জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নগর পরিবহন ও দূরপাল্লার বাস– দুই ক্ষেত্রেই ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, ভবিষ্যতে তেলের দাম কমলে ভাড়াও কমানো হবে। সেই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাসের এই ভাড়া বৃদ্ধি বহুমুখী মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা জনজীবনে আরও সংকট তৈরি করবে। ইতোমধ্যে সর্বক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
সমস্যা হচ্ছে, বাস বা পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি পেলে কোন ক্ষেত্রে তা কতটা বাড়বে, বাংলাদেশে সেটা নির্ধারণ করে দেওয়ার মতো সমন্বিত কোনো পদ্ধতি আজও উদ্ভাবন করা যায়নি। কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ নেই যে, তারা সব দিক বিবেচনা করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যৌক্তিক পরিমাণে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি নির্ধারণ করবে। ফলে যার যেমন খুশি দাম নিতে শুরু করে। এবারও সে রকম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে চাপে পড়বে সাধারণ মানুষ।
বাস ভাড়ার ক্ষেত্রেও যতটা বাড়ানো হলো, সেটাই যে বাসের শ্রমিক-মালিকরা মেনে নেবেন তারও নিশ্চয়তা নেই। অতীতে সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো কোনো নজরদারি ও তদারকি লক্ষ করা যায়নি। জ্বালানি তেলের দাম কমলেও ভাড়া কমে না। ২০২২ সালে ডিজেলের লিটার ১১৪ থেকে ৫ টাকা কমিয়ে ১০৯ টাকা করা হলেও ভাড়া কমানো হয়নি। অথচ সরকার ঠিকই কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ৫ পয়সা কমিয়েছিল। ২০১৬ এবং ২০১১ সালেও তেলের দাম কমিয়ে ভাড়া কমিয়েছিল সরকার, কিন্তু বাসের মালিক ও শ্রমিকরা তা কার্যকর করেননি।
প্রজ্ঞাপন অনুসারে ইতোমধ্যে ভাড়া কার্যকর হয়েছে, কিন্তু বাস ভাড়ার কোনো তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। রাজধানীর বিভিন্ন রুটের ভাড়া নির্ধারণ করে তালিকা দেওয়া হলে সাধারণ যাত্রীরা অবগত হতে পারতেন ভাড়া আদতে কত বাড়ল। ভাড়ার এই তালিকা নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কোনো তথ্যও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের জানাননি। এই তালিকা প্রকাশ না করার কারণে আগামী কিছুদিন যাত্রী ও বাসের হেলপারদের মধ্যে ভাড়ার হিসাব-নিকাশ নিয়ে বাদানুবাদ হতে পারে। অতীতে এ রকম বাদানুবাদের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে।
নতুন করে ভাড়া বাড়ানোর পর প্রধান উদ্বেগ হচ্ছে, বাসচালক ও সহকারীদের সরকারনির্ধারিত ভাড়ার তালিকা না মানার প্রবণতা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, যেখানে ভাড়া হওয়ার কথা ২০ টাকা, সেখানে নেওয়া হয় ২৫ টাকা। সরকারের পক্ষ থেকে তদারকির কথা বলা হলেও সেই তদারকি করা হয় না। তদারকি করার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাই আসলে সরকারের নেই। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী একটি গণমাধ্যমকে এ কথা জানিয়ে বলেছেন, ভাড়ার তালিকা প্রস্তুতের সময় কিলোমিটারের হিসাবে অনিয়ম করা হয়। কোথাও আবার বাড়তি স্টপেজ যুক্ত করা হয়, কোথাও টোল যোগ করে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হয়। ভাড়ার তালিকা যখন সাঁটানো হয়, তখন দেখা যায় ২২ টাকা ভাড়ার স্থলে আদায় করা হচ্ছে ৩০ টাকা। এই নৈরাজ্য মনিটরিং করার মতো কেউ নেই। ফলে সব দিক থেকেই পিষ্ট হয় ভোক্তা।
ভাড়া নিয়ে এই যে নৈরাজ্যের অভিযোগ ক্যাব ও যাত্রীরা করে থাকেন, এসবের অবসানকল্পে সরকার কঠোর হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করছি। এ ক্ষেত্রে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি), ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এবং সরকারের অন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, তাদেরও বাস-মিনিবাসগুলোতে নৈরাজ্য বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে আমরা মনে করি। সবাইকে ভাড়ার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই যাত্রী ভোগান্তি কাম্য নয়।