উনত্রিংশ পর্ব
আর উপায় নেই। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। শাহবাজ খান এই প্রথম ঘোড়া মাসুদকে বড় ধরনের শাস্তি দিলেন। মাসুদ কল্পনাও করেনি তাকে এমন একটা শাস্তি পেতে হবে। সে শাস্তি দিয়ে অভ্যস্ত। শাস্তি কখনো পায়নি। শাহবাজ খানের আজকের শাস্তি বড় কঠিন। সে জানে, শাহবাজ খানের নির্দেশ সঙ্গে সঙ্গে পালন করতে হয়। তা না হলে শাস্তির মাত্রা বেড়ে যায়। ঘোড়া মাসুদ তাই দেরি করল না। সে সঙ্গে সঙ্গে হাঁটা শুরু করল।
শাহবাজ খান চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আরেকজনকে ইশারা করল। সঙ্গে সঙ্গে দু-তিন জন মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে তার ছবি তোলা শুরু করে দিল। আবার হাতের ইশারায় ছবি তোলা বন্ধ হলো। এবার তিনি আসাদকে ডেকে বললেন, এই ছবি দিয়ে একটা পোস্ট দে। নিচে লিখবি, আমার সম্পর্কে যারা খারাপ মন্তব্য করেছে তাদের আমি দেখে নেব। আর শোন, যারা আমার সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করেছে তাদের প্রত্যেকের আইডি সংগ্রহ কর। আমি ওদের সত্যি সত্যিই বারোটা বাজিয়ে ছাড়ব। আমার কথা বুঝতে পারছিস আইটির বাচ্চা!
আসাদ জি জি করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেলল। তার পর দ্রুত চলে গেল আইটি রুমে। সেখানে গিয়ে শাহবাজ খানের আইডিতে ঢুকে ছবি পোস্ট করল। নিচে যা লিখতে বলেছিলেন তা লিখে পোস্ট করে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফেসবুকে যেন ঝড় উঠল। শাহবাজ খানের ফলোয়াররাই তাকে গালমন্দ শুরু করল। তার ছবি দেখলেই সবাই গালাগাল শুরু করে। ছবি নিচে যে হুমকির বিষয়টি কারও চোখেই পড়েনি।
শাহবাজ খান বাসার অফিসে কষ্টে বসে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে ঢুকলেন। তার পর সদ্য পোস্ট করা ছবির দিকে তাকালেন। আর ওমনি চোখে পড়ল নানা রকম নেতিবাচক মন্তব্য। শালা নির্লজ্জ বেহায়া! লজ্জা শরমের বালাই নেই! মানুষ এত গালাগাল করছে তাতেও কাজ হচ্ছে না। শালা; এত খারাপ মানুষ হইতে পারে! আল্লাহ এরে কি দিয়া বানাইল! এমন বজ্জাত লোক তো দুনিয়ায় দেখিনি!
মন্তব্যগুলোর ভেতরে আর ঢুকতে হয়নি। প্রথম দু-তিনটা মন্তব্য দেখেই শাহবাজ খানের মেজাজ গরম। তিনি রাগে কেবল ফোঁস ফোঁস করছেন। কারে কী বলবেন তার কোনো ঠিক নেই। তিনি চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলেন। একে ওকে ডাকছেন। কিন্তু কেউ তার সামনে যাচ্ছে না। সবাই ভয় পাচ্ছে। এবার মারপিট শুরু হয়ে যেতে পারে।
শাহবাজ খান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার সহকারীরা ভাবল, বসের মেজাজ ঠাণ্ডা হয়েছে। কেউ কেউ দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে। শাহবাজ খান কোন অবস্থায় আছেন, তার মেজাজ ঠাণ্ডা না গরম তা বোঝার চেষ্টা করেন। ম্যাক সাহেব পা টিপে টিপে তার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বিড়ালের মতো পা ফেলে ভেতরে ঢুকল। কিন্তু শাহবাজ খান ঠিকই টের পেলেন। তিনি ম্যাককে ডেকে বললেন, এই শালা মোটা! তুই কই ছিলি? শুধু পালিয়ে বেড়াস! তাই না? শোন, আইটি শালারা কি করে? ওদেরকে বল, আমার বিরুদ্ধে ফেসবুকে যারা অপপ্রচার চালাচ্ছে, গালমন্দ করছে; তাদের আইডিগুলো চিহ্নিত করবে। তার পর সেগুলো আমাকে দেবে। ওই আইডিগুলো ধরে ধরে শায়েস্তা করব। বাঙালি আমারে চেনে না। আমি কি জিনিস সেটা না বুঝালে ওরা সোজা হবে না!
জি আচ্ছা; দেখছি।
এই শালা! দেখছি কী রে? এখনই তুই অর্ডার দে। আমি যা বলছি তা কর। এখনই করবি। তা না হলে তোর ভুঁড়ি কিন্তু গালিয়ে দেব। আমাকে তুই চেনোস না? আমি ক্ষেপলে কিন্তু খবর আছে!
ম্যাক আর দেরি করল না। মানে দেরি করার সাহসই পেল না। সে সঙ্গে সঙ্গে আইটি বিভাগের লোকদের ফোন করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিল। সময় দিল সাত দিন। এর মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে চাকরি নট।
আইটি বিভাগের আসাদ বলল, ও আল্লাহ! এ আবার কোন বিপদে পড়লাম!
সাত দিনে সাত হাজার ফেসবুক আইডির সন্ধান দিল আইটি বিভাগ। সেই আইডিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসন্ধান করা হলো। অনুসন্ধানে দেখা গেল, শাহবাজ খানের নিজের প্রতিষ্ঠানেরও কয়েকজন কর্মচারী কিছু নেতিবাচক মন্তব্যে লাইক দিয়েছে। সেই লাইকের বিনিময়ে তারা পেয়েছে চাকরি থেকে বরখাস্তের চিঠি। তারা তো অবাক! কেন তারা বরখাস্ত হলো তা যখন খুঁজতে গেল তখন তারা টের পেল, এমডি সাহেবের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণায় তারা লাইক দিয়েছিল। আসলে তারা বুঝেশুনে যে লাইক দিয়েছে তা নয়। কেউ কেউ বেখেয়ালে দিয়েছে। এতে যে চাকরি খোয়ানোর মতো ঘটনা ঘটবে তা তারা কোনোদিনই ভাবেনি। শুধু এটাই নয়, কাউকে কাউকে বাসায় ডেকে নিয়ে টর্চার সেলে নেওয়া হয়। সেখানে বেধড়ক মারধর করা হয়। আর এসব খবর এক কান দুই কান করে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। যারা মারধরের শিকার হয়েছে তারাও ফেসবুকে তাদের নিপিড়নের কথা তুলে ধরেছে। এখান থেকেই দেশ-বিদেশের মানুষ শাহবাজ খানের টর্চার সেল সম্পর্কে ধারণা পায়। সেই ধারণা কিন্তু শাহবাজ খানের জন্য মোটেই সুখকর নয়। তার ব্যাপারে দেশের মিডিয়ার মুখ বন্ধ থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঠিকই সরব রয়েছে। এটা দেখে কেউ কেউ মন্তব্য করছেন, দুনিয়ার বিচার না হলেও প্রকৃতির বিচার হয়ে গেছে এবং আরও কঠিন বিচার তার সামনে অপেক্ষা করছে।
শাহবাজ খান কি সেটা কোনোভাবে বুঝতে পারছেন!
আসিফ আহমেদ হুটহাট কোনো সিদ্ধান্ত নেন না। পাতলা কথা বলেন না। যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি দশবার ভাবেন। অনেক চিন্তাভাবনার পর সিদ্ধান্ত নেন। কারোনাকালের অবসরে তিনি নিজেকে নিয়ে অনেক ভেবেছেন। কী করবেন না করবেন; কিংবা তার আসলে কী করা উচিত তা নিয়ে অনেক ভেবেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, পুরোপুরি লেখালেখিতে মনোযোগ দিতে। লেখক হিসেবে অনেক বড় একটা জায়গা তৈরি করেছেন। ত্রিশ বছর সাংবাদিকতা করার পর আর বোধহয় দরকার নেই। সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ পদে তো ছিলেনই!
আবার অনেকে বলেছেন, আপনার মতো একজন সম্পাদক ঘরে বসে থাকবে; তা কি করে হয়! আপনি আবার শুরু করুন। আপনাকে নিয়ে পত্রিকা করার কথা অনেকেই ভাবছে। আপনি শুধু হ্যাঁ বলে দেখুন। দেখবেন কতজন বিনিয়োগকারী আপনার কাছে ছুটে আসছে!
আসিফ আহমেদ আবার ভাবনায় পড়েন। সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন! একজন লেখকের যেমন দেশ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে; তেমনি একজন সাংবাদিকেরও থাকে। ইচ্ছা করলেই তিনি নিজেকে গুটিয়ে রাখতে পারেন না। রাখা উচিতও নয়। তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো উচিত। তার কোনো প্রচেষ্টায় যদি দেশের মানুষের কিছুমাত্রও উপকার হয় সেটা তিনি করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে নতুন কোনো পত্রিকার উদ্যোগ নিলে অর্থের জোগান কে দেবে? পত্রিকা করতে বিপুল পরিমাণ টাকা দরকার। এত টাকা তাকে কে দেবে? বড় কোনো গ্রুপ ছাড়া তো বিপুল অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব না। আবার বড় কোনো গ্রুপে গেলে স্বাধীনভাবে পত্রিকা করাও সম্ভব নয়। তাহলে কী করণীয়?
আসিফ আহমেদ অনেক ভাবনাচিন্তার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; তিনি বড় কোনো গ্রুপের পত্রিকায় কাজ করবেন না। আমাদের দেশের পত্রিকাগুলো এরাই ধ্বংস করে দিয়েছে। এরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য পত্রিকাকে ব্যবহার করছে। নিজেদের খবর ফলাও করে প্রচার করছে। নিজেদের দোষ ঢাকতে অন্যের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করছে। এদের কারণেই গণমাধ্যমে হলুদ সাংবাদিকতার বিস্তার ঘটেছে।......
চলবে...
আরও পড়তে ক্লিক করুন-
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭, পর্ব-১৮, পর্ব-১৯, পর্ব-২০, পর্ব-২১, পর্ব-২২, পর্ব-২৩, পর্ব-২৪, পর্ব-২৫, পর্ব-২৬, পর্ব-২৭পর্ব-২৮