দ্বাত্রিংশ পর্ব
কী যে বলেন! আপনি দু-তিনটা সেক্টর চালান। আপনি ছোট কীসের? তাছাড়া আপনি আপনার মতো বলবেন। সিদ্ধান্ত তো আমি নেব। কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ সেটা তো আমি বুঝি নাকি!
সায়েম আহমেদ লজ্জা পেয়ে গেলেন। তিনি কী বলবেন তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ইনিয়ে বিনিয়ে বললেন, ম্যাম আপনি যদি সত্যি সত্যিই না দেখেন তাহলে..
তাহলে?
আপনাদের যে ট্রাস্ট আছে সেটার চেয়ারম্যান তো আপনি?
হুম।
ট্রাস্টের আলটিমেট ক্ষমতা তো আপনার হাতেই!
আমার হাতেই কেন হবে। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েই কাজ করবে। প্রতিষ্ঠানগুলো ট্রাস্টের বোর্ড সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত মোতাবেক চলবে।
আমার মনে হয়, আপনার এই প্রতিষ্ঠানও ওই ট্রাস্টের অন্তর্ভুক্ত করে দেন।
গুড আইডিয়া। মোহিনী বললেন।
সায়েম অবাক বিস্ময়ে মোহিনীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি ভাবতেই পারেন তার প্রস্তাব মোহিনীর পছন্দ হবে। তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, ম্যাম আমার প্রস্তাব সত্যিই আপনার পছন্দ হয়েছে!
সত্যিই পছন্দ হয়েছে। ওয়ালি সাহেবকে পাঠান তো। উনার সঙ্গে আমার জরুরি কিছু কথা আছে।
সায়েম আহমেদ মোহিনীর রুম থেকে বের হয়ে ওয়ালি সাহেবের রুমের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি তখন দ্রুত কোথায় যেন বের হয়ে যাচ্ছিলেন। সায়েম বললেন, স্যার আপনি কি বাইরে কোথাও যাচ্ছেন?
হুম। অফিসের জরুরি একটা কাজ আছে।
ম্যাম এসেছেন খবর পাননি?
না তো! কখন এলেন?
এই তো কিছুক্ষণ হলো।
আমাকে কেউ যে কিছু জানাল না!
এখনই এলেন তো! তাই হয়তো জানাতে পারেনি। আপনাকে ম্যাম সালাম জানিয়েছেন।
আচ্ছা আমি যাচ্ছি। তুমি গিয়েছিলে নাকি?
জি।
কী বুঝলে? সব ঠিক আছে? নাকি কোথাও কোনো সমস্যা আছে?
না স্যার। সব ঠিক আছে আশা করি।
ওয়ালি তরফদার আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত মোহিনীর রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। তার রুমের পিএসকে দেখে কিছুটা রাগান্বিত স্বরেই বললেন, কি ব্যাপার! তুমি দেখছি কিছুই জানাও না!
সরি স্যার। আমিও জানতে পারিনি। ম্যাম আগে থেকে কিছুই জানাননি।
ওহ তাই! তাহলে ঠিক আছে।
ওয়ালি তরফদার দরজায় টোকা দিয়ে মোহিনীর রুমে ঢুকলেন। সালাম জানিয়ে এগিয়ে গেলেন তার সামনে। তখন মোহিনী টেলিফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন। ওয়ালি তরফদারকে দেখে ইশারায় বসতে বললেন। টেলিফোনে তিনি সেসব কথা বলছিলেন তাতে মনে হলো, আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলছেন। টেলিফোনে কথা না বাড়িয়ে মোহিনী তাকে সরাসরি দেখা করতে বললেন। তার পর ওয়ালি তরফদারকে উদ্দেশ করে বললেন, কেমন আছেন আপনারা?
জি আমরা ভালো আছি। আমরা আপনাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আপনাকে আজ অফিসে দেখে খুব ভালো লাগছে। এখন থেকে আপনাকে পাব আশা করি।
মনটাকে কিছুতেই বশে আনতে পারছি না। কাজে মন বসছে না। কোনো কিছুই ভালো লাগে না। দুনিয়াটা কেমন যেন বিষাদ হয়ে গেছে। চারদিকে কেবল বিষাদের ছায়া দেখতে পাই। পুরো পৃথিবী যেন বিষাদে ঢেকে যাচ্ছে।
আসলে আল্লাহর হুকুম ছাড়া কিছুই হয় না। এটা আমাদের মানতেই হবে ম্যাম। হয়তো এর মধ্যেই খোদা তায়ালার রহমত রয়েছে। আপনি চিন্তা করবেন না। আপনার পাশে আপনার অফিসের প্রতিটি মানুষ আছে। তাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্য আছে। আপনি দুঃসময়ে যাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তারা আপনার পাশে আছে।
মোহিনী কোনো কথা বলছেন না। চুপ করে আছেন। ওয়ালি তরফদারের কথাগুলো জোনাকি পোকার মতো তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। কিছুটা আশার আলো দেখতে পান মোহিনী। ওয়ালি তরফদার আবার কিছু বলতে চাচ্ছিলেন। তাকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলেন মোহিনী। তার পর বললেন, আপনি আমাকে একটা পরামর্শ দেন। বিনা দ্বিধায়, নিঃসংকোচে কথা বলবেন। আমি সত্যি কথা শুনতে চাই। সত্যিকারের পরামর্শ চাই।
ওয়ালি তরফদার বিস্ময়ের দৃষ্টিতে মোহিনীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
২৩
শাহবাজ খান অস্থির ভঙ্গিতে হাঁটাহাঁটি করছেন। তার মেজাজ-মর্জি ভালো নেই। হঠাৎ হঠাৎ তার মেজাজ গরম হয়ে যাচ্ছে। তিনি মেজাজ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছুতেই মেজাজ ঠিক রাখতে পারছেন না। তিনি ঘন ঘন সিগারেট টানছেন। একেকটা সিগারেট কয়েক টান দিয়ে ছুড়ে ফেলছেন। আবার আরেকটা ধরাচ্ছেন। ইতোমধ্যেই দুই প্যাকেট সিগারেট শেষ করেছেন। আরেকটা নতুন প্যাকেট কার্টুন থেকে বের করে দুটি সিগারেট একসঙ্গে ধরিয়ে টানা শুরু করেছেন। সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘর অন্ধকার হয়ে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। তার পরও সিগারেট টানা বন্ধ করছেন না। কেউ যদি দরজা-জানালা খুলে দিত তাহলে হয়তো রুমের অবস্থা অতটা নাজুক হতো না। কিন্তু কেউ আসছে না। সবাই ভয়ে তার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকছে।
মেজাজ গরমের সময় শাহবাজ খানের সামনে কেউ যায় না। এ সময় কেউ তার সামনে পড়লেই চাকরি নট। ইতিপূর্বে কয়েকজন পিএসকে চাকরি হারাতে হয়েছে। কারণ একটাই, তার যখন মেজাজ গরম তখন সে তার রুমে ঢুকেছিল। রুমে কেন ঢুকেছে তার ব্যাখ্যাও শুনতে চান না। সঙ্গে সঙ্গে পত্রপাঠ বিদায় করেন। আসলে তাকে কেউ রিড করতে পারে না। বহুরূপী মানুষকে সবাই রিড করতে পারে না।
পান থেকে চুন খসলেই তিনি ব্যক্তিগত কর্মচারীদের চাকরি নট করেন। এ কথা সবাই জেনে গেছে। এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, কেউই তার পিএস হতে চায় না। অথচ একটা সময় তার পিএস হওয়ার জন্য ছেলেপেলেরা পাগল ছিল।
শাহবাজ খান হঠাৎ চিৎকার দিয়ে তৈল মিলন ও তেলবাজ তুষারকে ডাকাডাকি শুরু করলেন। কিন্তু তার ডাক কেউ শুনতে পাচ্ছে না। তার রুমটা এয়ারটাইড। ভেতরের শব্দ বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সেটা শাহবাজ খান ভালো করেই জানেন। তার পরও তিনি চিৎকার দিয়ে ডাকছেন। একপর্যায়ে তিনি তার সহকারীদের জাতে-অজাতে গালাগাল শুরু করেন। শালারা বসে বসে বেতনের নামে হারাম খায়। ওগোরে গাড়ি, বাড়ি দিয়া রাখছি। বাড়িতে রাত-দিন এসির মধ্যে নাকে তেল দিয়া ঘুমায়। আর মাঝে-মধ্যে আমাকে তেল মারে। আর কোনো কাজ নেই। সংকটের সময় একটা বুদ্ধি দিয়ে যে সহায়তা করবে তা না। এই শালাগো দিয়া কি হইব? ওই মাসুদের বাচ্চা মাসুদ! ওই তেলবাজ শালাগো ডাক!
মাসুদ শাহবাজ খানের সামনে যেতে ভয় পাচ্ছে। সে মনে মনে বলে, মেজাজ গরমের সময় এমডি স্যারের সামনে যাতে না যাই সেজন্য অনেকেই আমাকে পরামর্শ দিয়েছেন। মানুষের পরামর্শ শোনার কারণেই তিন-চার মাস ধরে চাকরিটা টিকে আছে। এই কারোনাকালে চাকরি হারাতে চাই না। যেকোনো মূল্যে এমডি স্যারের সঙ্গে থাকতে চাই। মাসুদের ধারণা, করোনার সময় চাকরি গেলে চাকরি পাওয়া কঠিন হবে। চাকরি না পেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে পথে বসতে হবে।
শেষ পর্যন্ত মাসুদকে শাহবাজ খানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই হলো। সে ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। কোনো কথা বলতে পারছে না। তার গলা শুকিয়ে এসেছে। তার কাছে মনে হচ্ছে সে বাঘের সামনে পড়েছে। কী অবাক কাণ্ড! শাহবাজ খান একটুও রাগলেন না। তিনি শান্ত গলায় বললেন, মাসুদ আমার দুই তেলবাজকে ডাক তো!
মাসুদ তেলবাজদের চেনে না। সে চার মাস ধরে শাহবাজ খানের সঙ্গে আছে। এই সময়ের মধ্যে দুই তেলবাজের কাউকে দেখেনি। সে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে শাহবাজ খানের দিকে তাকিয়ে আছে। মাসুদের বিস্ময় দেখে শাহবাজ খান আবারও নরম গলায় বললেন, তুমি তেলবাজদের চেনো না; তাই না?
স্যার।
তৈল মিলন আর তেলবাজ তুষারের নাম শুনেছ?
জি স্যার।
ওদেরকে এই নাম কে দিয়েছে জানো?
জি না স্যার।
আমি দিয়েছি। ওরা তেলবাজি করে বলে আমি ওদের এই নাম দিয়েছি। মাঝে-মধ্যে ওদের তেল খুব কাজে লাগে। কুইনাইনের মতো কাজ করে।
চলবে...
আরও পড়তে ক্লিক করুন-
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭, পর্ব-১৮, পর্ব-১৯, পর্ব-২০, পর্ব-২১, পর্ব-২২, পর্ব-২৩, পর্ব-২৪, পর্ব-২৫, পর্ব-২৬,পর্ব-২৭,পর্ব-২৮,পর্ব-২৯,পর্ব-৩০,পর্ব-৩১