প্রতি বছর রমজান মাস এলেই সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে দেশের নিত্যপণ্য। এবারও রমজানের শুরুতে বাজারে লেবু, শসা, বেগুন, কাঁচা মরিচের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে অতি মুনাফা লুটে নেয়। প্রতি বছর রমজান মাসে এ যেন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিন্ডিকেট করেই বাজারে পণ্যের দাম দ্বিগুণ-তিন গুণ বাড়ানো হচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পর বিএনপি সরকার গঠন করে। নতুন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হচ্ছে দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা। এজন্য সরকারকে কঠোরভাবে নজরদারি বাড়াতে হবে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, এবার সরবরাহ কম। তাই রমজানে দাম বাড়ছে। রমজানের শুরুতেই লেবুর হালি ১৫০ টাকায় পৌঁছে। এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থার লক্ষণ নয়। খবরের কাগজের সরেজমিন প্রতিবেদনে দেখা যায়, যেসব পণ্যের মজুত ও সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে সেগুলোর দামও বেড়েছে। বাজার তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতিলোভ, দায়িত্বহীন এবং অতিরিক্ত মুনাফার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে বাজারে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত রবিবার বিভিন্ন বাজারে কাঁচা মরিচের কেজি বিক্রি হয় ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়, যা গত বছরের একই সময়ে বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৬০ টাকায়। দাম বেড়েছে ১৩৩ শতাংশ। বিভিন্ন বাজারে বেগুনের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকায়। গত বছরে তা বিক্রি হয় ৩০ থেকে ৬০ টাকায়। এর দাম বেড়েছে ১২২ শতাংশ। ৪০ থেকে ৭০ টাকার শসা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১৬০ টাকায়। বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ১১৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আব্দুর রহিম খবরের কাগজকে বলেন, বছরের ব্যবধানে যেভাবে রমজানের ব্যবহার্য পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়েছে, বাস্তবে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়নি। পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা সিন্ডিকেট করে বাজার গরম করছেন। উৎপাদনে কোনো সমস্যা নেই। তা হলে রাজধানীতে এসব পণ্য আসা বন্ধ হয়ে যেত।
নতুন সরকারকে দেশের সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে সব ধরনের নিত্যপণ্যের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। রমজান এলে বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশে যেখানে দেখা যায় দ্রব্যের দাম কমছে, সেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তার উল্টা চিত্র। এ দেশের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্র মুনাফার জন্য রমজান মাসকে লাভজনক সময় মনে করে। তাই সরকারকে নিত্যপণ্যের সিন্ডিকেট ভাঙতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। টিসিবিকে শহর-নগর-গ্রামে জোরদার করা জরুরি। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে। দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আরও কঠোর বার্তা দিতে হবে। নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় ও যৌক্তিক রাখতে হলে বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী স্বাভাবিক পণ্য প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাদের কারসাজি ভাঙতে হবে। বাজার তদারকি ব্যবস্থা নিয়মিত জোরদার করতে হবে। নিত্যপণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। আমরা আশা করি, সরকার নিত্যপণ্যকে সিন্ডিকেট এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করতে একটি সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।