একত্রিংশ পর্ব
বাড়ির কাজের লোকগুলো মোহিনীর অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে যায়। তারা মনে মনে বলে, আপামণি কি পাগল হয়ে গেল! এমন করছেন কেন উনি! একপর্যায়ে রহিমা মোহিনীর সামনে গিয়ে বলে, আপামণি! আপামণি! আপনার কী হইছে? আপনি এমন করতেছেন কেন?
মোহিনী কোনো কথা বলেন না। উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। বিড়বিড় করে কী যেন বলেন। তার কোনো কথা বুঝতে পারে না রহিমা। সে দৌড়ে গিয়ে বাড়ির অন্য কাজের লোকদের ডেকে আনে। তারাও অবাক বিস্ময়ে মোহিনীকে দেখে। মোহিনীর জন্য তাদের ভীষণ খারাপ লাগে। রহিমা বলে, আপামণি কথা কন আপামণি! আপনার জন্য কি ডাক্তার ডাকুম!
মোহিনী হঠাৎ একটা অ্যালবাম টেনে ছবি দেখিয়ে কাজের লোকদের বলেন, এই দেখ দেখ! মা-বাবার সঙ্গে আমার ছোটবেলার একটা ছবি।
সবাই অ্যালবামের দিকে মাথা নিচু করে ছবি দেখে। রহিমা উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে বলে, আপামণিকে কি সোন্দর লাগতেছে! এইডা কোথায় আপামণি?
এইটা? নায়াগ্রা জলপ্রপাতের সামনে। দেখছিস, কত উঁচু থেকে ঝরনা নামছে! পৃথিবীর সপ্তম আশ্চার্যের একটা। বুঝতে পারছিস?
হ আপামণি, খুব সোন্দর লাগতেছে।
অন্যদের উদ্দেশ করে মোহিনী বললেন, এই! তোমরা কিছু বল!
সবাই একসঙ্গে বলল, হ আপামণি কথা সত্য। খুব সোন্দর লাগতেছে।
মোহিনী আরেকটা অ্যালবাম অন্যদিক থেকে এনে সবার সামনে তুলে ধরল। আরেকটা ছবি দেখিয়ে বলল, তোমরা বলতে পার, এটা কোথায়?
সবার আগে রহিমা বলল, আপামণি কি যে কয়! আমরা কেমনে কমু। মুখ্যসুখ্য মানুষ। আমরা জানি কিছু!
এটাকে বলে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। আমেরিকার নিউইয়র্কে। বুঝতে পারছ?
হ আপামণি। এইবার বুঝছি।
আচ্ছা, সোহেলি কই রে? সোহেলিকে দেখছি না যে!
রহিমা এর-ওর দিকে তাকিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে বলল, ওর সমস্যা হইছে আপামণি।
কী সমস্যা? মোহিনী জানতে চাইলেন।
ওর জামাইর চাকরি নাই। করোনা আওয়ার পর ছাঁটাই হইছিল। আর চাকরি পায় নাই। করোনার মধ্যে কে চাকরি দিব? এই নিয়া সোহেলির সঙ্গে ওর জামাইয়ের ঝাগড়াঝাটি হইছে। তার পর ওর জামাই ওরে তালাক দিয়া চইলা গেছে।
আহা বলিস কি!
কি আর বলুম আপামণি! দোষটা আসলে সোহেলিরই। ছেলেডার চাকরি গেছে বইলা তারে জাতে-অজাতে বকছে। আহারে! এমন বকা বকছে তা যদি আপনে শুনতেন! পুরুষ মানুষ কি আর মাইয়ালোকের গাইলমন্দ সহ্য করে!
আগে কেন তুই আমাকে বলিসনি? আমাকে বললে ওর জামাইর একটা চাকরির ব্যবস্থা করতাম। তাহলে হয়তো বিয়েটা টিকে থাকত! এত বছর আমার সঙ্গে থেকেও তুই কিছুই শিখলি না! ও এখন কোথায়?
রহিমা বলল, খালি কান্নাকাটি করে। মানুষের কান্না দেখতে ভালো লাগে না। কষ্ট লাগে। এজন্য কইছি, তুই কান্নাকাটি বন্ধ কর। না হইলে বাড়ি যা।
তার পর?
বাড়িতে গেছে। গ্রামের বাড়ি। কয়দিন পর আইব।
এটা একটা কাজ করলি রহিমা? তোর কি হয়েছে বল তো! মেয়েটার এমনিতেই মন ভাঙা। মন ভাঙা একটা মেয়েকে তোর সহ্য হলো না! ঘর ভাঙা একটা মেয়ের মনের অবস্থা কি হয় জানিস?
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। অনেকটা সময় গড়িয়ে গেল। সবাই যেন ঘটনাটিতে বিব্রত। কিছুক্ষণ পর মোহিনী স্বগতোক্তির মতোই বললেন, হায়! করোনায় কত মানুষের ঘর ভাঙছে! রহিমা যদি ঘরভাঙা মানুষের কষ্টের কথা জানত!
আপামণি, মাফ চাই। ভুল হইয়া গেছে। আর এই রকম ভুল হইব না। হঠাৎ বলে উঠল রহিমা।
মোহিনী বিরক্তির দৃষ্টিতে রহিমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, তোমরা সবাই এখন যাও। আমাকে রেস্ট নিতে দাও।
প্রায় ছয় মাস পর নিজের অফিসে গেলেন মোহিনী। করোনা মহামারির মধ্যেও মোহিনী নিয়মিত অফিস করেছেন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অগণিত মানুষকে তিনি তার অফিসদের লোকদের দিয়ে নিয়মিত খাবারের প্যাকেট দিয়েছেন। ভয়ংকরসংকটের মধ্যেও অফিসের কাউকে চাকরিচ্যুত করেননি। বেতন বকেয়া পড়েনি। উপরন্তু বোনাস দিয়েছেন। তার এক কথা, দশ বছর যাদের শ্রম ঘামে এই প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছে তাদের বিপদে প্রতিষ্ঠান পাশে দাঁড়াবে না তা কি করে হয়!
অফিসের কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে মোহিনী চিকিৎসার ভার নিয়েছেন। কোনো বাধাই তিনি মানতেন না। কিন্তু তিনি তার বাবার মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। তিনি অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দেন। অফিসের কাজকর্মের ব্যাপারেও আগের মতো আগ্রহ নেই তার। সই-সাবুতের জন্য তিনি অফিসের একজনকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তার নাম নিয়ামত আলী। বিশেষ প্রয়োজনে নিয়ামত আলী তাকে ফোন করেন। তার পরামর্শ নেন। তাকে টাইম টু টাইম অফিসের খোঁজ-খবর জানান। ওই পর্যন্ত। তিনি নিজের থেকে কোনো কিছু জানার আগ্রহ দেখান না। ভালো-মন্দও জানতে চান না। দুনিয়ার সুখ-শান্তির বিষয়টি তার কাছে তুচ্ছ।
আনোয়ারা বেগমও স্বামী হারিয়ে বাসাতেই কাটিয়েছিলেন। কোথাও বের হননি। জীবনসঙ্গী চলে গেলে কি মানুষের বাঁচার ইচ্ছা আস্তে আস্তে মরে যায়! আনোয়ারা বেগমের সে রকম অবস্থাই হয়েছে। তিনি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছেন। সারাক্ষণ মৃত্যুর পরের জগৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন। সেই ভাবনার দরজায়ই যে মৃত্যুদূত এসে হানা দেবে তা কে ভেবেছে!
যে মানুষটা বাইরে পর্যন্ত যাননি; তাকে করোনা ধরল কী করে? হঠাৎ একদিন তিনি ঠাণ্ডাজ্বরে আক্রান্ত হলেন। তিনি খুব বেশি সময় নিলেন না। হাসপাতালে নেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই তার শরীরের অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটল। তিনি শেষ কথাটিও মেয়ের সঙ্গে বলতে পারলেন না। হয়তো অনেক কথাই বলতে চেয়েছিলেন। একমাত্র মেয়েকে সব বলে যাবেন বলে ঠিক করেছিলেন। বিধির বিধান কে খণ্ডাতে পারে! তিনি চলে গেলেন।
আনোয়ারা বেগমের মৃত্যুর পর মোহিনী আরও বেশি ভেঙে পড়েন। জীবনটাই একেবারে ওলটপালট হয়ে যায় তার। অফিসে যাওয়া তো দূরে থাক, বাইরে বের হওয়াও বন্ধ করে দেন। তিনি মনে মনে অতীতের কথা ভাবেন। হায়রে জীবন! মাত্র দেড় বছর! বেদনার পাহাড় যেন এই দেড় বছরে জমেছে। আমার ওপর বিধাতা কেন এত নিষ্ঠুর হলেন! কেন আমার জীবনটা এভাবে তছনছ করে দেওয়া হলো? মাত্র দেড় বছরে আমার সবচেয়ে কাছের তিনজন মানুষকে আমি চিরদিনের জন্য হারালাম। করোনা মহামারি যখন শুরু হয় ঠিক তখনই আমি আমার প্রিয়তম স্বামীকে হারিয়েছি। তার এক বছর পর বাবাকে হারালাম। বাবা হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই মা চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন। এরপর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আর কী আছে?
হঠাৎ একজন কর্মকর্তার কথায় মোহিনীর ঘোর কাটে। মোহিনী একদৃষ্টে কর্মকর্তার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি তার নাম মনে করার চেষ্টা করছেন। তিনি কিছুতেই তার মনে আসছে না। অথচ এই কর্মকর্তাই তার সঙ্গে বেশি সময় কাজ করেছেন। এখন তিনি দুটি তিনটি বিভাগ সামলান। তিনি নিজেও ভাবেননি, মোহিনী তার নাম ভুলে গেছেন। তিনি হা করে মোহিনীর দিকে তাকিয়ে আছেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মোহিনীর চৈতন্য হলো। তিনি কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে বললেন, শোনেন কিছু মনে করবেন না। আমার মাথা পুরো ফাঁকা হয়ে আছে। আমি কিছুই মনে রাখতে পারছি না। কারও নামই আমার মনে নেই। সব এলোমেলো হয়ে গেছে। আপনার...
কর্মকর্তা হাসি হাসি মুখ করে বললেন, আমি সায়েম ম্যাম। সায়েম আহমেদ। আপনার সঙ্গে দীর্ঘ দশ বছর কাজ করছি।
ও ও! দেখেছেন আমার স্মৃতিশক্তি আমার সঙ্গে বিট্রে করছে। আমি বোধহয় আর বেশিদিন অফিস চালাতে পারব না। কী করা যায় বলেন তো সায়েম সাহেব?
ম্যাম, আমি অতি ছোট মানুষ। আমার বলা কি ঠিক হবে?
চলবে...
আরও পড়তে ক্লিক করুন-
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭, পর্ব-১৮, পর্ব-১৯, পর্ব-২০, পর্ব-২১, পর্ব-২২, পর্ব-২৩, পর্ব-২৪, পর্ব-২৫, পর্ব-২৬,