ড. জাহিদ হোসেন একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ। তিনি বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র সহসম্পাদক শেহনাজ পূর্ণা।
খবরের কাগজ: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন কেমন হতে পারে বলে প্রত্যাশা করছেন?
ড. জাহিদ হোসেন: বাংলাদেশকে আমরা দেখতে চাই ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমৃদ্ধশালী জাতি হিসেবে; যেখানে আমরা মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে পারব। এখানে বাকস্বাধীনতা থাকবে। আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব- এমন একটা নির্ভীক অধিকার প্রয়োগ করা সম্ভব হবে। এ ধরনের বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখেছি ১৯৭১ সালে। পরবর্তী সময়ে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা হাল ছেড়ে দিইনি। আমরা এখনো স্বপ্ন দেখছি।
আমাদের নতুন প্রজন্ম যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পড়বে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাদের কাছে অবশ্যই অর্থবহ হয়ে থাকবে। জাতির রাজনৈতিক উত্তরণের একটা মাহেন্দ্রক্ষণ ছিল ১৯৭১। ১৯৯১ ছিল জাতির রাজনৈতিক উত্তরণের আরেকটি মাহেন্দ্রক্ষণ। একইভাবে ২০২৪-এর ৫ আগস্ট দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অন্যতম আরেকটি মাহেন্দ্রক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসবে। পুনরায় দেশে গণতন্ত্র ও ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। এনিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা তৈরি হতে পারে। ১৯৭১, ১৯৯১-এর মতো ২০২৪-এর পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উত্তরণের পাশাপাশি গণতত্র প্রতিষ্ঠায় নির্বাচনি জার্নিটা সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা আশাপ্রদ বিষয়।
খবরের কাগজ: নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না?
ড. জাহিদ হোসেন: নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আছে। বিশেষ করে হাদির মৃত্যুর ঘটনা আমাদের জন্য একটি মেসেজ বহন করে। জনমনে এনিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ ও সংশয় তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার মতো নানারকম ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে। এগুলো একেকটা ভূমিকম্পের মতো। আমি বলব এগুলো রাজনৈতিক ভূমিকম্প। এগুলো নির্বাচনকে ঝুঁকিতে ফেলতে চায়। এসবের পেছনে নানারকম রাজনৈতিক কারণও আছে বোঝা যায়। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে কোনো কিছুই নির্বাচনি যাত্রাকে থামাতে পারবে না। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন তার নিজ গতিপথে এগিয়ে যাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছি।
খবরের কাগজ: গণভোটের চার প্রশ্ন- একটি উত্তর, জনগণের কতটা সাড়া মিলবে?
ড. জাহিদ হোসেন: একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে গণভোট হবে। এটা ভালো দিক। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে। এটা গণভোটের বিষয় নয়। এখন দেশটাকে কীভাবে শাসন করা হবে, নতুন একটা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানারকম জল্পনা-কল্পনা হতে পারে। আমি মনে করি, জনগণের রায় নিয়ে সমন্বয়ের মধ্যদিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সবকিছুই একটা সমাপ্তির দিকে নিয়ে যেতে হবে। সেখানে অবশ্যই নির্বাচিত সরকার থাকবে। একটা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট হবে। বিএনপি-জামায়াতসহ সব দল এতে অংশগ্রহণ করবে। দেশে একটা নির্বাচিত সরকার থাকবে এবং একটা নির্বাচিত পার্লামেন্ট থাকবে, সে বিষয়ে সবাই একমত।
খবরের কাগজ: নির্বাচনে ইসলামিক দলগুলোর সরব উপস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
ড. জাহিদ হোসেন: অন্যান্য দলের মতো ইসলামি দলগুলোও রাজনীতির মাঠে প্রতিযোগিতা করছে। তাদের একটা ইসলামিক আদর্শ আছে। বিগত আওয়ামী শাসনামলে তারা হয়তো খুব বেশি সংকুচিত ছিল বা একপেশে রাজনীতির মুখোমুখি হয়েছে। বর্তমানে তারা ভোটের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে। আমি এটাকে ইতিবাচকভাবে দেখি। সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের ইচ্ছাকে অর্থাৎ জনতার রায়কে আমাদের মানতে হবে। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা কী ভাবছেন? ভোটাররা কী চাচ্ছেন? এবং কোন দল কী আদর্শ ও মূল্যবোধ দিয়ে তাদের কর্মসূচি সাজাচ্ছেন, সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
খবরের কাগজ: এবার আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন হতে যাচ্ছে, রাজনীতির এই নতুন ধারাকে কীভাবে দেখছেন?
ড. জাহিদ হোসেন: নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে থাকতে পারছে না। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ না করলে এটার কোনো প্রভাব পড়বে কি না বা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে কি না এগুলো আপেক্ষিক বিষয়। মূলকথা হচ্ছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে আমরা যে জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে নতুন একটি ধারা বহমান আছে। এটা সবাইকে মানতে হবে। অর্থাৎ নতুন প্রজন্ম বা তরুণদের ভাষাটা আমাদের বুঝতে হবে।
খবরের কাগজ: আসন্ন নির্বাচনে কী কী চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে করছেন?
ড. জাহিদ হোসেন: নির্বাচনের এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। জনগণ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিরাপদে ভোট দেওয়ার নিশ্চয়তাটুকু যেন পায়, সেটা প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নির্বাচনে সঠিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক দল, গণমাধ্যমেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা আছে। সর্বোপরি, নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে অর্থাৎ জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সবারই দায়বদ্ধতা আছে। সে দায়বদ্ধতা পূরণের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার দেশ পরিচালনায় আসার ক্ষেত্রে সবাইকে সহাবস্থানে থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকায় থাকতে হবে।
সবশেষে এটুকু বলব, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও আমরা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। সে অবস্থান থেকে আমরা বহু দূরে। আজকে আমরা দাঁড়িয়ে আছি আরেকটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে। আবার সবকিছু নতুন করে সাজানো হচ্ছে। স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরও এখনো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হইনি। অতীতে যে ভুলগুলো হয়েছে, সেগুলো সংশোধন করে আগামীতে একটা গণতান্ত্রিক এবং সবার জন্য সমৃদ্ধিশালী সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে সবাই এগোচ্ছে, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সুখী-সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ দেখতে চাই।
খবরের কাগজ: আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. জাহিদ হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।