দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। জ্বালানিসংকটের কারণে চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। রাজশাহী, খুলনা বিভাগসহ দেশের ২৪ জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে লোডশেডিং। এসএসসি পরীক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। ইতোমধ্যে কারিগরি ত্রুটির কারণে আদানির একটি ইউনিট থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তেলচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এবারের গ্রীষ্মে গরম বেশি হতে পারে। চিংড়ির খামারও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সেই সঙ্গে বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সেচকাজও ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে গ্রামীণ জনগণ বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোডশেডিং এমনভাবে বণ্টন করা হয়, যাতে বেশি চাহিদাসম্পন্ন শহরে ও বাণিজ্যিক এলাকায় সচল রাখা হয়, আর গ্রামাঞ্চলের ফিডারগুলো দীর্ঘক্ষণ বন্ধ রাখা হয়। বিতরণব্যবস্থার ত্রুটির কারণে জাতীয় পর্যায়ে মাঝারি ধরনের ঘাটতি হলেও গ্রামে তা দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ে রূপ নেয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়িয়ে একটি সুষম লোড ম্যানেজমেন্ট বা বণ্টন নীতি অনুসরণ করলে মানুষের এই ভোগান্তি অনেকটা কমানো সম্ভব। তীব্র গরমের মধ্যে শুধু বিদ্যুৎই নয়, গ্যাস ও পানিসংকট একসঙ্গে আঘাত হেনেছে জনজীবনে। গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহে যখন মানুষের স্বস্তি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক সে সময়ই অস্বস্তির লোডশেডিংয়ে মানুষ অতিষ্ঠ। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এমন চিত্র এখন প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীতে এখন গড়ে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। শহরতলি ও গ্রামাঞ্চলে তা ৮ থেকে ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত। নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় মানুষ আগে থেকে কোনো প্রস্তুতি নিতে পারছেন না। ফলে বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৃষ্টি হয়েছে চরম ভোগান্তি। বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যান, ফ্রিজ কিংবা শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বন্ধ থাকছে, যা এই তীব্র গরমে জীবনকে আরও অসহনীয় করে তুলছে।
বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা বলেন, জ্বালানিসংকটের কারণে দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৭১টি অচল হয়ে আছে, নয়তো সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করছে। অকেজো বা ধুঁকতে থাকা এই কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৪৫টি ফার্নেস অয়েলচালিত, ২৩টি গ্যাসচালিত এবং ৩টি কয়লাভিত্তিক।
পিডিবির অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গ্রীষ্মের পিক আওয়ারে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট প্রাক্কলিত চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানোর জন্য প্রতিদিন অন্তত ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। কয়লা ও ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে যদি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, তবেই পিডিবির গ্যাসের চাহিদা এই পর্যায়ে থাকবে।
দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। বিগত সরকারের সময় জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। বাড়তি সক্ষমতা অলস বসিয়ে রেখে ভাড়া চার্জ দিতে হচ্ছে। এতে সরকারের ওপর বড় ধরনের ভর্তুকির চাপ তৈরি হয়েছে। তার ওপর বিপুল বকেয়ার দায় রয়েছে। জ্বালানিসংকটে উৎপাদন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি। গরমের শুরুতে এখন বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও সব মিলিয়ে উৎপাদন করা যাচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এদিকে গ্রাম-শহরে বিদ্যুৎবৈষম্য কমাতে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ-সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দেশের বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং বাড়াতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে উৎপাদনে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় শিশু ও বয়স্ক রোগীরা বেশি সমস্যায় পড়ছেন। বিশেষ করে দেশে সম্প্রতি হাম আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হওয়ায় তাদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। এ জন্য সংকট মোকাবিলায় দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। আশা করছি, সরকার একটি বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সংকট উত্তরণে বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে।