কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় রোহিঙ্গারা শৃঙ্খলা মানছে না। এতে ক্যাম্পগুলোয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার সময় কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উখিয়া ও টেকনাফের মানুষ মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আশ্রয়হীন রোহিঙ্গাদের জন্য নিজেদের খাবার ভাগ করে দেওয়া থেকে শুরু করে বাড়িঘরের আঙিনায় জায়গা করে দেওয়ার মতো সহমর্মিতার নজির গড়ে ওঠে তখন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সম্প্রতি কিছু রোহিঙ্গা অপহরণ ও মুক্তিপণ-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তারা। ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারাও এখন তাদের কাছে নিরাপদ নয়। টেকনাফ ও উখিয়ার মোট স্থানীয় জনসংখ্যা যেখানে প্রায় ৬ লাখ, সেখানে ৩৩টি ক্যাম্পসহ আশপাশের এলাকায় প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
খবরের কাগজের সরেজমিন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ক্যাম্পের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা মানতে অনীহা দেখাচ্ছে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ। বিশেষ করে রেশন কার্ড আপডেট, ঘর মেরামত বা জরুরি সেবার টোকেন সংগ্রহের সময় কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রায়ই তর্কে জড়িয়ে পড়ছে তারা। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূত সুবিধা না পেয়ে তারা কর্মকর্তাদের হেনস্তা করার চেষ্টাও করছে, যা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেশন বরাদ্দ কমে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ অপরাধী চক্রের উসকানিতে এই অস্থিরতা দিন দিন আরও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) কর্তৃক রোহিঙ্গাদের মাসিক রেশন বরাদ্দ হ্রাসের পর থেকেই ক্যাম্পগুলোয় একধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই মানবিক সংকটকে পুঁজি করে একদল সুযোগসন্ধানী রোহিঙ্গা প্রশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলছে। ফলে সামান্য অজুহাতেই তারা দলবদ্ধ হয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সেখানে স্থানীয়রাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। রোহিঙ্গা শিবির ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা রয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকটি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, এসব গোষ্ঠীর একটি অংশ মাদক পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে থাকে, যা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। এ ছাড়া ক্যাম্পের বাইরে অনিয়ন্ত্রিত চলাচল করছে তারা। স্থানীয় সচেতন মহল এটিকে দেশের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে। সরকারের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
রোহিঙ্গাদের মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দেওয়া হলেও বর্তমান বাস্তবতায় ক্যাম্পগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, জীবিকা ও পরিবেশ যাতে ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যারা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং সচেতনতা বৃদ্ধি, মানবিক সহায়তা জোরদার এবং ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে প্রত্যাবাসন-প্রক্রিয়া শুরু করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কূটনৈতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চীন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। সরকার চীনের সহায়তা নিয়ে মায়ানমারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে পারে। চতুর্মুখী প্রচেষ্টা ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করা কঠিন হবে।