁস ক্লান্তি দূর করছে মানুষের।

মৌসুমে খুব কম সময় ধরে পাওয়া যায় এই পানিতাল। বৈশাখ মাস এলেই কৃষকের কাছ থেকে চুক্তিতে তালগাছ কিনে নেন ব্যবসায়ীরা। তারপর বৈশাখ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাসের অর্ধেক পর্যন্ত মাত্র দেড় মাস চলে পানিতাল বিক্রির কাজ। খেতে অনেকটা নারকেলের শাঁসের মতো এই ফলকে বিভিন্ন মানুষ চেনে বিভিন্ন নামে। কেউ ডাকে পানিতাল, কেউ ডাকে তালের শাঁস, কেউ বলে তালের চোখ, কেউ আষাঢ়ী আবার কেউ তালের বিচি। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, স্বাদু এই ফল পছন্দের তালিকায় রয়েছে সবারই।

বাংলাদেশে খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় তালের ব্যাপক চাষ হয়। গতকাল কারওয়ান বাজারে পানিতাল বিক্রেতা জসীম উদ্দিনের সঙ্গে কথা হলো। তিনি খবরের কাগজকে জানান, কচি অবস্থায় সংগ্রহ করে এসব তাল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। সাইজ অনুযায়ী গাছভিত্তিক প্রতিটি তাল ৫ থেকে ১০ টাকা দামে কাঁদি ধরে কেনা হয়। কোনো কাঁদিতে ১৫টি আবার কোনো কাঁদিতে ১০টি, কোনো কাঁদিতে থাকে ৬টি বা কোনোটায় ৪টি করে থাকে পানিতাল। এখান থেকে পাইকারিভাবে সাইজ অনুযায়ী প্রতিটি তাল বিক্রি করা হয় ১৬ থেকে ২২ টাকা পর্যন্ত।

মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে পানিতালের ভ্যানের চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় বিভিন্ন বয়সী নারী ও পুরুষ ক্রেতাদের। বিক্রেতা শহীদ জানান, কারওয়ান বাজারের আড়ত থেকে প্রতি পিস তাল তার কেনা পড়েছে ১৮ টাকা। তিনি প্রতি পিস শাঁস বিক্রি করছেন ১০ টাকা করে। এক-একটি তালে শাঁস থাকে দুই বা তিনটি। চাহিদা থাকায় গত দুই দিনে ৩০০টিরও বেশি পিস পানিতাল বিক্রি করেছেন তিনি।

খেতে সুস্বাদু শুধু নয়, পানিতালে রয়েছে অনেক উপকারী গুণ। এতে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ফাইবার, ভিটামিন এ, বি ও সি, জিংক, পটাশিয়াম, আয়রন, ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান থাকে। স্বাদে ভরা মৌসুমি এ ফল শুধু মানুষের ক্লান্তিই দূর করে না, পূরণ করে নানা রকম পুষ্টি চাহিদাও। 

নাগলিঙ্গম ফুলের শোভা

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১০:০৫ এএম
নাগলিঙ্গম ফুলের শোভা
ঢাকার জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে মে মাসে ফোটা নাগলিঙ্গম ফুল। ছবি: লেখক

ঢাকা শহরের অনেক উদ্যানে এখন নাগলিঙ্গম ফুলের প্রাচুর্য আর স্ফুরণ চলছে। অপরূপ ব্যতিক্রমী চেহারার এ ফুলের দিকে চোখ পড়লে যে-কেউ তার রূপে মজে যায়। কেননা, এ গাছের নাম ও ফুল দুটোই অন্যরকম। একসময় নাগলিঙ্গম গাছ ঢাকায় ছিল দুষ্প্রাপ্য, এখন বহু জায়গায় এ গাছ দেখা যায়। 

প্রায় ২০ বছর আগে ভাওয়াল রাজবাড়ীতে এক অদ্ভুত ও অচিন গাছ আছে শুনে তা দেখার জন্য ছুটে গিয়েছিলাম। সেখানেই প্রথম দেখা মিলে নাগলিঙ্গম গাছের। এরপর আরও কত জায়গায় যে তাকে দেখেছি! নাগলিঙ্গম গাছের জন্ম দক্ষিণ ক্যারিবীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশ। সেখান থেকে কয়েক হাজার বছর আগে এই গাছ এসেছে আমাদের অঞ্চলে। ভারতবর্ষে এই গাছ প্রায় তিন হাজার বছর ধরে জন্মাচ্ছে। চেন্নাই জাতীয় জাদুঘর চত্বরেও দেখেছি একটি বিশাল গাছ। তার ফলগুলো যেন আমাদের দেশের গাছগুলোর ফলের চেয়ে বড়। 

নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা ১৯৬৫ সালে ঢাকা শহরে হেয়ার রোড ও মিন্টো রোডের সংযোগস্থলে পাকুড় গাছের পাশে যে নাগলিঙ্গম গাছটি দেখেছিলেন, সেটি কাটা পড়েছে বহু আগেই। অবশ্য তেজগাঁওয়ের কৃষি কলেজের (বর্তমান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) গাছগুলো এখনো আছে। রমনা উদ্যানের মধ্যে কয়েকটি নাগলিঙ্গম গাছ রয়েছে। ফুল ফোটার সময় সে গাছগুলোর কাছে গেলে অদ্ভুত একটা ঘ্রাণ নাকে আসে। এরপর গাছের তলায় চোখ পড়লে আঁতকে উঠতে হয়! এত ফুল রোজ ঝরে পড়ে! তলাটায় কোনো ঘাস আর মাটি দেখা যায় না, পুরোটাই ঢাকা থাকে ঝরে পড়া নাগলিঙ্গম ফুলে।

একটি বড় নাগলিঙ্গম গাছে রোজ প্রায় ১০০০টি ফুল ফোটে। এ দেশে ঢাকায় রমনা পার্ক, জাতীয় ঈদগাহ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্জন হলের সামনের উদ্যান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, নটর ডেম কলেজ, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ক্যান্টনমেন্ট ইত্যাদি বহু জায়গায় এ গাছ রয়েছে। তবে ঠিক কী কারণ জানি না, বিভিন্ন স্থানে ও বিভিন্ন ঋতুতে ফুলের পাপড়ির রং দেখেছি ভিন্ন হতে। অন্তত তিন রঙের ফুল আমার চোখে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর তরুণ গাছের ফুলের রং গাঢ় মেরুন, রমনা উদ্যানে ফোটা ফুলের রং লাল ও অন্যটার গোলাপি লাল বা ফিকে গোলাপি। জাতের তফাতও হতে পারে। আবার ফোটার পর সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রঙের বদলও হয় কি না, তাও জানি না।

নাগলিঙ্গম ফল দেখতে কামানের গোলার মতো গোল ও বড়। পাকার পর শক্ত খোসার ফলগুলো গাছ থেকে ঝরে মাটিতে পড়লে বেশ শব্দ হয়। এ জন্য এ গাছের নাম রাখা হয়েছে ক্যাননবল ট্রি, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Couroupita guianensis ও গোত্র লেচিথিডেসি। গাছ প্রায় চিরসবুজ ও অনেক বছর বাঁচে। কাণ্ড সরল, ঊর্ধ্বমুখী, বহু ডালপালায় ছায়াঘন। পাতা দীর্ঘ, চওড়া। পাতার গোড়া থেকে আগার দিক বেশি চওড়া, অগ্রভাগ ভোঁতা। কচিপাতা ম্লান সবুজ, বয়স্ক পাতা গাঢ় সবুজ। বছরে গাছে কয়েকবার পাতা ঝরে ও নতুন পাতা গজায়, তেমনি ফুলও ফোটে কয়েক দফায়। ফুল ফোটে কাণ্ডের গা থেকে। অজস্র ঝুলন্ত মঞ্জরিতে অনেক ফুল ফোটে। লালচে মেরুন রঙের ফুলগুলো দেখতে বেশ সুন্দর, সুগন্ধও আছে। ফুল দেখতে অনেকটা সাপের ফণার মতো, তাই এ গাছের বাংলা নাম রাখা হয়েছে নাগলিঙ্গম, ওটা ওর সংস্কৃত নাম। 

ফুল ফুটলে মৌমাছিরা সেসব ফুলে আসে ও পরাগায়ণ ঘটে। ফল পাকলে তা গাছ থেকে ঝরে মাটিতে পড়ে ফেটে গিয়ে তা থেকে দুর্গন্ধ ছোটে। বন্য প্রাণীরা সেই গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ছুটে আসে ও ফল খেয়ে চলে যায়। খাওয়ার পর সেসব প্রাণীর পেটের ভেতরে থাকে নাগলিঙ্গম ফলের বীজ। বিষ্ঠা ত্যাগ করার পর সেসব বীজ তখন মাটিতে পড়ে ও অনুকূল পরিবেশ পায়, তখন সেখানে গাছ গজায়। এখন কেউ কেউ বিভিন্ন পার্ক বা উদ্যানে এই শোভাময়ী গাছটি লাগাচ্ছেন। তবে রাস্তার ধারে একে কোনোভাবেই লাগানো যাবে না। কেউ যদি ফল ধরা অবস্থায় এ গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই ফল মাথায় পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই উচিত হবে এ গাছের তলায় গেলে একটা চোখ অন্তত গাছের দিকে রাখা।

কাস্তেচরার চীন অভিযান

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৪, ১১:১২ এএম
কাস্তেচরার চীন অভিযান
ছবি: লেখক

পাখিপ্রেমীদের জন্য সুখবর। বাংলাদেশে খয়রা-কাস্তেচরার সংখ্যা বাড়ছে। দুই দশক আগে এর সংখ্যাটা শূন্য ছিল, এখন কয়েক হাজার হয়েছে। আরও তাজা খবর হলো, সুদর্শন এই পাখি এবার হাজির হয়েছে হাইনান দ্বীপে। গত দুই সপ্তাহ ধরে চীনের স্বশাসিত এই দ্বীপে প্রথমবারের মতো খয়রা-কাস্তেচরার দেখা মিলেছে। 

গত ১১ মে বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবসে হাইনানবাসীরা পেয়েছেন কাস্তেচরার চমকপ্রদ এ উপহার। তবে চীনে পাখি-দর্শকের চেয়ে পাখি-ভক্ষকের সংখ্যা বেশি। তাই হাইনান-প্রশাসক নবাগত এই পাখির জন্য ‘প্রথম-স্তরের নিরাপত্তা’ ঘোষণা করেছেন। বিশ্বে আর কোথাও খয়রা-কাস্তেচরার জন্য কখনো এই ঘোষণা দেওয়া হয়নি। 

বিশ্বে খয়রা-কাস্তেচরার প্রসার ঘটছে গত তিন শতাব্দী ধরে। তার আগে সম্ভবত এর নিবাস ছিল একমাত্র আফ্রিকা মহাদেশে। এ পাখি ইউরোপ মহাদেশের পর্তুগাল, স্পেন ও ফ্রান্সে বাস করছে গত ২০০ বছর ধরে এবং ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও ইউরোপের শীতল উত্তরাঞ্চলে এর বিস্তৃতি ঘটেছে মাত্র ১৫ বছর আগে। 

আটলান্টিক মহাসাগর পার হয়ে খয়রা-কাস্তেচরা আমেরিকা গেছে মাত্র ১০০ বছর আগে। এই এক শ বছরে আমেরিকা মহাদেশদ্বয়ের পূর্ব উপকূল বরাবর এর বসতি দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে এবং ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ পাখির বাড়বাড়ন্ত ঘটেছে সবচেয়ে বেশি।

অস্ট্রেলিয়ায় এ পাখি বাসা বাঁধছে ১৯৩০ থেকে। সম্ভবত তার আগেই এরা পশ্চিম ভারতে স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছিল। শীতে বাংলাদেশেও এর আগমন ঘটত। কিন্তু বিশ শতকের শেষ দিকে এ দেশে এ পাখি আর দেখা যায়নি। গত দুই দশক ধরে আবার এদের দেখা মিলছে এবং সংখ্যাবৃদ্ধিও হচ্ছে। এই দুর্দিনে খুব কম পাখিই এভাবে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে ও ছয়টি মহাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছে। 

খয়রা-কাস্তেচরার এই সাফল্যের কারণ কী! প্রথম কারণ, এর আহারে বাছবিচার কম। পোকামাকড়, শামুক-ঝিনুক, কাঁকড়া-বিছা, সাপ-ব্যাঙ, কেঁচো-জোঁক সবই আছে তার খাবারের তালিকায়। আবার কাদায় আটকে থাকা বীজ-দানা খেতেও আপত্তি নেই। দ্বিতীয় কারণ, চরম যাযাবর এই পাখির ছানারা বাসা ছেড়ে যাওয়ার পরই দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। কৃষ্ণসাগর এলাকায় রিং লাগিয়ে দেওয়া একটি ছানাকে সাহারা মরুভূমি পার হয়ে পূর্ব-আফ্রিকায় চলে যেতে দেখা গেছে। 

অনেকে অনুমান করেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পোকামাকড়, কাঁকড়া-বিছা ইত্যাদির বাড়বাড়ন্ত হওয়ায় খয়রা-কাস্তেচরার মতো পাখিদের প্রসার ঘটছে। আমরা অনুমান করি যে সুদর্শন, সৌম্য ও প্রসন্ন এ পাখিটির জন্য মানুষের ভালোবাসাও এর সাফল্যের পিছনে রয়েছে। অভিজাত এই পাখির পশমি-খয়েরি মাথা ও গলা, উজ্জ্বল তামাটে ও ধাতব সবুজ ডানা এবং সজল কালো চোখ সহজেই লোকের দৃষ্টি কাড়ে।

মানুষের আহার্য হিসেবে এ পাখি যে বেশি আকর্ষণীয় নয়, সে কথাটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আকারে বিশাল হলেও এর গায়ে মাংস খুবই কম। লম্বা পায়ের আঙুল থেকে দীর্ঘ চঞ্চুর প্রান্ত পর্যন্ত মাপলে পাখিটি দুই ফুট লম্বা; কিন্তু ওজন মাত্র আধা কেজি। পলকা দেহের এই পাখি তাই তিন ফুট পরিসরের দুটি ডানায় ভর করে সহজেই উড়ে পালায়, পার হয় মহাদেশ ও মহাসাগর। 

এখন আমরা শীতে বাইক্কা বিল, টাঙ্গুয়ার হাওড় ও ভোলার চরাঞ্চলে শত শত খয়রা-কাস্তেচরা দেখতে পাই। ভবিষ্যতে এ পাখি ভোলার চরাঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেও আমরা অবাক হব না। মাত্র ১৫ বছর আগে ইংল্যান্ডে পরিযায়ন করে এখন সেখানে এরা থিতু হয়েছে এবং লিঙ্কনশায়ারে বাসা করছে বলে সংবাদ এসেছে। 

পৃথিবীর ২৯ প্রজাতির কাস্তেচরার মাত্র তিনটিকে আমরা বাংলাদেশে দেখতে পাই। সবচেয়ে বেশি দেখি কালামাথা-কাস্তেচরা এবং সবচেয়ে কম কালা-কাস্তেচরা। তিন প্রজাতির কাস্তেচরাই এ দেশে থাকে শীতকালে। এখানে এরা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলে এবং বাসা বাঁধলে মন্দ কী! জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত যেসব উপকূলীয় চরে মানুষের ঠাঁই নেই, সেখানেই তো সব কাস্তেচরাদের আনাগোনা। উষ্ণায়নের জোয়ারে তা তলিয়ে যাওয়ার আগে ওরাই থাকুক না ওখানে ছানাপোনা নিয়ে। 

রক্তক্ষরা ব্লিডিং হার্ট ফুল

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১০:৩৯ এএম
রক্তক্ষরা ব্লিডিং হার্ট ফুল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্জন হলের সামনে ফোটা ব্লিডিং হার্ট ফুল। ছবি: লেখক

বৈশাখের এক নম্র সকাল। রোদের তাত তখনো বাড়েনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সামনের পথে হাঁটছি। চারদিকে তাকিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি কোথায় কোন গাছে আজ কী ফুল ফুটল। হঠাৎ পেয়ে গেলাম জাপানি হানিসাকল আর ব্লিডিং হার্ট গাছ। দুটোই লতানো। ভূশায়িত হয়ে কিছুটা মাথা তুলে গাছ দুটো আকাশ দেখার চেষ্টা করছে। 

আশপাশের বিশাল মেহগনি আর নাগলিঙ্গম গাছের ছায়ায় ওরা আচ্ছন্ন। সকাল বলে তবু তেরছা হয়ে একমুঠো রোদ্দুর এসে পড়েছে গাছগুলোর গায়ে। ছোট গাছের বড় গাছদের কাছ থেকে যেন এ গাছের চলছে করুণা ভিক্ষা- দাও আলো, দাও জীবন হে আমার বয়োজ্যেষ্ঠ। গাছগুলোকে দেখে বড় করুণা হলো। বেঁচে থাকার এক দুর্মর বাসনা নিয়ে ওরা টিকে আছে আসলে সেখানকার মালীদের যত্নে। এই যত্নটুকুর জন্যই হয়তো ওরা উজাড় করে ফুল ফোটাচ্ছে, আনন্দ দিচ্ছে মানুষকে।   

এত সব প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও সে গাছকে দেখে মনে হয়, ওদের যেন কোনো বেদনা নেই, কষ্ট নেই। কোনো পুষ্পপ্রেমিক হয়তো তাকে কোনো দিন দেয়নি কোনো ব্যথার ছোঁয়া। বরং তার লতানো শরীরে ঝুলে থাকা দুলের মতো গোছা গোছা ফুলের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছি আদরের হাত। তবু সে যেন এক দুঃখী রাজকন্যা, তার বুক চিরে ঝরে রক্তের ফোঁটার মতো খুদে খুদে পাঁচ পাপড়ির রক্তলাল ফুল। এ জন্যই বোধ হয় ওর ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ব্লিডিং হার্ট। বাংলা কিরণময়ী নামটা ভারতীয়, তবে নামটা কিরণময়ী না হয়ে করুণাময়ী হলে মনে বেশি মানাত। 

বাংলাদেশে এর বাংলা নামকরণ করা হয়েছে হৃদয়হারা বা হৃদয়ক্ষরা। এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Clerodendrum thomsoniae, গোত্র ভার্বেনেসী। অর্থাৎ এ গাছ ভাঁটফুলের সহোদর। এ ফুলের এরূপ উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামকরণের অনুরোধ করেন নাইজেরিয়ার এক মিশনারি চিকিৎসক রেভারেন্ড উইলিয়াম থমসন, তার প্রয়াত স্ত্রীর নামের সম্মানে, তাই এর নামাংশ দেওয়া হয় থমসনি, ক্লিরোডেনড্রাম গ্রিক শব্দের, যার অর্থ চান্স ট্রি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ ফুলের সৌন্দর্যের কারণে ইংরেজি নাম ছিল বিউটি বুশ। 

এটি আমাদের দেশের গাছ না, গাছের উৎপত্তিস্থল পশ্চিম আফ্রিকা। সত্যিই এমন অবিশ্বাস্য এ ফুলের গড়ন। এ ফুলটি আকৃতিতে লণ্ঠনের মতো। প্রতিটি ফুলের বৃতিগুলোর সুচালো ডগা ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে একটি লাল ফুল, ঝুলতে থাকে নিচমুখো হয়ে। ফুলের মধ্যে কখনোবা উঁকি দেয় সাদা রঙের পুংকেশর। সবুজ হৃৎপিণ্ডাকার পাতা, লতানো স্বভাব আর থোকাভরা ফুল সত্যি বিরল। তবে কেউ চাইলে লতার আগাগুলো ছেঁটে একে ঝোপ বানিয়ে রাখা যায়। 

সারা বছর সে ঝোপে কমবেশি ফুল হয়তো ফোটে। তবে গ্রীষ্ম-বর্ষায় ফোটে বেশি। এ গাছটি বাড়ির আঙিনায় হয়ে উঠতে পারে চিরদুঃখী এক স্বপ্নকুমারী। আর বর্ষাকালে ডাল কেটে কলম করে বাড়িয়ে নেওয়া যায় গাছ। এ দেশে এই লতানো স্বভাবের শোভাবর্ধক ফুলের গাছটা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন বাগানে ছড়িয়ে পড়েছে, কেউ কেউ টবেও লাগিয়েছেন। নার্সারিতে এখন কয়েক জাতের ব্লিডিং হার্টের চারা পাওয়া যাচ্ছে। খুলনায় এক নার্সারিতে দেখেছি একটি বিচিত্র ব্লিডিং হার্টের গাছ। সে জাতের গাছের পাতা সবুজ ও সাদা রঙে চিত্রিত, কিন্তু ফুলের আকার ও রং একই। আর এক জাতের ব্লিডিং হার্টের গাছ দেখেছি, যার বৃতির রং হালকা বেগুনি।

ব্লিডিং হার্ট ভূশায়িত লতানে প্রকৃতির বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ গাছ। ৪ মিটার পর্যন্ত গাছটি লম্বা হতে পারে। পাতা অবডিম্বাকার, সবুজ ও শিরাবিন্যাস স্পষ্ট। একটি ছড়ায় অনেক ফুল গুচ্ছাকারে ফোটে। আমরা ফুলের বোঁটার কাছে যে সাদাটে ঘিয়া রঙের ত্রিকোণাকার অঙ্গ দেখি, সেটা ফুলের বৃতি। পাঁচটি বৃতি আবদ্ধ করে রাখে ফুলের পাপড়িকে। ফুল ফুটলে লাল রঙের পাপড়ি নিয়ে বৃতির বাইরে এসে ঝুলতে থাকে ফুল। পাপড়িগুলোর মাঝখান থেকে বেরিয়ে আসে লম্বা চিকন সুতার মতো কেশরগুলো। সাধারণত গ্রীষ্মকালে বেশি ফুল ফোটে। তবে বছরের অন্য সময়েও কিছু কিছু ফুল ফুটতে দেখা যায়। 

পতঙ্গ দ্বারা ফুলের পরাগায়ন ঘটে, এরপর হয় ফল। ফলের রং প্রথমে থাকে সবুজ, পরে হয় লাল, শেষে কালো হয়ে ফেটে বীজ ছড়িয়ে পড়ে। একটি ফলে চারটি কালো রঙের বীজ থাকে। বীজ থেকেও চারা হয়। বেশি ও ভালো ফুল পেতে চাইলে এ গাছে পর্যাপ্ত পানি ও পরিমিত সার দিতে হবে। রোদ যেখানে পড়ে, সেখানে এ গাছ ভালো হয়।

মেছোবাঘ: বাঘ শুধু নামেই

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৪, ১২:২৫ পিএম
মেছোবাঘ: বাঘ শুধু নামেই
মেছোবাঘ বাঘের মত দেখতে হলেও এরা বাঘ নয়। ছবি: সংগৃহীত

নাম মেছোবাঘ। দেখতে বাঘের মতো হলেও মূলত এটি বিড়ালগোত্রীয় প্রাণী। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মেছোবাঘ কম বেশি দেখা গেলেও হাওর অঞ্চলে এদের দেখা যায় বেশি। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে এই প্রাণীটির বিচরণ বেশি। বিভিন্ন অঞ্চলে মেছোবাঘ বিভিন্ন নামে পরিচিত। অনেক অঞ্চলে মেছোবিড়াল, ছোট বাঘ, বাঘরোল বা বাঘুইলা নামে এটি পরিচিত। এদের গায়ে ছোপ ছোপ দাগ থাকায় চিতাবাঘ বলেও ভুল করে থাকেন অনেকে।

মেছোবাঘ মাঝারি আকারের স্তন্যপায়ী প্রাণী। এটি দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাওয়া যায়। মেছোবাঘের বৈজ্ঞানিক নাম Prionailurus viverrinus বা Felis viverrina। ইংরেজি নাম Fishing Cat। এরা নিশাচর। ব্রাজিল, কোস্টারিকা, বাংলাদেশ, ভারত, বলিভিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস, শ্রীলঙ্কায় এরা স্থানীয়ভাবে বাঘরোল নামে পরিচিত। মেছোবাঘের আদি আবাসস্থল থাইল্যান্ড ও এল সালভাদরে।

বাংলাদেশে মেছোবাঘ সাধারণত জলাভূমি, নদীর প্রবাহ, অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ, জলাভূমি এবং ম্যানগ্রোভে বাস করে। এদের উপস্থিতি সেখানকার জলাভূমির অবস্থার ভালো-মন্দ নির্ধারণে সাহায্য করে। এরা সাঁতারে পারদর্শী হওয়ায় এ ধরনের পরিবেশে সহজেই খাপ খাওয়াতে পারে।

মেছোবাঘের প্রধান খাবার মূলত মাছ। এ ছাড়া কাঁকড়া, শামুক, মুরগি, হাঁস, ছাগল, ভেড়াও এই প্রাণীর খাদ্য তালিকায় রয়েছে। মাছ ধরার জন্য মেছোবাঘ বা মেছোবিড়াল পানিতে নামে না। পানির ওপর কোনো গাছের ডালে বা পানির ওপর জেগে থাকা কোনো পাথরে বসে থাবা দিয়ে শিকার ধরে। তবে খুব খাদ্যাভাব দেখা দিলে মেছোবাঘ মানুষের ওপরও আক্রমণ করে থাকে। তবে এরা হিংস্র হলেও খুব ভীতু প্রকৃতির প্রাণী।

এরা আকারে গৃহপালিত বিড়ালের চেয়ে অনেকটা বড় হয়। শরীর ঘন, পুরু লোমে আবৃত। পুরুষ মেছোবিড়াল আকারে স্ত্রী মেছোবিড়ালের চেয়ে বড় হয়ে থাকে। এদের চেহারা ও গায়ের ডোরা অনেকটা বাঘের মত। মেছোবিড়াল লেজসহ লম্বায় সাড়ে তিন ফুটের মতো হয়ে থাকে। সামান্য হলুদ মেশানো ধূসর রঙের চামড়ায় মোটামুটি লম্বালম্বিভাবে কয়েক সারি গাঢ় হলুদ ডোরা থাকে। পেটের নিচের রং সাদাটে। এদের কান ছোট এবং গোলাকার হয়। চোখের পেছন থেকে গলার শেষ পর্যন্ত ৬ থেকে ৮টি কালো বর্ণের ডোরাকাটা দাগ থাকে। পুরো শরীরে ছোপ ছোপ কালো দাগ আছে।

১৫ মাস বয়স হলে এরা প্রজনন উপযোগী হয়। সাধারণত মার্চ মাস থেকে জুন মাস পর্যন্ত এদের প্রজননের সময়। একসঙ্গে একাধিক বাচ্চা প্রসব করে থাকে মেছোবাঘ। এদের গড় আয়ু ১০ বছর।

বিভিন্ন কারণে গত কয়েক দশকে মেছোবাঘের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো মেছোবাঘের প্রতি মানুষের হিংসাত্মক মনোভাব ও ভ্রান্ত ধারণা।

বিশিষ্ট প্রাণিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা ফিরোজ বলেন, ‘মেছোবাঘ একটি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। বাংলাদেশে কতগুলো মেছোবাঘ আছে এই সংক্রান্ত কোনো সার্ভে বা জরিপ আমাদের করা হয়নি। তবে দিন দিন বিভিন্ন সংকটের কারণে এই প্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। মাছ এদের প্রধান খাদ্য হওয়ায় এরা মূলত বিভিন্ন জলাশয় যেমন, টাঙ্গুয়ার হাওর, রাজশাহীর চলনবিল, শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওর, বাইক্কার বিল এলাকায় বসবাস করে। কিন্তু এই এলাকাগুলোতে মাছ ধরার জন্য পাতা ফাঁদ, কারেন্ট জালে আটকে মারা যায় মেছোবাঘ। আবার এদের আবাসস্থল, ঝোপ-ঝাড়, বন-জঙ্গল বা অভয়ারণ্য ধ্বংস করে ফেলায় এরা বংশ বৃদ্ধি করতে পারছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে প্রজাতিটি একটি সংরক্ষিত প্রাণী। বাইক্কার বিলে ৫১ থেকে ৫৪টি বিল আছে, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে এদের অভয়ারণ্য রয়েছে কিছু জায়গায়। তবে এদেরকে বসবাসের পরিবেশ না দিলে এরা টিকবে কীভাবে? তাই শুধুমাত্র জনসচেতনতা নয় বরং আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অভয়ারণ্য রক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার।’ 

এক গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৪৫ শতাংশ অভয়ারণ্য এবং বিশ্বের ৯৪ শতাংশ জলাশয় ধীরে ধীরে মানুষের দখলে চলে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল মুছে গেছে। ভারতের বণ্যপ্রাণী ও প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ড ফর নেচার ইন্ডিয়ার (ডব্লিউডব্লিউএফ) তথ্য মতে, বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় ১০ হাজারের মতো মেছোবাঘ টিকে আছে।

তবে বনাঞ্চল বা আবাসস্থল ধ্বংস করে জনবসতি স্থাপন ও কৃষিজমিতে রূপান্তর, হাওর ভরাট, মানুষের অসচেতনতা ও ভ্রান্ত ধারণা, খাদ্যসংকট ইত্যাদি কারণে এদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। 

একদিকে হাওরাঞ্চলে মাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাওয়ায় খাদ্যাভাবে মেছোবাঘ কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে মানুষ বাঘ মনে করে অনেক মেছোবাঘ হত্যার কারণেও এর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে জলাশয় ভরাট এবং বন উজাড়ের কারণে এদের আবাসস্থল বিরাট হুমকির মুখে পড়ে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এই প্রাণী।

তাই ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ২০০৮ সালে মেছোবাঘকে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

বাংলাদেশের ১৯৭৪ ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-১ অনুযায়ী এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত। 

মেছোবাঘ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দরকার জনসচেতনতা। আমাদেরকে পরিবেশ দূষণ রোধে কাজ করতে হবে। কারেন্ট জালের ব্যবহার কমাতে হবে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর হতে হবে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এটিকে সেই রাজ্যের ‘রাজ্য প্রাণী’ তকমা দেওয়া হয়েছে এবং এই রাজ্য বর্তমানে বাঘরোল সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। যা মেছোবাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বিরাট অবদান রাখছে।

কালো মাথা বেনেবউ

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৪, ১০:১১ এএম
কালো মাথা বেনেবউ
চুপ করে বসে আছে বেনেবউ, ঢাকার জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান থেকে তোলা। ছবি: লেখক

‘দেখেছি হলুদ পাখি বহুক্ষণ থাকে চুপ করে,
নির্জন আমের ডালে দুলে যায়-দুলে যায়-বাতাসের সাথে বহুক্ষণ;’
-জীবনানন্দ দাশ

মেঘশিরীষগাছে নতুন পাতা এসেছে। শাখা-প্রশাখার রং ঢেকে গেছে পাতার রঙে। তখন গ্রামবাংলায় পাখিদের বাসা বানানোর সময়। পাকড়া শালিক, লাল ঘুঘু, বুলবুলি, ছাতারে, হাঁড়িচাঁচা নিয়মিত মেঘশিরীষের ডালে ডাকাডাকি করছে। বাসা তৈরির জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজছে ঘুঘু।

এমন দিনে একজোড়া হলুদ পাখি উড়ে এল। ঠোঁটে তাদের হলুদ নরম খড়। মেঘশিরীষের পাতি ডালে ঘনপাতার ভেতরে ওরা চলে গেল। ওই ডালেই ওদের বাসা। দুপুরের রোদ শেষে বিকেলের সময় শুরু হলো। মেঘশিরীষ বা রেইনট্রি গাছের পাতাগুলো তখন লজ্জাবতী পাতার মতো গুটিয়ে নিল ধীরে ধীরে ঝিরিঝিরি বাতাসের ছোঁয়ায়। মগডালে বেনেবউদের কাপের মতো সুন্দর বাসাটি দেখা গেল। ইংরেজি ‘ভি’ এর মতো ছড়ানো দুটি ডালের বিভাজিত অংশে এই বাসাটি। নরম খড়, ঘাস, গাছের তন্তু ও মাকড়সার জাল দিয়ে বাসাটি বানানো হয়েছে।

এ পাখিরা সাধারণত উঁচু গাছের মগডালেই বাসা বানায়। বাসা বানানোর জন্য মেঘশিরীষ ও বড় আমগাছ তাদের বেশ পছন্দ। দেখতে দেখতে এক দিন তাদের বাসায় ছানা এল। কয়েক সপ্তাহ ছানাদের কিচিরমিচির শুনেছি। উভয় পাখি ছানাদের খাবার খাওয়াত পালা করে। এক দিন ছানারা বাসা ছাড়ল এবং উড়ে চলে গেল কোথাও।

কালো মাথা বেনেবউ গ্রামবাংলায় হলদে পাখি নামে বহুল পরিচিত। লোকে এদের কুটুমপাখিও বলে। এ পাখি ডাকলে বাড়িতে মেহমান আসবে, এমন ধারণা বরিশালের গ্রামে গ্রামে বহুল প্রচলিত। আমরাও ছেলেবেলায় এমটি মনে করতাম। কালো মাথা বেনেবউ পালকের উজ্জ্বল হলুদ রঙের জন্য খুব সহজেই মানুষের চোখে পড়ে। সাধারণত একাকী এবং জোড়ায় চলে। কণ্ঠ সুমধুর। প্রজনন মৌসুমে তাদের গান শোনা যায়। বেশ পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি পাখি।

তাদের চলাফেরায় এক রকম নীরবতা, লাজুকতা এবং সৌন্দর্য আছে। আছে দারুণ ব্যক্তিত্ববোধ। যে কারণে এ পাখিটি আমার মন জয় করে নিয়েছে। মানুষকে মোটেও বিরক্ত করে না। গাছপালাময় মানুষের বসতির কাছেই থাকতে ভালোবাসে। শহরের পার্কেও তাদের দেখা যায়। এদের প্রধান খাদ্য হলো পাকা ফল, কীটপতঙ্গ ও ফুলের মধু। আম, জাম, পেঁপে, তেলাকুচা ফল পাকলে বেনেবউরা নিয়মিত সেখানে আসে।

সৌরভ মাহমুদ: প্রকৃতিবিষয়ক লেখক ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার
[email protected]