দেশের স্বাস্থ্য খাত এখন উদ্বেগজনক অধ্যায় অতিক্রম করছে। বাংলাদেশ যখন হাম নির্মূলের পথে সাফল্যের ছোঁয়া পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল, তখন হঠাৎ করেই এ বছরের শুরুতে হামের প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি সামনে আসে। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে ছড়িয়ে পড়েছে হামের সংক্রমণ। প্রায় সারা দেশে রোগের বিস্তার, বহু শিশুর আক্রান্ত হওয়া, উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু, রোগ প্রতিরোধক্ষমতায় ঘাটতি- এসব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন হামের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে জাতীয় পর্যায়ে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে মূল্যায়ন করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। টিকার ঘাটতি ও পুষ্টিহীনতাকে দায়ী করছে এ সংস্থা। গত বৃহস্পতিবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৮ মার্চ বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জেনেভা কার্যালয়কে অবহিত করে ঢাকা কার্যালয়। এরপর এমন তথ্য তারা জানাল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে ৯১ শতাংশই ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু। তবে হাসপাতালের তথ্যে দেখা যায়, চিকিৎসাধীনদের ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। এর মধ্যে একটি বড় অংশ (৩৩ শতাংশ) এমন শিশু, যাদের বয়স ৯ মাসও হয়নি, অর্থাৎ যারা এখনো নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসার বয়সই অর্জন করেনি। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, যারা মারা যাচ্ছে, তারা প্রধানত টিকা না পাওয়া দুই বছরের কম বয়সী শিশু। এটি প্রমাণ করে যে, শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার একটি বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ একসময় হাম নির্মূলের পথে অনেকটা এগিয়ে গেলেও ২০২৪-২৫ সালে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতি সেই অগ্রযাত্রাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এ ছাড়া ২০২০ সালের পর দেশব্যাপী বড় কোনো সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি না থাকা এবং নিয়মিত টিকাদানে শৈথিল্যের কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু সুরক্ষাহীন রয়ে গেছে। হাম কেবল সাধারণ সর্দি-জ্বর নয়, বরং বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ানো ঘাতক ব্যাধি। সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উচ্চমাত্রার জ্বর, সর্দি-কাশি দেখা দেয়। শরীরে বিশেষ ধরনের ফুসকুড়ি ওঠে। এ রোগ নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ) বা অন্ধত্বের মতো স্থায়ী জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা বা ভিটামিনের ঘাটতি থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি। তাই এ রোগতত্ত্ব ও ঝুঁকি সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করা জরুরি।
গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে মোট ২১৬ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ ছাড়া সারা দেশে আরও ১ হাজার ৪২১ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাদের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৩২ হাজার ২৮ শিশুর। হাম শনাক্ত হয়েছে ৪ হাজার ৬০৩ শিশুর শরীরে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে, তাতে সরকারের উচিত দ্রুত ‘জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি’ ঘোষণা করা এবং টিকাদান কার্যক্রমকে আরও বেগবান করা। কেবল কর্মসূচি চালু করাই যথেষ্ট নয়, বরং প্রতিটি পৌর এলাকায় টিকার কভারেজ অন্তত ৯৫ শতাংশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত শনাক্তকরণ প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে দেশে হামের মহামারি পরিস্থিতি চলছে, কিন্তু সরকার বিষয়টি স্বীকার করছে না। টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে, যা শিশু হত্যার শামিল। প্রকৃত পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরে সরকারকে এ সংকট মোকাবিলায় সব পক্ষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাতে হবে।
হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর দুটি বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রথম সভা হয় ১২ এপ্রিল। ওই সভায় হাম বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বিস্তার রোধে কার্যকর যোগাযোগের বিষয় বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেন। এ ছাড়া টিকা কার্যক্রমকে জোরালো পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখার পরামর্শ দেন তারা। কিন্তু আমরা লক্ষ করছি, হামের এই জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বয়হীনতা চোখে পড়ার মতো। জনস্বাস্থ্যবিদ ছাড়াও সংশ্লিষ্ট অন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও নির্দেশনা কাজে লাগাতে হবে; যাতে শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সহজ হয়। আশা করছি, সরকার হাম পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে টিকা কার্যক্রম জোরদারকরণে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।