ত্রিংশ পর্ব
এরা সাংবাদিকতার বারোটা বাজিয়েছে। এদের অভিধানে নীতি-নৈতিকতা বলে কোনো শব্দ নেই। ফলে সাংবাদিকতার নামে দুর্বৃত্তপনা ভর করেছে। সুসাংবাদিকতা শব্দটি চলে গেছে অতল গহ্বরে। ক্রেন দিয়ে টেনেও এটাকে আর তোলা যাবে কি না সন্দেহ। তার পরও চেষ্টা করতে তো দোষ নেই! সেই চেষ্টাটুকুই করতে চান আসিফ আহমেদ। তিনি বিকল্প ভাবনা ভাবেন। বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ ছাড়া কী করে একটি মিডিয়া হাউস করা যায় তা নিয়ে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলেন। সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পরামর্শ নেন। সবার এক কথা, টাকা ছাড়া টিকে থাকবে কীভাবে? টিকে থাকার জন্য তো চাই পুঁজি। সেই পুঁজি আসবে কোত্থেকে? কে দেবে? অঢেল না থাকলে কি কেউ টাকা দিতে চায়? অঢেল থাকলেও স্বার্থ ছাড়া কেন দেবে?
টানা দেড় বছর ধরে করোনা শুধু যে মানুষের ক্ষতি করেছে তা নয়; দেশের অর্থনীতির ওপরও ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অসংখ্য মানুষ চাকরি হারিয়ে গ্রামে চলে গেছে। অসংখ্য বিনিয়োগের উদ্যোগ মুখথুবড়ে পড়েছে। ছোটখাটো বিপুল সংখ্যক ব্যবসায়ী পথে বসেছে। তাদেরও শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। সবাই পরিস্থিতির ওপর কঠিন নজর রাখছে। আগামীতে কী ঘটবে তা কেউ জানে না। একটা অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগের চিন্তা কেউ করবে না।
আসিফ আহমেদ যখন চিন্তায় বিভোর তখন তার স্ত্রী মুনমুন তার পাশে এসে কাঁধে হাত রাখলেন। নরম গলায় বললেন, কী হলো? এত গভীর মনোযোগ দিয়ে কী ভাব?
এখন পর্যন্ত যতগুলো অফার পেয়েছি সবগুলোই বড় বড় গ্রুপ। বড় গ্রুপ হলেও সমস্যা ছিল না, যদি সবাই লতিফুর রহমানের মতো হতেন। বাংলাদেশে তিনিই হয়তো একমাত্র উদাহরণ। আর সবাই পত্রিকাকে নিজেদের এবং ব্যবসায়িক স্বার্থে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করে। যারা অফার দিচ্ছেন তাদের করোরই রেপুটেশন ভালো নয়। আবার এদের সঙ্গে যাব? এদের ব্যবসায়িক পলিসি ফলো করতে করতেই তো আমার বারোটা বাজে। সাংবাদিকতা কখন করব?
মুনমুন আসিফ আহমেদের কথায় সায় দিয়ে বললেন, তোমার কথা বুঝতে পারছি। আমি কী পরামর্শ দেব তা ঠিক বুঝতে পারছি না।
আমার কয়েকজন বন্ধু বলছে, ছোট আকারে কিছু করতে। আস্তে আস্তে সেটা বড় করা যাবে। ভীষণ চিন্তায় আছি। সারা জীবন বড় জায়গায় কাজ করেছি। অভ্যাসটা তো অনেক বড় হয়ে গেছে। চিন্তাচেতনা কিংবা স্বপ্ন সবই অনেক বড়। ফলে ছোট আকারের পত্রিকা করে কতটা কি করতে পারব!
পুরো বিষয়টাই তোমার নিজের ওপর। ইচ্ছাশক্তি দিয়ে অনেক কিছুই হয়। কিন্তু টাকার কাজ কীভাবে সামাল দেব! ইচ্ছাশক্তি দিয়ে কি টাকার জোগাড় হবে! আচ্ছা বন্ধুরা যেহেতু বলছে, চেষ্টা করে কি দেখা যায়? আর যদি চেষ্টা ব্যর্থ হয়? তাহলে তো বিশাল একটা ব্লেম আমার ঘাড়ে পড়বে।
আসিফ আহমেদ নানারকম ভাবনার পর তিনি বন্ধুদের কথায় রাজি হলেন। তিনি নিজের মতো করে কাজ শুরু করলেন। বিস্ময়কর কাণ্ড! নিজের উদ্যোগটা তাকে অন্যরকম একটা অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। অজানা একটা শক্তি তাকে সামনের দিকে তাড়িত করছে। কে জোগাচ্ছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। ভেতর থেকেই অনুপ্রেরণাটা আসছে। এটা দেখে তিনি মাঝে-মধ্যেই ভাবেন, তার মানে কি! নিজের উদ্যোগটাই কি সফল হবে? তারই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে!
আসিফ আহমেদকে চিন্তিত দেখে মুনমুন আহমেদ তার পাশে গিয়ে বসলেন। তার পর কোনোরকম ভনিতা ছাড়াই বললেন, তোমাকে না বলেছি, কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করবে না। রিজিকের মালিক আল্লাহ। তোমার জীবনের জন্য সর্বোচ্চ ভালোটাই তিনি লিখে রেখেছেন। যা তোমার জন্য ভালো সেটাই হবে। তার হুকুম ছাড়া কিছুই হবে না। মনে রাখবে, যা অনিবার্য তা ঘটবেই। তাকে রোধ করার সাধ্য কারও নেই।
আসিফ আহমেদ কোনো কথা বললেন না। তিনি স্ত্রীর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন।
আসিফ আহমেদ বারান্দায় বসে বই পড়ছেন। গভীর মনোযোগ তার বইয়ের দিকে। মুনমুন আহমেদ কখন অফিস থেকে এসেছেন তা টেরও পাননি আসিফ আহমেদ। হঠাৎ কফির ঘ্রাণ পেয়ে তিনি নড়েচড়ে বসলেন। ডানদিকে তাকাতেই কফির মগ থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখে চমকে উঠলেন। মুনমুন অনেক চেষ্টা করেও তার হাসি আটকাতে পারলেন না। তিনি আসিফ আহমেদের পেছনেই ছিলেন। পেছন দিকে তাকিয়ে তাকে দেখে বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, ওহ তুমি! কখন এলে?
এই তো কিছুক্ষণ আগে।
বসো।
মুনমুন আহমেদ মোড়া টেনে আসিফ আহমেদের পাশে বসলেন। তার পর বললেন, কী পড়ছ?
সুনীলের পূর্বপশ্চিম।
এটা আগে পড়নি?
দেশ-এ যখন ধারাবাহিক ছাপা হতো তখন পড়েছিলাম। তার পর আর পড়া হয়নি। তবে প্রথম আলো, সেই সময় দুটোই পড়েছি। অসম্ভব ভালো উপন্যাস।
হুম। সুনীল সত্যিই অসাধারণ লিখেছেন।
তুমি সুনীলও ভালো পড়েছ মনে হচ্ছে!
হুম।
তোমার একটা ব্যাপারে আমার ভীষণ একটা ভালো লাগা কাজ করে।
কী? মুনমুন আহমেদ জানতে চাইলেন।
আসিফ আহমেদ বললেন, রবীন্দ্রনাথ এত বেশি পড়েছ; যা আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করে। তার অনেক কবিতা, ছোট গল্প তোমার মুখস্ত। এটা কী করে সম্ভব?
এতবার পড়েছি মুখস্ত হয়ে গেছে। আসলে এজন্য বাবার অনেক অবদান। তিনি অনেক বই পড়তেন। আমাদেরও পড়তে উৎসাহিত করতেন।
মুনমুন আহমেদ আর কথা বলতে পারলেন না। তার বাবার কথা মনে পড়লেই আবেগাপ্লুত হয়ে যান তিনি। দশ বছর আগে তিনি মারা গেছেন। কিন্তু মুনমুন আহমেদের জীবনের সবচেয়ে বড় স্মৃতি তার বাবা। তার কথা মনে পড়লেই আর ঠিক থাকতে পারেন না তিনি। কিছুক্ষণ নীরবতা ভর করল মুনমুন ও আসিফ আহমেদের ওপর। কেউ কোনো কথা বলছিলেন না। কিছুক্ষণ পর আসিফ আহমেদ মুনমুনকে উদ্দেশ করে বললেন, একটা ব্যাপার তুমি লক্ষ করেছ?
কী ব্যাপার? মুনমুন আহমেদ পাল্টা প্রশ্ন করলেন।
আসিফ আহমেদ বললেন, আমি কত বড় বড় গ্রুপের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করলাম। কোনো কোনো গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে গেছে। সাউথবাংলার কথা নিশ্চয়ই তোমার মনে আছে!
হুম। মনে থাকবে না আবার!
অদ্ভুত কারণে চূড়ান্ত আলোচনা ব্যর্থ হলো। অথচ আমি নিজে যখন উদ্যোগ নিই; তখন আলোচনা খুব দ্রুত আগায়। কেন যেন আমি একটা পজিটিভ ইঙ্গিত পাচ্ছি।
হুম। হয়তো এর মধ্যেই তোমার মঙ্গল নিহিত। তা না-হলে এমন হবে কেন?
ঠিক বলেছ। বড় গ্রুপের সঙ্গে তো অনেক বছর কাটালাম। এবার নিজের উদ্যোগ সফল করার চেষ্টা করি। কী বলো?
আমিও তাই মনে করি। তুমি নিজেই কিছু একটা করো। আমি তোমাকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে রাজি আছি।
তা তো আমি জানি। কিন্তু নতুন প্রজেক্ট করতে তো হিউজ টাকা দরকার। সেটা কোথায় পাব? কে দেবে?
তুমি উদ্যোগ নিয়ে দেখ। টাকা জোগাড় হয়ে যাবে।
তুমি যেভাবে বলছ, তাতে মনে হচ্ছে তোমার হাতেই বিনিয়োগকারী আছে!
মুনমুন দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, বললাম তো টাকা জোগাড় হয়ে যাবে। প্রয়োজনে আমার সব এসেট বিক্রি করে হলেও আমি তোমাকে দেব। তুমি তো সৎ চিন্তা থেকে কাজটা করতে চাচ্ছ! তোমার হাতে কিছু মানুষের কর্ম সংস্থান হবে। এর চেয়ে ভালো উদ্যোগ আর কি হতে পারে! সেই কাজের সহযোগী হতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব।
অনেক ধন্যবাদ মুনমুন। তোমার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। তোমার সহযোগিতা না পেলে এতদূর আমি আসতে পারতাম না।
মুনমুন আহমেদ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আসিফ আহমেদের দিকে।
আনোয়ারা বেগমের মৃত্যুর পর মোহিনী বাসা থেকে একটিবারের জন্যও বাইরে বের হননি। নিজের রুমেই বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন। খাবারের সময় হলে তার রুমেই দেওয়া হয়। তিনি ইচ্ছা হলে খান; আর ইচ্ছা না হলে খান না। মেজাজমর্জি ভালো থাকলে নিজেই প্লেটে খাবার বেড়ে খান। কখনো বই পড়ে সময় কাটান। কখনো দুঃখের গান শোনেন। বিশেষ করে মাকে নিয়ে যত গান আছে তা খুঁজে খুঁজে বের করে শোনেন। গত কদিন ধরে তিনি পুরনো অ্যালবাম আলমারি থেকে বের করে মা-বাবার বিয়ের সময় থেকে সারা জীবনের ছবিগুলো দেখেন আর চোখের পানি ফেলেন। ছবিগুলো যে স্মৃতি হয়ে গেছে তা কখনো কখনো ভুলে যান তিনি। ছবি দেখতে দেখতেই ছবির সঙ্গে কথা বলে ওঠেন। ছোটবেলার কথাগুলো একে একে মনে পড়তে থাকে তার। তিনি সেই অতীতে ফিরে যান। মা বাবার সঙ্গে নিজের ছোটবেলার ছবি দেখে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকেন। কদিন তার অ্যালবাম নিয়েই সময় কাটে। বিছানায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে অ্যালবামগুলো। একেকটা অ্যালবাম খোলেন আর পাতা উল্টে উল্টে দেখেন। দেখা যেন কিছুতেই শেষ হয় না। একটা সময় তিনি পাগলের মতো প্রলাপ বকতে থাকেন।.......
চলবে...
আরও পড়তে ক্লিক করুন-
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭, পর্ব-১৮, পর্ব-১৯, পর্ব-২০, পর্ব-২১, পর্ব-২২, পর্ব-২৩, পর্ব-২৪, পর্ব-২৫, পর্ব-২৬,