‘গুপ্ত’ শব্দটির অর্থ লুকানো বা গোপন হলেও এই শব্দটিকে ঘিরে সংঘাত, হানাহানি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুপ্ত বলতে বিশেষ একটি দলের নেতা-কর্মীদের বোঝায়, যারা গোপনে বা ছদ্মবেশে অন্য দলে ঢুকে রাজনীতি করার পর ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে নিজের দলের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করেছেন। আভিধানিক গুপ্ত শব্দটি এরপর থেকে রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করার অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এতেই সম্প্রতি গুপ্ত ও গুপ্ত-বিরোধীদের মধ্যে বেড়েছে সংঘাত হানাহানি।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের দেয়ালের গ্রাফিতিতে ‘ছাত্র’ মুছে ‘গুপ্ত’ লেখা নিয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘাতের পর সেই উত্তেজনা ছড়িয়েছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। এর জেরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাল্টাপাল্টি মিছিল ও শোডাউন হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কলেজ বন্ধ হয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভিপি ও শিবির নেতা সাদিক কায়েম পর্যন্ত চট্টগ্রামে গিয়ে দেখা করেছেন চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে। অন্যদিকে মঙ্গলবার রাতেই হামলার প্রতিবাদে ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ মিছিল করে। সেই সমাবেশে ছাত্রশিবিরকে উদ্দেশ করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, ‘একবার গুপ্ত বলায় যদি এত জ্বালা হয়, তাহলে প্রতিটি ক্যাম্পাসে হাজারবার গুপ্ত বলব।’
বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গত বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৯তম দিনে বিষয়টি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং ব্যাপক হইচই হয়। সরকারদলীয় একজন সদস্য বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে তারা সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত করছে বলে অভিযোগ করেন।
ছাত্ররাজনীতির এই সমস্যা স্থানীয় পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ না থেকে ক্রমশ সংসদসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। জড়িয়ে গেছে ডাকসুর মতো পৃথক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদও। ঘটনার পর ছাত্রনেতারাসহ রাজনৈতিক দলগুলোর এভাবে জড়িয়ে পড়াকে অনেকেই পরিকল্পিত মনে করছেন। আসলে এই গুপ্ত কথাটা নিয়ে এতটা সংবেদনশীল হওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোনো ছাত্রসংগঠনের কেউ কিছু বললে বা লিখলে তা নিয়ে প্রায়ই ছাত্ররাজনীতি সংঘাতপ্রবণ হয়ে উঠছে। এই প্রবণতা পরিহার করা জরুরি। সব পক্ষকেই সংঘাতপ্রবণ ঘটনা সম্পর্কে সংযত হতে হবে; বিশেষ করে শারীরিক আক্রমণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এই সংঘাতের কারণে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ক্লাস ও পরীক্ষা বিঘ্নিত হচ্ছে, যা কাম্য নয়।
চব্বিশের ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অনেকেই ভেবেছিলেন, ছাত্ররাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে। কিন্তু সেই পরিবর্তন আসেনি, বরং শিক্ষক লাঞ্ছনা থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরা তুচ্ছ ঘটনায় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছেন। এসব সংঘাতের ঘটনা সংসদেও উত্তেজনা ছড়িয়েছে। সংসদীয় তর্ক-বিতর্ক তিক্ততার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। উত্তেজনা থামাতে স্পিকারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। সংসদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে গুপ্তসংক্রান্ত বিতর্কে।
পুরো জাতি যখন জ্বালানি তেল ও হামের মতো সংকট মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন দলীয় রাজনীতির প্রাধান্য বিস্তার নিয়ে এহেন সংঘাত কখনো কাম্য হতে পারে না। আমরা মনে করি, উভয় পক্ষকেই এ ব্যাপারে সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু তা কোনো অবস্থাতেই সংঘাতপূর্ণ হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে অসহিষ্ণুতার সঞ্চার ঘটেছে বলে মনোবিদরা বলছেন, তা কীভাবে প্রশমিত করা যায়, এখনই আমাদের তা করতে হবে। হিংসা, ঘৃণা, সংঘাত–রাজনীতি থেকে দূর করতে হবে। সুস্থধারার রাজনীতি ফিরিয়ে আনা বা চর্চার দায়িত্ব সরকার ও বিরোধী দলের, দলগুলোর ছাত্রসংগঠনগুলোর। সংশ্লিষ্ট সবাই এ ব্যাপারে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন বলে আমরা আশা করছি।