দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বৈশাখের শুরুতেই গ্রামাঞ্চলে কৃষিজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। চলতি বছর এ পর্যন্ত বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে ৭৮ জনের মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টরা একে ‘নীরব দুর্যোগ’ উল্লেখ করে বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও ধারাবাহিক পরিকল্পনার অভাবকে দায়ী করছেন। সারা দেশে গ্রামীণ সড়কের পাশে তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা থাকলেও মাঝখানে এই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। চলতি বছর বজ্রপাতে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর কারণে সরকারের পুরোনো উদ্যোগ ‘তালগাছ লাগানোর প্রকল্প’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সংসদে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, বজ্রপাতে প্রাণহানি রোধে সরকার সচেতনতা বৃদ্ধি, সাইরেন স্থাপন, তালগাছ রোপণ এবং বজ্র নিরোধক টাওয়ার বসানোর মতো একাধিক উদ্যোগ নিচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় বজ্রপাতের ঝুঁকি বেশি, যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫টির বেশি বজ্রপাত হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বজ্রপাত জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষিত হলেও এখনো কার্যকর সমন্বিত কর্মসূচি ও সঠিক পরিসংখ্যানের অভাব রয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯-২০ সালের মধ্যে দেশে বজ্রপাত হয়েছে ৩১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি। দেশে সারা বছর যে পরিমাণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৬ শতাংশ হয় মে মাসে। ঋতুভিত্তিক বিন্যাসেও বজ্রপাতের ধরনে পার্থক্য রয়েছে। মার্চ থেকে মে মাসে প্রায় ৫৯ শতাংশ, আর মৌসুমি বায়ু আসার সময় অর্থাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৬ শতাংশ বজ্রপাত হয়। তবে মোট বজ্রপাতের প্রায় ৭০ শতাংশ হয় এপ্রিল থেকে জুনে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে বজ্রপাত বৃদ্ধির প্রধান কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর ধরন পরিবর্তন। পাশাপাশি বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ব্যাপক বায়ুদূষণ এর জন্য দায়ী। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়েছে, যা শক্তিশালী কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি করে। তা ছাড়া অভ্যন্তরীণ বনভূমি হ্রাস ও জলাভূমি ভরাটের কারণে দেশে বজ্রপাতের সংখ্যা বাড়ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলে বজ্রপাতের আশঙ্কা বেড়ে যায় শতকরা ১০ থেকে ১২ ভাগ। এ ছাড়া ভৌগোলিক অবস্থানই এর মূল কারণ বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশের এক পাশে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা গরম ও আর্দ্র বাতাস এবং অন্যদিকে হিমালয় থেকে আসা ঠাণ্ডা বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রঝড় বা কালবৈশাখীর তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। সেই সঙ্গে কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া এবং বাতাসে ভাসমান সালফেট কণা বা ধূলিকণা মেঘের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি করতে সাহায্য করে, যা বজ্রপাত বৃদ্ধির জন্য দায়ী। নগরায়ণকেও দায়ী করেছেন আবহাওয়াবিদরা। তারা জানান, কংক্রিটের দালানকোঠা ও পিচের রাস্তা তাপ ধরে রাখে, যা স্থানীয়ভাবে বাতাসের তাপমাত্রা বাড়িয়ে মেঘের ভেতরে বৈদ্যুতিক চার্জ বাড়িয়ে দেয়।
সম্প্রতি বজ্রপাতে খোলা মাঠে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন। তাই মানুষের সচেতনতা বাড়াতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বড় ও উঁচু গাছ বজ্রপাতকে শোষণ করতে পারে। বাড়ির আশপাশে বা আঙিনায় তাল, নারিকেল, সুপারির মতো লম্বা গাছ লাগাতে হবে। সবচেয়ে বেশি দরকার বজ্রপাত মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণা ও ধারাবাহিক উদ্যোগ। আশা করছি, সরকার একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বজ্রপাত মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।